সার্বিকভাবে দেশের ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাত একটু চাপে আছে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেছে। গত তিন মাসে পুরো খাতেই খেলাপি ঋণ অনেক বেড়েছে। মূলত কভিডের বিলম্বিত প্রভাবেই এটি হয়েছে। কিছুটা তারল্য সংকটও রয়েছে। টাকার বিনিময় হারের ক্ষেত্রে কিছুটা অস্থিরতা রয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর। তবে সুদীর্ঘ পথচলায় দেশের এনবিএফআই খাত অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। বর্তমানে খাতটি ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ পোর্টফোলিও এবং পাশাপাশি প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার গ্রাহক আমানতের ব্যবস্থাপনা করছে। 

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ফান্ড মবিলাইজ করা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তহবিল সংগ্রহের জন্য ব্যাংকের মতো গ্রাহক থেকে আমানত নিয়ে থাকে। এছাড়া ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ ধারও নেয়। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন করার সময় প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল ব্যয় বেড়ে যায়। এ তহবিল ব্যয়কে একটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রাখতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চমৎকার একটি ভূমিকা পালন করতে পারত, যদি আমাদের বন্ড মার্কেটটা শক্তিশালী হতো। বাংলাদেশে যদি বিকল্প অর্থায়ন যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বন্ড মার্কেট যদি ভালো অবস্থানে থাকে, তাহলে আমরা অর্থ সংগ্রহে সেদিকেই ঝুঁকব এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এ বিকল্প সুযোগ ও বন্ড মার্কেটকে কাজে লাগিয়ে লাভজনকভাবে অর্থায়ন সম্ভব হবে। লংকাবাংলা ফাইন্যান্স বেশ কয়েক বছর ধরে বন্ড মার্কেটে কাজ করছে এবং এর ধারাবাহিকতায় আমরা এ পর্যন্ত চারটি বন্ড মার্কেটে নিয়ে এসেছি। এনবিএফআইগুলো বর্তমানে স্বল্পমেয়াদে তহবিল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়ন করছে। এটা করা যৌক্তিক নয়। দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহ করতে হবে।

আমানত সংগ্রহে গ্রাহকের আস্থা একটি বিশাল ভূমিকা পালন করে। লংকাবাংলার প্রতি গ্রাহকের আস্থা আছে। এজন্য তারা এখানে আসে। যেকোনো ফাইন্যান্স কোম্পানিকেই মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। সে আস্থার জায়গাটি কিন্তু খানিকটা ভিন্ন। একটা প্রতিষ্ঠানে করপোরেট সুশাসন, করপোরেট সংস্কৃতি বলে দেয় তারা কীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ বিষয়গুলোকে সঠিকভাবে পরিপালন করে যদি কোম্পানি পরিচালনা করা যায় তাহলে মানুষের আস্থা প্রতিষ্ঠা কোনো কঠিন কাজ নয়। একটি বিষয় সবাই স্বীকার করবেন যে ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে। কয়েক দশকে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়নেও এগিয়ে এসেছে। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যে ভূমিকা পালন করা দরকার ছিল তা যে অনেকাংশে পুরোপুরি সফলভাবে করা সম্ভব হয়েছে সেটা আমি বলব না। করপোরেট সুশাসন ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার কথা ছিল তা হয়নি। সুতরাং এ জায়গাগুলো ঠিক করতে হবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালকদের এক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনায় যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। মেধাবী তরুণদের নেতৃত্বে আনতে হবে। যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খুব একটা ভালো নয় তাদের একীভূতকরণের মাধ্যমে একটি কাঠামোয় আনতে হবে ও দক্ষ ব্যবস্থাপকের হাতে তুলে দিতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে।

