গত এক দশকে দেশের ডিজিটাল লেনদেনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস)। মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে পরিচিত এ ব্যবস্থায় এখন প্রতি মাসে লাখ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গত ডিসেম্বরে এমএফএসের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। এর আগে নভেম্বরে ১ লাখ ১৯ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। বর্তমানে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ২২ কোটি ৪ লাখ ৫৭ হাজার ৪৪৮। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে দেশে ডিজিটাল কেনাকাটা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোও গ্রাহকদের কেনাকাটায় উত্সাহিত করতে বিভিন্ন ধরনের ছাড়সহ অফার ঘোষণা করছে।
মাত্র পাঁচ বছরেই নগদ দেশের অন্যতম সেরা মোবাইল আর্থিক সেবা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন কাজ করছে ডিজিটাল ব্যাংক নিয়ে। আর্থিক খাতের নানা দিক নিয়ে বণিক বার্তার প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর এ মিশুক
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ফেব্রুয়ারির হিসাব অনুযায়ী, দেশে এমএফএস অ্যাকাউন্ট রয়েছে ২২ কোটি ১৪ লাখ অথচ দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি। জনসংখ্যার চেয়ে এমএফএস অ্যাকাউন্ট বেশি হলো কীভাবে?
এটা আসলে খুব সহজ হিসাব। ধরেন নগদের নয় কোটি গ্রাহকের প্রত্যেকেই যদি আরো চারটা অপারেটরের অ্যাকাউন্ট খোলে তাহলে মোট অ্যাকাউন্ট কিন্তু ৩৬ কোটি হবে। এর অর্থ এই নয় যে গ্রাহক ৩৬ কোটি! আমাদের এখানে যেহেতু এখন ১৩টি অপারেটর সেবা দিচ্ছে আমি মনে করি সামনের দিনে অ্যাকাউন্ট আরো বাড়বে।
দেশের এমএফএস কোম্পানিগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি কী?
দেখুন আমি বলি এফএফএসের মাধ্যমে যা যা করা সম্ভব ছিল তার প্রায় সবই করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে ক্ষুদ্র লেনদেনের আওতায় আনা, কিছু মাত্রায় কেনাকাটা করা, ছোট অংকের টাকা স্থানান্তর, কিছু বিল পেমেন্ট, মোবাইল রিচার্জ—এসবই এমএফএস করেছে। আমি মনে করি, এমএফএস দিয়ে যতদূর পৌঁছার তা হয়ে গেছে। এর পরও কোটি কোটি মানুষ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বাইরে রয়েছে। সময় এখন ঘুরে দাঁড়ানোর। নতুন নতুন চাহিদার বিপরীতে দেশে এখন ডিজিটাল ব্যাংকের প্রয়োজন। সেদিকেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।
ব্যাংকগুলো এটিএম বুথের সেবা সম্প্রসারিত করছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে উপশাখা খুলছে, ডিজিটাল ব্যাংকিং, বাংলা কিউআর এসেছে। নতুন এসব উদ্যোগকে আপনারা কীভাবে দেখছেন, এগুলো আপনাদের সেবায় কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে কিনা।
অবশ্যই না। দেশের আর্থিক খাতের বাজার অনেক বড়। আমি মনে করি সবাই মিলে কাজ করেও আরো অনেক অপরচুনিটি থেকে যাবে। আমরা সবসময় আর্থিক খাতের ক্ষেত্রে নানান ধরনের বিকল্প রাখার পক্ষপাতী। আবার একজন আরেকজনের সহযোগিতায় লাগতে পারব। সেক্ষেত্রে গ্রাহকও পর্যাপ্ত বিকল্প পাবে। আর অর্থনীতিও তো বড় হচ্ছে।
সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, বিটিআরসির কাছ থেকে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
আমরা বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা চাই। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ সেটি নিশ্চিত করা। নতুন নতুন প্রযুক্তি আর উদ্ভাবনকে তারা উৎসাহিত করবে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নীতি সহায়তা দেবে—এটাই চাই। এসব ক্ষেত্রে আমি মনে করি নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ভালোই করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আপনারা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ছাড়াও ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে নানা সেবা নিয়ে আসছেন। এ খাতকে সম্প্রসারিত করতে নতুন আর কী সেবার পরিকল্পনা করছেন?
এখন যে সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি তাতে কেউ একা আর সবকিছু করতে পারবে না। অন্যের সঙ্গে হাতে হাত মেলাতেই হবে। শুধু ব্যাংক কেন, আমরা সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পার্টনারশিপের মাধ্যমে কাজ করার উদাহরণ তৈরি করছি। এ অনুশীলনকে আরো এগিয়ে নিতে চাই। খুব দ্রুত আমাদের ডিজিটাল ব্যাংক চালু হচ্ছে। আমরা তখন বিভিন্ন সেবা সংস্থার সঙ্গে পার্টনারশিপ করব। ইনফ্যাক্ট আমরা একটি সুপার অ্যাপের দিকে এগোতে চাচ্ছি। যেখানে দেশের সব সেবাকে একত্র করার পরিকল্পনা আছে।
দেশে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং ক্যাশলেস সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের সহযোগিতা চান?
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো এবং ক্যাশলেস সমাজ প্রতিষ্ঠায় সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের মোট লেনদেনের ৭৫ শতাংশ ক্যাশলেস করার ঘোষণা এসেছে। আমি মনে করি, এমন ঘোষণাও অর্জনের পথে বড় এক পদক্ষেপ। তাছাড়া ডিজিটাল ব্যাংক আসছে। ডিজিটাল ব্যাংক এসে গেলে লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে। তবে এখানেও আরো কিছু নীতি সহায়তা লাগবে। ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে ক্যাশলেস লেনদেন জনপ্রিয় হবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
বাজেট নিয়ে আমার প্রত্যাশা কেবল একজন ফিনটেক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয়। আমি ভাবি, আমাদের প্রতিটা বাজেট কী করে আমাদের রাষ্ট্রকে আরো কল্যাণমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে পারে। সেজন্য আমার প্রত্যাশা থাকে চিকিৎসা, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে যেন বরাদ্দ বাড়ে। প্রত্যাশা থাকে যে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর অব্যাহতি যেন চালু রাখা হয়। আমাদের একটি শক্তিশালী অর্থনীতি হয়ে উঠতে এর বিকল্প নেই। তবে মনে রাখতে হবে, পৃথিবীটা একটা ক্রান্তিকালের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। তাই সরকারের কাঁধে অস্বাভাবিক প্রত্যাশার বোঝা চাপানোও ঠিক হবে না।





