বণিক বার্তা দুজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদকে সম্মাননা দিচ্ছে, তার জন্য আনন্দিত বোধ করছি। ভবিষ্যতে যখন বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা হবে, চলে আসবে এ দুজন অর্থনীতিবিদের প্রসঙ্গ। দুজনই অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে ২০০৭ ও ২০০৮—এ দুই বছর কাজ করেন। অন্যদিকে ড. মসিউর রহমান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন দীর্ঘ সময়। ব্যক্তিগত জীবনে তাদের দুজনের সঙ্গেই পরিচয় রয়েছে। ড. মির্জ্জা আজিজের সঙ্গে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে কেয়ারটেকার সরকারের আমলে। তাকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছি। যেহেতু ব্যবসায় আছি, তাই ড. মসিউর রহমানের সঙ্গেও কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তাছাড়া আমার প্রয়াত পিতার সঙ্গেও তাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল। ফলে আমিও কাছাকাছি আসার সুযোগ পেয়েছি। 

ড. মির্জ্জা আজিজ ও আমি—দুজনই পাবনার মানুষ। স্বাভাবিকভাবে এলাকার প্রতি সবার একটা টান থাকে। সেটা বড় কথা না অবশ্য। তত্ত্বাবধায়ক সরকারে আমি দশজনের একজন হিসেবে ছিলাম। এটা আমার জন্য বড় অভিজ্ঞতা। সরকার কীভাবে চলে, সে অভিজ্ঞতা কখনই আমার ছিল না। কিন্তু সরকারের কাজ করতে গিয়ে সেটা হয়েছে। বাইরে যারা থাকেন, তারা বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ করেন। কিন্তু সরকারের ভেতরে যারা থাকেন তারা জানেন, কত রকম সীমাবদ্ধতার মধ্যে দায়িত্ব সামাল দিতে হয়। এটা সাধারণ মানুষের জানার কথাও না, তারা জানতে প্রস্তুতও না।

২০০৮-০৯ সালে দায়িত্বটা ছিল অল্প সময়ের জন্য। একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করে সরকারের কাছে দায়িত্ব অর্পণ করাটা সবসময় আমাদের মাথায় ছিল। সে সময় সিডর, বন্যা আর সারা পৃথিবীতে খাদ্য সংকট চলছে। বাংলাদেশেও চাল ও গমের বড় ধরনের সংকট। পার্শ্ববর্তী দেশও পুরোপুরি চাল রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। পারচেজ কমিটিতে প্রস্তাব আসে। টেন্ডারের মাধ্যমে পারচেজ করতে হয়। তখনো হাতে কিছু অফার ছিল। আমার আগ্রহ ছিল, যেন সরকারের অর্থের সাশ্রয় হয়। কিন্তু ক্যাবিনেট সেক্রেটারি আমাকে বললেন, ‘‌আমরা এমন কিছু করতে চাই না, যার জন্য আপনার পরবর্তী সময়ে ভোগান্তি হয়।’ তখন বুঝলাম সবসময় ইচ্ছা করলেও বাধাগুলো অতিক্রম করা কঠিন।

মির্জ্জা আজিজের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা হয়েছে। বিজনেস ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে গেছি। প্রায়ই আমাদের উপদেষ্টা পরিষদের সভা হতো। কাগজপত্র ঠিকঠাক করে সেগুলো আবার পাঠানো হতো। তার জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে হতো বেশ। একবার ড. মির্জ্জা আজিজের কাছে যেতে হবে। ব্যস্ত মানুষ। চা খেতে যেতে চাইলাম। উনি রাজি হলেন। আমি ফাইল নিয়ে সামনে হাজির। তিনি অবাক হলেন। কথা ছিল এক কাপ চা খেতে যাব। কিন্তু উনি বুঝতে পারলেন। খুবই সহযোগিতাপূর্ণ ছিলেন। এভাবে অনেক সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে শিখেছি। বিশেষ করে সরকারি কার্যক্রম।

আরেকটা ঘটনা মনে করা যায়। পারচেজ কমিটিতে বিদ্যুতের সংকটের বিষয়টি উঠল। তখন তিন হাজার মেগাওয়াটের কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো। আমরা মনিটর করতাম সন্ধ্যার পর যেন দোকানের লাইট না জ্বলে। রাত ৮টার মধ্যে যেন দোকান বন্ধ করা হয়। সে সময় কিছু টেন্ডার ছিল নতুন পাওয়ার প্লান্ট আনার ক্ষেত্রে। সভায় তখন সামিটের পক্ষ থেকে তিনটি প্রস্তাব আসে। তার মধ্যে একটা হান্ড্রেড প্লাস মেগাওয়াটের, আরেকটা সম্ভবত ৮০ মেগাওয়াটের। আমার ঠিক মনে নেই। বলা হচ্ছিল তাদের দেয়া যাবে না। তার কারণ তাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। আমি বললাম, ‘‌ওনারা উদ্যোক্তা। আমরা বৃহত্তম ফার্মা কোম্পানি চালাই। অথচ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় না ফার্মা না কেমিস্ট। একজন উদ্যোক্তা।’

অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে তিনি তখন আমার পক্ষে বললেন। তার কথা ছিল সমস্ত ক্রাইটেরিয়া পূর্ণ করতে পারলেই যথেষ্ট। তারা একসঙ্গে তিনটি পাওয়ার প্লান্ট নিয়ে কাজ করবে। সে সময় আমাদের অন্য কিছু দেখার বিষয় না। এমনকি এটাও না যে কে কোন দলের সঙ্গে যুক্ত। কাকে কে সাপোর্ট করেছে। মেরিট দেখে সেভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ড. মির্জ্জা আজিজের সমর্থন ছিল। আর শেষ কথাটা সবসময় অর্থ মন্ত্রণালয় থেকেই আসে। কথাটা অর্থমন্ত্রীই বলেন। 

স্বাভাবিকভাবেই উনি অনেক পড়াশোনা ও বিচার-বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন। এ ব্যাপারে ওনার প্রতি আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ আছে। বণিক বার্তা যে তাকে সম্মাননা দিচ্ছে, তার জন্য আমি আনন্দিত। ড. মসিউর রহমান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক নীতিমালার পেছনে তার ভূমিকা রয়েছে। হয়তো সামনে থেকে দেখা যায় না। সেদিক থেকে বণিক বার্তা অত্যন্ত যোগ্য দুজন ব্যক্তিকে সম্মাননা দিচ্ছে। তাদের জন্য আমরাও সম্মানিত বোধ করছি।

তপন চৌধুরী: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা; 

চেয়ারম্যান, স্কয়ার টেক্সটাইলস পিএলসি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি