ব্যাংক খাতে আমানত প্রবাহ এখন কেমন দেখছেন?
আমি উল্লেখ করার মতো কোনো প্রবৃদ্ধি দেখছি না। সরকার ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে ঋণ নিচ্ছে। বিল-বন্ডের সুদহার এখন ব্যাংকের মেয়াদি আমানতের চেয়েও বেশি। আমি এখন পর্যন্ত মেয়াদি আমানতে ৯ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিচ্ছি। কিছু ব্যাংক এর চেয়ে বেশিও দিচ্ছে। কিন্তু সর্বশেষ নিলামে সরকার ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলে ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ সুদ দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
ব্যাংকগুলো এখনো আমদানির এলসি দায় পরিশোধের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনছে। এতে ব্যাংক খাত থেকে তারল্য উঠে যাচ্ছে। সরকার ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিচ্ছে। আবার সুদহার বেশি হওয়ার কারণে বড় আমানতকারীরা ট্রেজারি বিল-বন্ড কিনছে। কিছু ব্যাংকের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকটও আছে। এসব কারণে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবাহ কম। আমরা ২০২২ সাল শেষ করেছিলাম বৈদেশিক মুদ্রার চাপ নিয়ে। আর ২০২৩ সালে এসে ডলারের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রারও চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারের সুদহারও এখন ১০ শতাংশের কাছাকাছি।
ব্যাংকে ব্যক্তি খাতের আমানতের প্রবাহ কেমন? আপনি সংকট কিংবা আতঙ্কের কথা বলছিলেন, সেটি এখন কী অবস্থায় আছে?
ব্যক্তি খাতের আমানত প্রবাহও সন্তোষজনক নয়। আতঙ্কিত হয়ে কিছু গ্রাহক ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিয়েছে। কিছু মানুষ ব্যাংকে আমানত রাখাকে নিরাপদ মনে করছে না। কয়েক বছর আগে আমরা কয়েকটি ব্যাংকে সুশাসনের ঘাটতিজনিত সংকট দেখেছিলাম। তার মধ্যে দু-একটি ব্যাংক এখনো গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে পারেনি। এখন এসে দেখছি, বেশকিছু ব্যাংকের সিআরআর ঋণাত্মক। গণমাধ্যমে এগুলো নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে মানুষ আতঙ্কিত হবে, এটিই স্বাভাবিক। কোনো একটি ব্যাংকের সংকটও পুরো খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মানুষের মধ্যে এমন একটি উদ্বেগ আছে যে কী হচ্ছে ব্যাংকে?
অনেক সময় আমাদের কাছেও গ্রাহকরা জানতে চান, ‘ভাই, ব্যাংকে টাকা রাখা যাবে তো?’ এ প্রশ্ন করার সময় কোনো ব্যাংককে পৃথক করে দেখা হয় না। এক-দুটি ব্যাংকের সমস্যা হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক্ষেত্রে যথেষ্ট সহযোগিতাও দিয়ে আসছে। কিন্তু ব্যাংক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হলে সেটি অবশ্যই উদ্বেগের।
এ উদ্বেগ কখন, কীভাবে শুরু হলো?
উদ্বেগের গোড়াপত্তন হয়তো অনেক আগের। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এটির ডালপালা প্রসারিত হয়েছে। কিছু ব্যাংকের সিআরআর, এসএলআর ঘাটতিসহ নানা নেতিবাচক সংবাদ নিয়মিতই গণমাধ্যমে আসছে। অর্থনীতিবিদরা ব্যাংক খাত নিয়ে নানা মন্তব্য করছেন। আন্তর্জাতিক ঋণমান প্রতিষ্ঠানগুলো নানা পর্যবেক্ষণ দিচ্ছে। খেলাপি ঋণসহ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। কিছু প্রভাবশালী ঋণখেলাপি হয়েও বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক ধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিযোগিতাও দৃশ্যমান। আমরা দেখছি, ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ বাড়ছে। এ বিষয়গুলো সামগ্রিকভাবে মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এর শেষ কোথায়? সমাধান কী?
নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পদে পরিবর্তন এসেছে। সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্যাংক খাতের সংস্কারের বিষয়ে সরকারের ভেতর-বাইরে নানা আলোচনা হচ্ছে। এখন যদি নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। মানুষের কাছে তখন এ বার্তা যাবে—কেউ অপরাধ করলে, সে যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, শাস্তি পাবে। সরকারের পক্ষ থেকে এমন কিছু করতে হবে, যাতে মানুষের মধ্যে সৃষ্ট সংশয় দূর হয়। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, অর্থনীতির চাবিকাঠি বা কেন্দ্রবিন্দু হলো ব্যাংক। আর ব্যাংকের জন্য লাইফলাইন হলো আমানত।
একটি ব্যাংকের কাছে আমানত কিংবা আমানতকারীর গুরুত্ব কতটুকু?