দেশের অন্যতম আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা গ্রাহকদের আস্থা ও সুনামের সঙ্গে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে আমানত সংগ্রহ করে যাচ্ছি। আমরা সর্বদাই গ্রাহকের সুবিধা ও চাহিদার কথা মাথায় রেখে আমাদের পণ্য ও সেবার ডিজাইন করছি। বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর মানুষের জন্য রয়েছে আমাদের বহুমাত্রিক সেবা। আমরা আমাদের ডিপোজিট সেবাগুলো সবার জন্য নিয়ে এসেছি আর আমাদের পণ্যের বৈচিত্র্য আমাদের অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে আমাদেরই এ বিশাল সেবা ও পণ্যের বৈচিত্র্য রয়েছে। শিশু ও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ইন্স্যুরেন্স সুবিধাসংবলিত ডিপোজিট সেবা যথাক্রমে প্রতিভা ও স্বস্তি নিয়ে এসেছি। আর আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের কথা চিন্তা করে আমাদের রয়েছে ‘অগ্রজ’। বিনিয়োগকৃত অর্থের ওপর শুরুতেই বার্ষিক ভিত্তিতে মুনাফা উপভোগের বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ ‘আর্ন ফার্স্ট’ ডিপোজিট স্কিম, দৈনিক মুনাফা সুবিধাসংবলিত বিশেষায়িত স্কীম ‘ফ্লেক্সি ডিপোজিট’। এছাড়া সুবিধাজনক ও নির্ধারিত সময়ে প্রাথমিক জমাকৃত অর্থ দ্বিগুণ অথবা তিন গুণ করার বিশেষায়িত ডিপোজিট স্কিম ‘কুইক সঞ্চয়’ নিয়ে লংকাবাংলা আছে আপনার পাশে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক জীবনের মান উন্নয়নের চেষ্টায় লংকাবাংলা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। নারীদের সার্বিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে লংকাবাংলা নিয়ে এসেছে নারীভিত্তিক প্লাটফর্ম ‘শিখা’। নারীদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে লাভজনক মুনাফাসংবলিত সময়োপযোগী ও বিশেষায়িত ডিপোজিট স্কিম ‘শিখা ইচ্ছে’, ‘শিখা অবিরত’, ‘শিখা সঞ্চয়’ ও ‘এসএমই শিখা প্রজ্বলন’ নিয়ে লংকাবাংলা আছে নারীদের পাশে। দেশের সব উদ্যোক্তা নারীদের জন্যও রয়েছে ‘এসএমই শিখা ইচ্ছে’, ‘এসএমই শিখা অবিরত’, ‘এসএমই শিখা সঞ্চয়’ ও ‘এসএমই শিখা প্রজ্বলন’। সম্প্রতি আমরা সিএমএসএমই গ্রাহকদের জন্য ডিপোজিট সেবা নিয়ে এসেছি। ‘এসএমই উপার্জন’, ‘এসএমই সচ্ছলতা’ ও ‘এসএমই দ্রুত সঞ্চয় ডিপোজিট স্কিম’ নিয়ে লংকাবাংলা আছে দেশের সব উদ্যোক্তা এবং উদ্যোগী মানুষের পাশে।

মূল্যস্ফীতির কারণে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের ভোক্তার আয় কমে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যয় মেটাতে মানুষ কিন্তু আরো বেশি ক্রেডিট কার্ড নির্ভর হয়ে গেছে। এ কারণে আমাদের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের সংখ্যা বেড়েছে। তবে এখনো আমাদের দেশে ক্রেডিট কার্ড যে পরিমাণ থাকার কথা, তার তুলনায় অনেক কম। এখানে সামনে আরো অনেক সুযোগ আছে। আগামী পাঁচ বছর কোথায় ফোকাস দেব তা যদি বলি, সত্যি কথা বলতে কী আমরা কিন্তু একটি বহুমাত্রিক পণ্যে সমৃদ্ধ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। আমাদের সব ধরনের আর্থিক পণ্যই রয়েছে। রিটেইল, এসএমই, করপোরেট ও পুঁজিবাজার সব জায়গায় আমাদের ভালো উপস্থিতি আছে। সামনের দিনগুলোয় আমরা এসএমই খাতে আরো বেশি ফোকাস করতে চাই। পাশাপাশি কনজিউমার ফাইন্যান্সিংয়েও আমরা আছি। এর মাধ্যমে আমরা মানুষের আরো কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করছি। আমরা যদি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কথা চিন্তা করি, তাহলে কিন্তু আমাদের ডিজিটালাইজেশনে যেতে হবে। এর মধ্য দিয়ে আমরা একটি টেকসই প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের গড়তে পারব। এরই মধ্যে আমরা ডিজিটালাইজেশনের কাজ শুরু করে দিয়েছি। আগামীতে আমরা লংকাবাংলা ফাইন্যান্সকে একটা ডিজিটাল ব্যাংক হিসেবে দেখতে চাই।