দেশের বিদ্যুৎ খাতের উৎপাদন সক্ষমতা এখন ২৭ হাজার মেগাওয়াটের ওপরে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতের উৎপাদন সক্ষমতা ১০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২০৪১ সাল নাগাদ বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা ৬০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকারের। জ্বীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও অন্তভুক্ত। গত প্রায় তিন দশকে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে বেসরকারি খাত ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। সরকার মনে করছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে এ খাতে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ১৭০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। এই বিনিয়োগ দিয়ে বিদ্যুৎ খাতে স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র, বিদ্যুতের জ্বালানি আমদানি, স্থানীয় জ্বালানি খাতের অবকাঠামো নির্মাণ, গ্যাস অনুসন্ধান কাজ করা হবে।
বিদ্যুতের নীতি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলের হিসাব অনুযায়ী, দেশে গ্যাস ও এলএনজিভিত্তিক নির্মাণাধীন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ৪ হাজার ৩৪০ মেগাওয়াট, দরপত্র ও চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়াধীন ২ হাজার ২২০ মেগাওয়াট, পরিকল্পনায় আরো ১০টি গ্যাস ও এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চিন্তা রয়েছে। যেগুলোর মোট সক্ষমতা সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্য করার জন্য বৃহৎ পরিসরে আন্তঃদেশীয় গ্রিড সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
গত ২৭ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আনা হয়েছে। দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো স্থাপিত হয়েছে দেশী বিনিয়োগকারীদের দ্বারা দেশী-বিদেশী অর্থায়নে। বাজেটকে সামনে রেখে এ খাতটির সমস্যা ও প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ও সামিট করপোরেশনের এমডি ফয়সাল খান।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১০ হাজার মেগাওয়াটের ওপর। যার বড় একটি অংশ তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। জ্বালানিসাশ্রয়ী বিবেচনায় এ কেন্দ্রগুলোর বড় সক্ষমতা বসে থাকছে। এতে বেসরকারি খাতের আর্থিক প্রভাবটা কী?
বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক চাহিদা মেটাচ্ছে বেসরকারি খাত। গত ২৭ বছরে এ খাতে ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ আনা হয়েছে। দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো স্থাপিত হয়েছে দেশী বিনিয়োগকারীদের দ্বারা দেশী-বিদেশী অর্থায়নে। দেশের বলিষ্ঠ প্রকল্প চুক্তি এবং বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন নীতিমালার কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগ আনা সম্ভব হয়েছে, যদিও তখন এই খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা কম ছিল। উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন ইঞ্জিন এবং গ্যাস টারবাইন স্থাপনের মাধ্যমে বেসরকারি খাতই বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রযুক্তি-হস্তান্তরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।
তবে বর্তমানে বিপিডিবির বিলম্বিত বিল পরিশোধের কারণে আইপিপিগুলো বেকায়দায় পড়েছে। উচ্চ সুদহার এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আইপিপিগুলো বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমাদের ভর্তুকি এবং প্রাপ্য অর্থ সময়মতো দেয়ার জন্য অনুরোধ করছি।
বিদ্যুতের বকেয়া বিল সরকার এখন বিশেষ বন্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করছে। এ পদ্ধতিতে অর্থ পরিশোধ হলে বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কোনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে কি না?
