স্বাধীনতা-উত্তরকালে যে কয়টি খাত দেশকে অনন্য গৌরব এনে দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম তৈরি পোশাক শিল্প খাত। ১৯৭৭-৭৮ সালে ১২ হাজার ডলার নিয়ে যাত্রা শুরু করা পোশাক শিল্পটি আজ ৫০ বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হয়ে দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। শিল্পটি বেসরকারি সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাঁচ কোটি মানুষের রুটি-রুজির ব্যবস্থা করে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে আমাদের পোশাক রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ, যেখানে আগের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২২-২৩-এর জুলাই-এপ্রিল সময়ে ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। একই সময়ে আমরা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ পিছিয়ে পড়েছি।
এ পরিস্থিতিতে পোশাক শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য শিল্পের সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলো উন্মোচন করা দরকার। এ মুহূর্তে পোশাক শিল্পের জন্য সরকারের কাছ থেকে আমরা যে নীতিসহায়তাগুলো একান্তভাবে আশা করছি, সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হলো:
১. রফতানির বিপরীতে প্রযোজ্য উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে আগের মতো দশমিক ৫ শতাংশ করে আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত কার্যকর করা।
২. পোশাক শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রণোদনার জন্য প্রদানকৃত নগদ সহায়তার ওপর আয়কর কর্তনের হার ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা আবশ্যক।
৩. যেহেতু তৈরি পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে একটি চ্যালেঞ্জের মুখে আছে, বিশেষ করে দরপতন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির উভয়মুখী চাপ মোকাবেলা করতে হচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে রফতানির ওপর প্রচলিত ইনসেনটিভ
৪. রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পকে আমদানি-রফতানি পর্যায়ে এবং স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কিছু কিছু পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া আছে। রফতানিসংশ্লিষ্ট স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত প্রস্তাবিত পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট থেকে অব্যাহতির জন্য আমরা দীর্ঘদিন দাবি জানিয়ে আসছি।
৫. অগ্নি ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম আমদানির ওপর কর রেয়াত। এ পণ্যগুলো বিকল বা নষ্ট হলে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এসআরও নং ১২৯-আইন/২০২১/১৮-এ বর্ণিত পণ্য ও উপকরণগুলো পুনরায় আমদানি করতে শুল্ক পরিশোধ করে ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হয়। এগুলো প্রতিস্থাপনে রেয়াতি হারে আমদানির সুযোগদান যুক্তিযুক্ত।
৬) শ্রমিকদের জীবনমান ধরে রাখার জন্য বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৭) নন-কটন পণ্যের বৈশ্বিক বাজার এবং আমাদের রফতানি সম্ভাব্যতা বিবেচনার নিয়ে এ খাতে বিনিয়োগ ও রফতানি উৎসাহিত করতে এবং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে নন-কটন পোশাক রফতানির ওপর ১০ শতাংশ হারে বিশেষ প্রণোদনা দেয়া হলে উদ্যোক্তারা নন-কটন পোশাক রফতানিতে উৎসাহিত হবেন।
৮. রফতানি বাণিজ্যের বৃহত্তর স্বার্থে রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের রফতানিকারকদের ERQ (Exporter Retention Quata Fund) থেকে রফতানির প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য পরিশোধিত ফি হতে উৎসে আয়কর কর্তনের হার ২০ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা।
অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে আমাদের বেশকিছু চ্যালেঞ্জ আছে, বিশেষ করে কাস্টমস, বন্ড, ভ্যাট, বন্দর ও ব্যাংকিং-সংক্রান্ত জটিলতা। আমরা চেষ্টা করছি সরকারের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করে এগুলো সমাধান করার। এ বিষয়ে বাজেটে আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রয়েছে, যেমন ইএইচএস কোড জটিলতা, ওভেন পোশাক ওজন জটিলতা, সাব-কন্ট্রাক্টের ওপর ভ্যাটসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন ইত্যাদি। শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াগুলোকে আরো দ্রুততর ও সহজতর, বিশেষ করে আমদানীকৃত কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি দ্রুত খালাসসহ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াগুলো সহজীকরণ, হয়রানিমুক্ত এবং শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ও দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ এবং গ্যাসের মূল্য স্থিতিশীল রাখা অপরিহার্য। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আমাদের আরো বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশে এরই মধ্যে এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েট করেছে, যা ২০২৬ সালে কার্যকর হবে। এটি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য যেসব অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা রয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশের জন্য আর প্রযোজ্য হবে না। তাই এ ব্যাপারে বিচক্ষণতার সঙ্গে প্রস্তুতি নিতে হবে, হোক সেটি আন্তর্জাতিক বা স্থানীয় পর্যায়ে। কোন কোন দেশের সঙ্গে এফটিএ করা যেতে পারে, সেটিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিতে হবে।
সরকার অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে অর্থনীতিকে পরিচালনা করছে, যার প্রশংসা আন্তর্জাতিকভাবে আমরা পাচ্ছি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের অর্থনীতিতে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণাত্মক ব্যালান্স অব পেমেন্ট, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ কমে আসা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে অর্থনীতি বেশ চাপে রয়েছে। আমরা মনে করি, বৈশ্বিক সংকটকে আমরা পাশ কাটাতে পারব না, তাই যদি আমাদের অর্থনীতিকে কিছুটা সুরক্ষিত রাখতে পারি, সেটিই হবে আমাদের কৌশল। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও রফতানি আয়বৃদ্ধির মাধ্যমে লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষার জন্য রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প খাতের সামর্থ্য ও সম্ভবনাকে কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই।





