বাংলাদেশ পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আমেনা বেগম। নেতৃত্ব দিচ্ছেন পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্কের। ২০১৫ সালে পেয়েছেন পুলিশের সর্বোচ্চ পদক বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (বিপিএম-সেবা)। ‘আইজি গুড সার্ভিস মেডেল’ও পেয়েছেন। আজকের প্রতিবেদনে থাকছে তার গল্প। লিখেছেন ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া

ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন, নিজের স্বতন্ত্র একটা পরিচয় থাকবে। সেই স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়েই আবেদন করেন ১৮তম বিসিএসে। প্রথম পছন্দ ছিল পুলিশ ক্যাডার এবং সেটি মিলেও যায়। ১৯৯৯ সালে আমেনা বেগমের নামের সঙ্গে যুক্ত হয় সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি) পদবি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর করেন আমেনা বেগম। জীবনে এতটা পথ আসার পেছনে পরিবারের অবদান তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মা-বাবা কখনো আমাদের ভাইবোনদের মাঝে কোনো বৈষম্য করেননি। দুই ভাইয়ের জন্য লেখাপড়ার যতটুকু সুযোগ-সুবিধা ছিল, অমাদের দুই বোনের জন্যও একই ছিল। বাবা আমাদের বেশ সময় দিতেন। তিনি সবসময় চাইতেন সব সন্তান যেন কর্মজীবনে সাফল্য পায়।’

আমেনা বেগমের পুলিশে যোগদানের ক্ষেত্রে ভাইয়ের উৎসাহও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, ‘১৯৮৮-৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশে বিসিএসের মাধ্যমে নারীদের নিয়োগ বন্ধ ছিল। বিসিএসে পুলিশের ক্ষেত্রে লেখা থাকত, শুধু পুরুষ প্রার্থীদের জন্য। আমি যখন আবেদন করতে যাই, তখন দেখতে পাই লেখাটি নেই, অর্থাৎ নারীরাও আবেদন করতে পারবে। বিষয়টি বাবাকে দেখাই এবং আবেদনের বিষয়ে কথা বলি। তিনি আমাকে আবেদন করতে উৎসাহ দেন। আমার ভাই সেনাবাহিনীতে ছিল, সেও উৎসাহ দেয়। পরে জানতে পারি, ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার গঠনের পর সমঅধিকার নিশ্চিত করতে বিসিএস বিজ্ঞপ্তিতে নারীদের আবেদনের বাধাটি দূর করেছেন।’

পুলিশে যোগদানের পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন আমেনা বেগম। নরসিংদী ও রাঙ্গামাটি জেলায় পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০০৫ সালে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং পরবর্তী সময়ে র‍্যাব সদর দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বর্তমানে কর্মরত আছেন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে (এসবি)।

দেশের বাইরেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন আমেনা বেগম। ২০০৬ সালে পূর্ব তিমুরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ আর্মড পুলিশ ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। ১৪০ জনের ওই দলে আমেনা বেগমই ছিলেন একমাত্র নারী কর্মকর্তা। এছাড়া ২০০৯-১৫ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন পুলিশের এশিয়া রিজিয়ন কো-অর্ডিনেটর হিসেবে। 

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৫ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ পদক বিপিএম-সেবা এবং ২০১৯ সালে ‘আইজি গুড সার্ভিস মেডেল’ পান আমেনা বেগম। বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্কের সভাপতি নির্বাচিত হন ২০১৮ সালে। সভাপতি হওয়ার পর তিনি নারীদের জন্য সাইবার সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করেন। এ কর্মসূচির সুবিধাভোগী ছিলেন ১ হাজার ২০০ ব্যাংকার্স ও পুলিশের ছয় হাজার নারী সদস্য। এ কাজের জন্য ২০২৩ সালে ‘বঙ্গবন্ধু ইন্টারন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি অ্যাওয়ার্ড’ পান আমেনা বেগম।

অন্য নারীদের মতো আমেনা বেগমকেও নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সামনে এগোতে হয়েছে। ২০০২ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় পায়ে গুরুতর আঘাত পান তিনি। পা কেটে ফেলার মতো ঝুঁকি তৈরি হয়। পা বাঁচাতে অস্ত্রোপচার করাতে হয় কয়েক ধাপে। তবে এমন পরিস্থিতিতেও ভেঙে পড়েননি অকুতোভয় এ নারী। 

আমেনা বেগম বলেন, ‘রাতের বাসে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলাম। কুমিল্লায় ট্রাকের সঙ্গে আমাদের বাসের সংঘর্ষ হয়। দুর্ঘটনার পর দেখতে পেলাম, আমার পা শরীর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। পুলিশের চাকরিতে ফিটনেস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কর্মক্ষেত্র নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হয়। কিন্তু ওই অবস্থায়ও হতাশ হইনি। প্রথমে ক্র্যাচে ভর দিয়ে চাকরিতে যোগদান করি। এখন কেউ আমায় দেখলে বুঝবেই না আমি এমন একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছি।’

নারীর প্রতি সমাজে যেসব নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, কমবেশি সেগুলোও মোকাবেলা করতে হয়েছে আমেনা বেগমকে। কর্মজীবনের শুরুর দিকের স্মৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনেকেই আমাকে বলত, নারীদের পুলিশের এ পদে আসার কী প্রয়োজন! আবার অনেকের মধ্যে সংশয় ছিল, নারী হিসেবে আমি দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারব কিনা। তবে আমি সবসময় আত্মবিশ্বাসী ছিলাম এবং কাজের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করেছি।’

আমেনা বেগমের মতে নারীর সামনে এগিয়ে যেতে মুখ্য ভূমিকা রাখে পরিবার। নিজের ব্যক্তিজীবনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিয়ের আগে যেমন পরিবারকে পাশে পেয়েছি, বিয়ের পরেও স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের পাশে পেয়েছি। বিশেষত আমার শ্বশুর নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের বিষয়ে খুব উৎসাহ দেন।’

সমাজে নারীর জন্য চ্যালেঞ্জ থাকলেও বিষয়টিকে বড় করে দেখার পক্ষে নন আমেনা বেগম। তিনি মনে করেন, এর ফলে নারীর সামনে এগোনো আরো চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। নারী-পুরুষ সবার জীবনে চ্যালেঞ্জ থাকে। তবে নারীর জন্য চ্যালেঞ্জ কিছুটা বেশি। এ নিয়ে চিন্তা না করে যোগ্যতা অর্জনের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। সময়ের সঠিক ব্যবহার করে ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবনে এগিয়ে যেতে হবে। আর নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এটা নিশ্চিত করতে হবে, প্রতিটি মানুষই যেন তার যোগ্যতা অনুসারে সমান সুযোগ ও গুরুত্ব পায়। 

নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে বর্তমানে পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানান আমেনা বেগম। পুলিশের কিছু কার্যক্রম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আমরা একযোগে প্রতিটি থানায় নারী ও শিশু ডেস্ক চালু করেছি। একজন নারী ভুক্তভোগী একজন পুরুষ কর্মকর্তার কাছে অনেক সময় তার সমস্যার কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তারা যেন একজন নারী কর্মকর্তার কাছে নির্দ্বিধায় সমস্যার কথা বলতে পারেন, সেজন্য এসব ডেস্কে নারী কর্মকর্তা দেয়া হয়েছে। এছাড়া সব পুলিশ সদস্যের মধ্যেই জেন্ডার সেন্সিবিলিটি ও জেন্ডার অ্যাওয়ারনেস তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

বৈষম্যহীন সমাজ তৈরিতে আমেনা বেগমের আহ্বান, পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্র সব জায়গায়ই যেন পারস্পরিক সম্মানবোধের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়। তরুণ প্রজন্মের প্রতি আমেনা বেগমের পরামর্শ হলো, তারা যেন অগ্রসরমাণ পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নেয়। তিনি বলেন, ‘পৃথিবী এখন অনেক দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি এত উন্নত হয়েছে যে আমরা এখন মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর যেকোনো তথ্য পেয়ে যাই। আধুনিক পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণদের এগিয়ে যেতে হবে, দেশকেও এগিয়ে নিতে হবে।’