দেশে ক্রেডিট কার্ডের চাহিদা আছে এবং এর ব্যবহারও বাড়ছে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী থাকার কারণে মানুষের কাছে নগদ অর্থ কম রয়েছে। এতে মানুষের মধ্যে ঋণ করার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে। পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডের অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রেও কিছুটা সমস্যা দেখা যাচ্ছে। অনেকে প্রয়োজনের সময় খরচ করছে ঠিকই, কিন্তু অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে অনিয়মিত হয়ে পড়ছে। এতে ক্রেডিট কার্ডে খেলাপির পরিমাণও বাড়ছে।

২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে ক্রেডিট কার্ডের বাজারে ১৫-২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে এটি আমাদের প্রত্যাশা অনুসারে বাড়েনি। কারণ আমরা মনে করেছিলাম ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে জেলা শহরগুলোয় ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বাড়বে। কিন্তু জেলা শহরগুলোয় ক্রেডিট কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো যেমন পস মেশিন ও এটিএম সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এ কারণে সেখানে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারও তেমন বাড়েনি। দেশের ক্রেডিট কার্ডের মোট বাজারের ৮০ শতাংশই ঢাকা ও চট্টগ্রামে কেন্দ্রীভূত। এক্ষেত্রে ই-কমার্সে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন বেশ বেড়েছে।

ক্রেডিট কার্ডের পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক বেশি। যদিও এক্ষেত্রে সুদের হার ২০ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়া আছে। এর বেশি সুদ নেয়া সম্ভব নয়। করোনার পর থেকেই ক্রেডিট কার্ডে খেলাপির পরিমাণ বাড়ছে। পাশাপাশি আমাদের সুদ আয়ও কমে গেছে। অন্যদিকে গ্রাহককে আকৃষ্ট করার জন্য আমাদের বিভিন্ন ধরনের অফার ও ছাড় দিতে হয়। এজন্য আমাদের পরিচালন খাত থেকে ব্যয় করতে হয়। কিন্তু আয় কমে যাওয়ার কারণে আমরা গ্রাহকদের সেভাবে অফার ও ছাড় দিতে পারছি না। অনেক ব্যাংক ছাড় দেয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ নির্দিষ্টসংখ্যক লেনদেন করলে বার্ষিক ফি মওকুফের যে সুবিধা ছিল সেটি বন্ধ করে দিয়েছে। এর পরিবর্তে নির্দিষ্ট পরিমাণ লেনদেনের ভিত্তিতে বার্ষিক ফিতে ছাড় দেয়া হচ্ছে।

আগে অনেকে একসঙ্গে বেশ কয়েকটি ক্রেডিট কার্ড রাখতেন। বর্তমানে এ প্রবণতায় পরিবর্তন এসেছে। এখন মানুষ দুই-তিনটির বেশি কার্ড রাখতে চান না। তারা মনে করেন বেশি কার্ড থাকলে খরচও বেশি হবে। তাছাড়া কেউ কেউ বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবিতে রিপোর্টিংয়ের ঝামেলা এড়াতে চান ঋণ নেয়ার সামর্থ্য কমে যাওয়ার ভয়ে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্যাশলেস সোসাইটি গড়ে তোলার। এজন্য কার্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস দিতে উৎসাহ দেয়া উচিত। তা না হলে এটি জনপ্রিয় হবে না। আমাদের প্লাস্টিকের ক্রেডিট কার্ড আমদানি করতে হয়। প্রতি বছরই এর ওপর করভার বাড়ছে। সবদিক দিয়েই ক্রেডিট কার্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চাপে আছে। বর্তমানে ঋণের সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ। এটি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। অথচ ক্রেডিট কার্ডের সুদহার এখনো ২০ শতাংশই আছে। এটি বাড়িয়ে ন্যূনতম ২৫-২৭ শতাংশ করা প্রয়োজন।