বিশেষ বন্ডের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করাটা একটা সাময়িক সমাধান হতে পারে। বন্ডগুলো স্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে আইপিপিগুলোর ক্রেডিট লাইন সুরাহা করেছে; কিন্তু কোনো নগদ অর্থ প্রদান করেনি। এর ফলে আইপিপিগুলোকে তারল্যের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে আবার ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। উচ্চ সুদহারের এই সময়ে, আইপিপিগুলোর পক্ষে ঋণ হিসাবে প্রয়োজনীয় নগদ প্রবাহ পাওয়া সম্ভব নয়।
আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে কোন দিকটা বিশেষ জোর দেয়ার কথা বলবেন আপনারা? আসন্ন বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বাড়াতে এ খাতের জন্য আলাদাভাবে বাজেট বরাদ্দ রাখার প্রয়োজন আছে কিনা? এমনকি জ্বালানি নিরাপত্তায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীরা কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারকে কী ধরনের সহায়তা দেয়া যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন।
আসন্ন বাজেটে আইপিপির পক্ষ থেকে অনুরোধ থাকবে, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করতে খাতটিতে যেন প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ভর্তুকিও যেন দ্রুত হস্তান্তর করা হয়।
যদি আমদানির ক্ষেত্রে কাস্টমস ট্যাক্স ও ডিউটি কমিয়ে আনা হয়; তাহলে এইচএফওভিত্তিক আইপিপিগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। বর্তমানে এইচএফও আমদানির ক্ষেত্রে ৩৪ শতাংশ ট্যাক্স গুনতে হয়। অথচ পরিবেশের জন্য তুলনামূলক বেশি ক্ষতিকর জ্বালানি কয়লা আমদানির ক্ষেত্রে তা মাত্র ৫ শতাংশ। বিপ্পার প্রস্তাব, সব ধরনের জ্বালানিতে একটা সমন্বিত কর চালু হোক।
২০৪১ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৬০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সরকার নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ওপর জোর দিচ্ছে। বেসরকারি খাত এগিয়ে এলে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে বিশেষত সৌরবিদ্যুতে জমিসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হচ্ছে। জমির ক্ষেত্রে সরকার কী ধরনের সহায়তা দিতে পারে। এমনকি সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশ আমদানি করছাড়ের বিষয়ে নতুন কোনো প্রস্তাব রয়েছে কিনা।
নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নির্ভরযোগ্য এবং বেসলোড বিদ্যুৎ উৎপাদন অবশ্যই ভবিষ্যৎ। তবে বাংলাদেশের জন্য সেটা অনেক সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। কারণ এখানে ভৌগোলিকভাবে ফটোভোলটাইক এবং বায়ুর সম্ভাবনা বেশ সীমিত। অন্যদিকে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি তাই এখানে জমির সীমাবদ্ধতাও ব্যাপক। বাংলাদেশের গৃহস্থালি কাজে এবং শিল্প খাতে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়ায় এলএনজি থেকে সুবিধা নেয়া যেতে পারে। দেশে গ্যাসভিত্তিক গ্রিডও বেশ বিস্তৃত হয়েছে এবং প্রতি বছর প্রসারিত হচ্ছে। এছাড়া বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর এবং দিনরাত ২৪ ঘণ্টা নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে পারে। আমরা আশা করতে পারি, এলএনজির দাম প্রতিযোগিতামূলক হবে, যদি আরো লিকুইফ্যাকশন প্লান্ট চালু হয় এবং অন্যান্য দেশও প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে সরে আসতে থাকে।
বিগত কয়েক অর্থবছরে সরকার বিদ্যুতের সঞ্চালন খাতে গুরুত্ব দিচ্ছে, বিশেষ করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হচ্ছে বিদেশ থেকে। এ জায়গায় বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতে উদ্যোক্তাদের কী ধরনের কাজ করা সুযোগ রয়েছে?
আগামী দিনগুলোয় ট্রান্সমিশন এবং ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমে উচ্চ বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা জেনে খুশি হয়েছি যে সরকার ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য নীতিমালা কাঠামো তৈরি করছে।
সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমন্বিত মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছে। এই পরিকল্পনায় বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারিখাতের বিনিয়োগের সম্ভাবনা কতটুকু বেড়েছে? সমন্বিত এই মহাপরিকল্পনায় বিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তা জ্বালানিখাতে বড় আকারে বিনিয়োগের সুযোগ আছে কিনা?
যদি লক্ষ করেন, ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ যখন বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুরুর চেষ্টা করছিল তখন বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগে কিন্তু দেশীয় বিনিয়োগকারীরাই ঝুঁকি নিয়েছিলেন। সেই বিবেচনায়, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিষয়ে দেশীয় বিনিয়োগকারীরা বেশি আত্মবিশ্বাসী।
আমরা বিশ্বাস করি, আগামীতে দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের যৌথ অংশগ্রহণে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে। তবে যেহেতু ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আগে থেকেই সবকিছু অনুমান করা যায় না তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় ভবিষ্যতে এই মহাপরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন করতেও হতে পারে। আমরা করোনা মহামারী ও সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকে এই শিক্ষাই পেয়েছি। বিশ্বের সবাইকে শূন্য কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সচেতন হতে হবে।





