চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার সড়কপথে বাসে গেলে সময় লাগে ৫ ঘণ্টার মতো। চট্টগ্রামের দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে সে সময় অর্ধেকে নেমে আসবে। সেই সঙ্গে পর্যটনসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি আসবে বলে মনে করেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এ রেলপথ আবার মিয়ানমারের কাছে গুনদুম পর্যন্ত যাবে, যা ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ হিসেবে কাজ করবে। এর মধ্যে দিয়ে তুরস্ক ও সিঙ্গাপুর থেকে যে ট্রান্স-এশিয়ান যোগাযোগ ব্যবস্থার সূচনা, তার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে আশিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও কানেক্টিভিটির মাধ্যমে তৈরি হবে বড় সুযোগ। আবার লজিস্টিক হাব হিসেবে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে রূপান্তরের মূল পরিকল্পনা হচ্ছে মাতারবাড়ীতে প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্র বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন। এমন পরিকল্পনার জন্য একটি টেকসই সড়ক অবকাঠামোর পাশাপাশি রেলওয়ে সংযোগকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা।
বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন ভবিষ্যতে যুক্ত করা হবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে। আর এটি চালু হলে বাণিজ্যিকভাবে হবে আঞ্চলিক হাব বন্দর। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের পর প্যারালাল অর্থনীতির লাইফলাইনও হবে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বিভিন্ন বন্দরের ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর হিসেবেও মাতারবাড়ীকে ব্যবহার করা যাবে। নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দরটিকে ঘিরে এরই মধ্যে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব আসছে বিভিন্ন দেশ থেকে। যেমন নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় রফতানির জন্য জাপান তাদের পণ্য উৎপাদনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ কারণে গভীর সমুদ্র্রবন্দর ছাড়াও পণ্য সরবরাহে সেখানকার সার্বিক পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন চায় দেশটি।
কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে ঢাকার আইসিডিতে পণ্য পরিবহনের সুবিধা নিশ্চিত করতেই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনের চকরিয়া অংশ থেকে ২৬ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। সংশ্লিষ্টরা বলছেন মাতারবাড়ীতে পণ্য পরিবহনে রেললাইন যুক্ত হলে পাল্টে যাবে দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের চিত্রও। রাজস্ব আদায় বাড়বে তখন বহুগুণ।
বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমীর আলী হুসাইন বলেন, ‘আমরা সবসময় বলি, যেকোনো প্রকল্পের সঙ্গে কানেক্টিং ডেভেলপ করাটা সবচেয়ে জরুরি। বিশেষ করে রোড ও রেলে সবসময়ই ফোকাস করা উচিত। ট্রেন যদি গতিসম্পন্ন হয় ভাড়া বেশি হলেও মানুষ চলাচল করতে চাইবে। কেননা এটা একটা নিরাপদ বাহন। বিমানে সময় কম লাগলেও অনেক আগে এয়ারপোর্টে যাওয়া, এত নিয়মকানুন আবার ডিলেও আছে। যে দেশে ট্রান্সপোর্ট কানেক্টিভিটি ভালো, যা সরাসরি অর্থনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভালো প্রভাব তৈরি করে। কক্সবাজারে আসা রেলপথ ভবিষ্যতে মাতারবাড়ী বন্দরের সঙ্গে সংযোগ হলে ব্যবসায়ীরা এবং ভোক্তা পর্যায়েও নিশ্চয়ই সুফল মিলবে।’