রমজান উপলক্ষে আমাদের বিভিন্ন ধরনের ক্যাশব্যাক অফার চলছে। স্বপ্ন, আগোরা ও মীনা বাজার থেকে লংকাবাংলার ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কেনাকাটা করলে ১২ শতাংশ ক্যাশব্যাক পাওয়া যাবে। আড়ংয়ে ক্যাশব্যাক অফার রয়েছে। ইলেকট্রনিকস পণ্যেও ক্যাশব্যাক আছে। প্রায় সব ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রেই আমাদের বিভিন্ন ধরনের অফার রয়েছে। ফলে এসব সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে একজন গ্রাহক কিন্তু সহজেই কার্ডের বার্ষিক ফির অর্থ এখান থেকে সাশ্রয় করতে পারছেন।

অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) হিসেবে আমাদের একটি সীমাবদ্ধতা আছে যে আমরা দ্বৈত মুদ্রার (ডুয়াল কারেন্সি) ক্রেডিট কার্ড সেবা দিতে পারি না। শুধু স্থানীয় বাজারে আমাদের ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় বাজারে আমাদের অবস্থান পঞ্চম। ২০২২ সালে লংকাবাংলার ক্রেডিট কার্ডের পোর্টফোলিও ছিল ৪৮০ কোটি টাকা। এটি ২০২৩ সাল শেষে ৫০৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আমাদের সক্রিয় ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ১ লাখ ৩৫ হাজার। গত বছর আমাদের কার্ড ব্যবহার ৩০ শতাংশ বেড়েছে। আমরা ব্যবসা বাড়ানোর ক্ষেত্রে খুব বেশি আগ্রাসী কিংবা ধীর নই নীতি অনুসরণ করি। যেখানে যতটুকু প্রয়োজন সেখানে আমরা ততটুকু জোর দিচ্ছি। নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত গ্রাহকই আমাদের মূল লক্ষ্য। ক্রেডিট কার্ড তারাই বেশি ব্যবহার করেন। নতুন যারা চাকরি পেয়েছেন আমরা তাদের কার্ড দিচ্ছি। এর মাধ্যমে তাদের কার্ড ব্যবহারে অভ্যস্ত করে তুলছি। স্কুলের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মাধ্যমে আমরা সাপ্লিমেন্টারি ক্রেডিট কার্ড দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছি। ক্রেডিট কার্ড নেয়ার জন্য যে আবেদন ফর্ম রয়েছে সেটি আমরা এখন ডিজিটাল মাধ্যমে জমা দেয়ার সুবিধা চালু করেছি। কারো মাসিক আয় যদি ন্যূনতম ২৫ হাজার টাকা হয় তাহলে আমরা তাকে ক্রেডিট কার্ড দিই। এক্ষেত্রে তিনি ৫০ হাজার টাকার লিমিট পেয়ে থাকেন। ইন্টার্ন ডাক্তারদের আমরা কার্ড দিচ্ছি।

তথ্যপ্রযুক্তি, ভ্রমণ ও তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ক্রেডিট কার্ড খেলাপির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। ফলে এসব খাতে আমরা এখন বেছে বেছে কার্ড দিচ্ছি। ব্যাংক খাতের সঙ্গে যারা জড়িত আছেন তারা খুবই ভালো গ্রাহক। কিন্তু তাদের মধ্যে খেলাপির সংখ্যাও বেশি। এমন অনেক ঘটনা রয়েছে যে তারা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অর্থ খরচ করে তা পরিশোধ না করেই বিদেশ চলে যাচ্ছেন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।

ট্যাক্স রিটার্ন বাধ্যতামূলক করার কারণে অনেকেই ক্রেডিট কার্ড নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এর ফলে যে হারে কার্ডের পরিমাণ বাড়ার কথা ছিল সেটি হয়নি। বিএনপিএল (বাই নাউ পে লেটার) নামে একটি নতুন ডিজিটাল পণ্য চালু হতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অ্যাপসের মাধ্যমে পণ্য কিনে সেটি মাসিক কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ থাকছে। এটি ক্রেডিট কার্ডের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে।