টাকা ঘরে রাখার জিনিস নয়। ঘরের মধ্যে অনেক টাকা বস্তাবন্দি করে রাখা আইনও অনুমোদন করে না। স্বাভাবিকভাবেই মানুষকে তার সঞ্চয় কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ নিরাপদ কোনো স্থানে রাখতে হবে। এজন্যই ব্যাংকের প্রয়োজন। আবার দেশের অর্থনীতির আজকের অবস্থান ব্যাংকের বদৌলতেই হয়েছে। ব্যাংক চলে আমানতের অর্থে। উদ্যোক্তা কিংবা শেয়ারহোল্ডাররা ব্যাংকের মোট অর্থের ১০ শতাংশের জোগানও দেননি। আমানত না থাকলে কোনো ব্যাংকই চলবে না। সুতরাং আমরা বলতে পারি, আমানতকারীদের অর্থের ওপরই দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে।
এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আমানতকারীরা ব্যাংকে উপেক্ষিত কিনা।
ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের সঙ্গে করা অঙ্গীকার ভঙ্গ করার সংবাদ খুব বেশি নেই। আমানতকারীদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হলো—রিটার্ন যথা সময়ে পরিশোধ করা। আর কোনো আমানত তুলে নিতে চাইলে সেটি তৎক্ষণাৎ ফেরত দেয়া। আমার বিশ্বাস, দেশের প্রায় সব ব্যাংকই এ শর্ত পূরণ করছে। আমরা কোনো আমানতকারীকে ১০ শতাংশ রিটার্ন দেয়ার কথা বলে ৫ শতাংশ দিচ্ছি না। ১০ শতাংশের প্রতিশ্রুতি দিলে সেটিই দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, এমন সংবাদ তেমন শুনিনি। আমানতের নিরাপত্তার জন্যই ব্যাংকগুলো সিআরআর সংরক্ষণ করে। আবার এজন্য ইন্স্যুরেন্সও করা হচ্ছে।
বহুদিন ধরে আপনারা ব্যাংক খাতে কার্যকর করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছেন। কেমন ধরনের সুশাসন প্রত্যাশা করেন?
আর্থিক খাতের জন্য করপোরেট সুশাসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুশাসন ঠিকঠাক অনুসরণ না হলে কোনো পদক্ষেপই কাজে আসবে না। এটি নিশ্চিত করতে হলে সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে। আদালত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন। ব্যাংকগুলোর পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও নিজ নিজ ক্ষমতার মধ্যে থেকে নিজের কাজ করবে। দায়িত্ব পালনে ব্যত্যয় কিংবা ব্যর্থতার জন্য সব পক্ষেরই শাস্তি থাকতে হবে। কেউ তার নিজেদের কাজের সীমা লঙ্ঘন করবে না। এসব নিশ্চিত করা সম্ভব হলে তবেই আমরা কার্যকর সুফল পাব।
আপনাদের ব্যাংকে করপোরেট সুশাসনের চর্চা কেমন?
আমি হলফ করে বলতে পারি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে (এমটিবি) করপোরেট সুশাসনের শতভাগ চর্চা আছে। আমাদের পরিচালনা পর্ষদ দেশের অন্যতম সেরা। পর্ষদ তার দায়িত্ব পালন করছে। আর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রত্যেক সদস্য নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। এখানে কেউ কারো কাজে হস্তক্ষেপ করে না।
আমানতকারীদের আর্থিক স্বস্তি বা মুনাফা দেয়ার ক্ষেত্রে আপনাদের ব্যাংক কী করছে?
আমাদের স্লোগান হলো ‘এই সময়ের ব্যাংকিং’। এ স্লোগান শুধু কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। ব্যাংকের সব ক্ষেত্রেই স্লোগানের বাস্তব প্রতিফলন আছে। প্রচলিত ধারার সব ব্যাংকিং সেবাই আমাদের রয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকিং থেকে শুরু করে সঞ্চয় বা বিনিয়োগের জন্য সব ধরনের প্রডাক্ট আমরা চালু করেছি। মানুষের প্রয়োজনের শতভাগ পূরণ করার মতো প্রডাক্ট মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের রয়েছে।
এসএমইর জন্য আমাদের রয়েছে পৃথক আমানত প্রডাক্ট। আবার ব্যক্তিবিশেষের জন্যও বিভিন্ন ধরনের স্বল্প-দীর্ঘমেয়াদি ও বিভিন্ন আমানত স্কিম রয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের গ্রাহকদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘ইয়াকিন’। একজন মানুষের সব ধরনের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই আমাদের আমানত প্রডাক্টগুলো সাজানো হয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্যও আমরা ছোট ছোট আমানত স্কিম চালু করেছি। ‘বিকাশ’-এর মাধ্যমে যে কেউ এসব স্কিম চালু করতে পারছে। যেখানে ব্যাংক নেই, সেখানকার মানুষও ‘বিকাশ’-এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ৫০০-১০০০ টাকা আমাদের ব্যাংকে সঞ্চয় করতে পারছে। আবার মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের অ্যাপসের মাধ্যমেও হিসাব খোলা থেকে শুরু করে সব ধরনের সেবা পাওয়া যাচ্ছে। গ্রাহককে এখন আর ব্যাংকে আসতে হচ্ছে না। আর ছোট ছোট প্রান্তিক উদ্যোক্তার জন্য আমরা মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট চালু করেছি।