আমদানি-রফতানিতে যুক্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, একটি বন্দর ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা পেতে গেলে সড়কের পাশাপাশি রেলসহ অন্যান্য যোগাযোগও গড়ে তুলতে হয়। বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়াও সাশ্রয় হয় পরিবহন ব্যয়ও। রফতানিতে দেশের প্রথম সারির প্রতিষ্ঠান ফোর এইচ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গাওহার সিরাজ জামিল বলেন, ‘কক্সবাজারের সঙ্গে রেল সংযোগের কারণে পর্যটনে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন হবে। আবার মাতারবাড়ীতে যেহেতু গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, সেখানেও নিশ্চয়ই এ রেল যুক্ত হবে। বন্দরটি ব্যবহার শুরু হলে মূলত রফতানিতে লিড টাইমের ক্ষেত্রে স্বস্তি আসবে। আমরা যদি এক্সপোর্টটা বিবেচনায় নিই, দেখা যাবে ইউরোপে যেতে লাগবে ১৫ দিন, যেখানে এখন লাগে ২০ দিনের মতো। আর যুক্তরাষ্ট্রে যদি ৩৫ দিন সময় লাগে, সেক্ষেত্রেও ২৫ দিনে নেমে আসতে পারে। আবার কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে যেহেতু চীন থেকেই মূলত বেশি আসে। সেখান থেকেও ২০-২২ দিনের পরিবর্তে ১৫ দিনের মধ্যে পণ্য চলে আসবে। আবার ইন্ডিয়া থেকে এখন ১৮ দিন লাগলে সেটি আমরা ১০ দিনের মধ্যে পেয়ে যাব।’
পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতটি কক্সবাজারে। দেশের ভেতরে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর সঙ্গে এরই মধ্যে রেল সংযোগ হয়ে গেছে। এখন অফ সিজনেও আসবে পর্যটক। আবার দূরপ্রাচ্যর সঙ্গে অর্থাৎ জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের মতো উন্নত অঞ্চলগুলো ছাড়াও ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সঙ্গে কানেক্টিভিটি তৈরি হবে। এজন্য বিশেষভাবে শিল্পায়নের দিকে জোর দিতে চান ব্যবসায়ীরা। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে একটা বড় ধরনের শিল্পায়নের সুযোগও তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তারা। কনফিডেন্স সিমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সড়ক ও রেল পাশাপাশি থাকার কৌশলগত অনেক বিষয় থাকে। যেহেতু মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে আগামীর একটা পরিকল্পনা করা হচ্ছে। জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রফতানিকে লক্ষ্য করে বিদেশী বিনিয়োগ—এ সবকিছু বিবেচনায় নিলে কক্সবাজার সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক হাব হবে। চট্টগ্রাম শহরের আনোয়ারা থেকে শুরু করে মহেশখালী পর্যন্ত পুরো বেল্টটাতেই একটা বিশাল সম্ভবাবনা তৈরি হয়েছে।’
পদ্মা সেতু যেভাবে দেশের মধ্য-দক্ষিণাঞ্চলকে প্রাণচঞ্চল করেছে, সেভাবে কক্সবাজারকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসায় গোটা দেশের শিল্প অর্থনীতিকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়া হয়েছে। এতে কক্সবাজারের স্থানীয় অর্থনীতি বদলে দেবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত ঘিরে একসময় ছিল চিংড়ির রেণু পোনা উৎপাদনের বড় বাণিজ্য। যোগাযোগ ব্যবস্থার নাজুক পরিস্থিতির কারণে সেটিও ধসের পথে। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা ও কক্সবাজারের আটটি উপজেলার প্রধানতম কৃষিজ পণ্য লবণ ও মৎস্য আহরণ। লবণ উৎপাদনের মাঠ কিংবা স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনও ছিল কক্সবাজারের অন্যতম বাণিজ্য। তাছাড়া দেশের বৃহৎ সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনসহ সমুদ্র সৈকতকেন্দ্রিক বাণিজ্যই ছিল এখানকার মানুষের রুটি-রুজির অন্যতম মাধ্যম। সারা দেশের রেলপথের সঙ্গে কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম যুক্ত হওয়ায় বিদ্যমান অর্থনেতিক পরিমণ্ডলের উল্লম্ফন ছাড়াও এ অঞ্চলে শিল্প অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে।
আবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও দোহাজারী কৃষির জন্য উর্বর অঞ্চল। এখানকার সবজি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের চাহিদা মেটায়। যদিও অপর্যাপ্ত সড়ক অবকাঠামোর কারণে এখানকার কৃষিপণ্য যথাসময়ে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে পারে না। নতুন রেলপথ নির্মাণ হওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষিপণ্য এখন সহজেই দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে। সব মিলিয়ে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমলে দেশের শিল্প অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে কক্সাবাজারের নতুন এ রেল নেটওয়ার্ক।
মো. নূরুল ইসলাম সুজন
মন্ত্রী, রেলপথ মন্ত্রণালয়
যে দেশ যতটা উন্নত সে দেশের রেলপথও ততটা সমৃদ্ধ। তাই আমাদের দেশকে যদি টেকসই উন্নয়নে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করার কোনো বিকল্প নেই। উন্নয়নের কথা চিন্তা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের ভারসাম্য যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় পরিকল্পনা নিয়েছেন। শুধু রেলপথ নয়; দেশের নৌপথ, সড়কপথ কিংবা বিমানপথের যোগাযোগ ব্যবস্থাও যাতে ভারসাম্যপূর্ণ হয়, সেসব বিষয়ে তার পরিকল্পনামাফিক নির্দেশনায় দেশব্যাপী উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ চলছে। আমাদের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিভিন্নভাবে পিছিয়ে ছিল। সে রেলপথকে তিনি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের যে ১০টি অগ্রাধিকার প্রকল্প ছিল তার মধ্যে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ, ঢাকার পদ্মা সেতুর রেল লিংক প্রকল্প এবং খুলনা থেকে মোংলা পর্যন্ত প্রকল্পগুলো আছে। এসব প্রকল্পে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ রেলের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সঙ্গে রেলপথ আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে মাতারবাড়ীর গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে রেল যুক্ত হলে দেশের অর্থনীতির দৃশ্যপটই পরিবর্তন হয়ে যাবে। এছাড়া আমাদের যাত্রী ও পর্যটন পরিবহন এবং ভবিষ্যতে মালপত্র পরিবহনসহ সব দিক থেকেই এ রেলপথ দেশের অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ সংযোগ দেশের জিডিপিতে সার্বিকভাবে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি।
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন
সংসদ সদস্য, চট্টগ্রাম-১
কক্সবাজারে পর্যটন আজ যেমন জনপ্রিয়, স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে কিংবা তারও পর কিন্তু এমনটা ছিল না। এখানকার পর্যটন শিল্পকে প্রতিষ্ঠিত করতে আমার বাবা এস রহমান এগিয়ে এসেছিলেন। তিনি ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম শহরের মোটেল সৈকত পরিচালনায়ও যুক্ত হন। মূলত মোটেল সৈকত পরিচালনা করতে গিয়েই কক্সবাজারের পর্যটনকে ঘিরে পরিকল্পনা হাতে নেন ব্যক্তি উদ্যোগে। উনার সুদূরপ্রসারি চিন্তার ফসল ছিল কক্সবাজারে আধুনিক আবাসিক হোটেল নির্মাণ প্রকল্প, যা বর্তমানে হোটেল সায়মন নামে দেশব্যাপী জনপ্রিয়। বিশ্বের অনেক অনুন্নত দেশ দ্বীপভিত্তিক অর্থনৈতিক হাব তৈরি করে আজ উন্নত দেশের কাতারে। বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও অনুধাবন করেছেন, দেশের অর্থনীতিকে লক্ষ্যে পৌঁছতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধির বিকল্প নেই। তার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় কক্সবাজারের মাতারবাড়ীকে ডেভেলপ করে বর্তমানে যে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা হচ্ছে সেটি উন্নত রাষ্ট্রের লক্ষ্যেই এগোচ্ছে। আবার যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষ করে রেলপথের উন্নয়ন না করে এবং কোনো অঞ্চলকে রেল সংযোগের বাইরে রেখে যে অর্থনৈতিক হাব সম্ভব নয় সেটিও প্রধানমন্ত্রী অনুধাবন করেছেন। শুধু অভ্যন্তরীণ যোগাযোগই নয়, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গেও বাংলাদেশ সংযুক্ত হবে এ পথ ধরে। ফলে পুরো এশিয়ার সঙ্গে আমাদের রেল যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাতায়াত সহজ করার এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হবে আন্তর্জাতিকভাবেও।