ক্রেডিট কার্ড মূলত লাইফস্টাইল কিংবা প্রাত্যহিক যেসব খরচ রয়েছে সেগুলো মেটানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি এর বাইরে চলে যান যেমন ক্রেডিট কার্ড থেকে নগদ অর্থ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করাটা হবে আত্মঘাতী। কারণ এক্ষেত্রে লোকসানের সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। এতে খেলাপি হওয়াও ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। নিজের আয় অনুসারে ক্রেডিট কার্ডের  মাধ্যমে অর্থ ব্যয় করতে হবে। যে পরিমাণ অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা রয়েছে সে পরিমাণ অর্থই ব্যয় করা উচিত। কার্ড আছে বলেই সক্ষমতার বাইরে গিয়ে কেনাকাটা করা উচিত নয়। তাছাড়া যে জিনিসের প্রয়োজন সেটিই কার্ডের মাধ্যমে কেনা উচিত। প্রয়োজন নয় এমন জিনিস কিনে কার্ডের লিমিট শেষ করে ফেললে পরে অতিপ্রয়োজনের সময় আপনি কার্ডের সুবিধা নিতে পারবেন না। নিয়মানুসারে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে যে পরিমাণ অর্থ খরচ করা হয় তার ৫ শতাংশ ন্যূনতম হিসেবে পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু তাই বলে আপনার যদি ৫ শতাংশের বেশি অর্থ পরিশোধের সক্ষমতা থাকে তাহলে আপনি সেটি পরিশোধ করে দেন। কারণ যত বেশি অর্থ শোধ করবেন আপনার দায় কিন্তু তত বেশি কমে যাবে। বার্ষিক ফির ক্ষেত্রে ছাড় পেতে আপনাকে লংকাবাংলার কার্ডের মাধ্যমে বছরে ন্যূনতম ১৫টি লেনদেন (পস, ই-কমার্স) করতে হবে। পরিকল্পনা করে নির্দিষ্টসংখ্যক লেনদেন করতে হবে। এতে বার্ষিক ফি পরিশোধের জন্য যে অর্থ লাগত সেটি সাশ্রয় হবে। আমরা যেসব এসএমএস, ই-মেইল ও অফার পাঠাই সেগুলো নিয়মিত দেখতে হবে। অনেকেই আছেন এগুলো সেভাবে দেখেন না। কিন্তু বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অফার দেয়া হয় যেগুলো আপনার বেশ কাজে লাগে। হয়তো আপনার কোনো একটা জিনিস প্রয়োজন এবং সামনে আপনি সেটা কেনার পরিকল্পনা করছেন। এখন যদি ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে এটি কেনার ক্ষেত্রে ছাড়ের অফার থাকে তাহলে আপনার প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি অর্থও সাশ্রয় হবে। পরিকল্পনা করে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করলে সুবিধাই বেশি।

ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধের জন্য এখন আর আপনার ব্যাংকে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাসায় বসে বিকাশ, নগদ, আইপে ওকে, ফিনস্মার্ট অ্যাপস ব্যবহার করে বিল জমা দিতে পারবেন। গত মাসে আমরা প্রিমিয়ার ব্যাংকের সহযোগিতায় বিইএফটিএনের মাধ্যমে বিল পরিশোধের সুবিধা চালু করেছি। ফলে আপনি যেকোনো ব্যাংকের মাধ্যমে অনলাইন সুবিধা নিয়ে ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ করতে পারছেন।

আমরা মাস্টারকার্ডে নিজস্ব সিএমএসের মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা দিই। আমাদের ভিসা কার্ডটি বর্তমানে কো-ব্র্যান্ডিং কার্ড। তৃতীয় পক্ষের সহায়তায় এটি করতে হয়। এ কার্ড আমরা নিজেদের সিএমএসের মধ্যে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছি। ফলে ভিসা কার্ডের গ্রাহকেরাও নিজেরাই গ্রিন পিন তৈরি করা, অব্যবহৃত ব্যালান্স বিইএফটিএনের মাধ্যমে স্থানান্তর, অনলাইনে ইজি পে সুবিধা পাবেন। আমরা ভার্চুয়াল কার্ড চালুর জন্য কাজ করছি। এর মাধ্যমে প্লাস্টিকের কার্ড ছাড়াই গ্রাহকেরা ভার্চুয়ালি অ্যাপসের মাধ্যমে লেনদেন করতে পারবেন। গ্রাহক আমাদের লক্ষ্মী। তাই তাদের কীভাবে বেশি সুবিধা দেয়া যায় আমাদের সে প্রচেষ্টা সবসময় চলমান রয়েছে।