প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। বর্তমানে দেশের বাজারে পণ্যটির বার্ষিক চাহিদা ১৪ লাখ টনের ওপরে। আর এ খাতে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বাজার গড়ে উঠেছে। যার ৯৮ শতাংশই বিনিয়োগ হয়েছে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে। আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহের মধ্য দিয়ে এলপি গ্যাসের বাজার শুরু হলে তা প্রসারিত হয়ে এখন শিল্প, ব্যক্তিগত গাড়িতে অটোগ্যাস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসার প্রাক্কালে এ খাতে অবকাঠামো, মজুদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে পাইপলাইনের গ্যাসের মতো সারা দেশে এলপি গ্যাস সরবরাহ সম্ভব।
প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ সংকটে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যাপক হারে চাহিদা বেড়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি)। দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা ১৪ লাখ টনের ওপরে। এ খাতে বিনিয়োগ এখন ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ খাতের অপারেটররা আরো এগিয়ে যেতে চান। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে পলিসি, অবকাঠামো সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে প্রত্যাশা, প্রসারসহ নানা বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার কথা হয় এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি ও ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে. চৌধুরীর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবু তাহের
দেশের বাজারে প্রতি বছর এলপি গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে বার্ষিক এলপি গ্যাসের চাহিদা ১৪ লাখ টন। এ পরিমাণ এলপি গ্যাস বাজারে সরবরাহে অনেকগুলো কোম্পানির প্রতিযোগিতা করছে। টেকসই ও জ্বালানি নিরাপত্তায় এলপি গ্যাসের বাজার প্রসারে লোয়াবের পরিকল্পনা কী?
এলপি গ্যাসের টেকসই নিরাপত্তার কথা বলছেন। প্রথমত, বাজারে এলপি গ্যাস সরবরাহে এখাতের সাপ্লাই চেইন ও অবকাঠামো নিরাপদ করা। এ খাতে শুরুতে অনেকেই বুঝেতে পারেনি যে এটা একটা ক্যাপিটাল ইনটেনসিভ ইন্ডাস্ট্রি। যেখানে স্টোরেজ, ফিলিং ক্যাপাসিটি, সিলিন্ডারসহ নানা ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে। এ কারণে পুরো প্যাকেজ থেকে বেরিয়ে এসে একটা অংশ দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন অনেকেই। কিন্তু বাজারে এলপি গ্যাসের যে পরিমাণ চাহিদা তার জন্য একটা কমপ্রিহেনসিভ সাপ্লাই সিস্টেম গড়ে তোলা দরকার ছিল, যেটা শুরুতেই করা যায়নি।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিরাপত্তা। সেটা প্রাকৃতিক গ্যাস, এলপিজি কিংবা অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য হোক না কেন। প্রত্যেকটির একটা নিরাপদ ব্যবস্থাপনা দরকার। অপারেটররা তার জায়গা থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা গড়ে তুললেও পরিবেশক, ডিলার কিংবা রিটেইলার পর্যায়ে এটার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরিভাবে গড়ে তোলা যায়নি। গ্রাহক যারা আছেন, তারাও এলপিজি পণ্যটি অন্যান্য পণ্যের মতো ব্যবহার করছেন। ফলে তারা বাজার থেকে একটা সিলিন্ডার কিনছেন, সেটি পরিবহনে সতর্কতা, প্রতিস্থাপন, ব্যবহারের নিয়মাবলি এসব বিষয়ে পুরোপুরি ধারণা না নিয়েই তারা এটা ব্যবহার করছেন। এটার বিষয়ে যতক্ষণ পর্যন্ত না গ্রাহক সচেতনতা তৈরি করা যাবে, ততক্ষণ একটা ঝুঁকি থেকেই যাবে।
গ্যাস সংকটে শিল্প মালিকরা এলপি গ্যাসের কারিগরি সিস্টেম প্রতিস্থাপন করছেন। এ খাতে ব্যবহার বাড়াতে সরকারের নীতিগত কোনো সহায়তার প্রয়োজন দেখেন কিনা?
বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটা সেমিনার করেছিলাম আমরা। সেখানে আমরা উপস্থাপন করেছিলাম, মূলত প্রাকৃতিক গ্যাসের সংযোগ যেখানে নেই, সেখানে বিকল্প হিসেবে কীভাবে এলপি গ্যাস ব্যবহার করা যায়। ওই সেমিনারে আমরা মূলত এলপি গ্যাসের প্রসারে কী কী অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার এবং সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, সেটিকে দেখানোর চেষ্টা করেছি। এ সেমিনারের পর একটা পলিসি অনুমোদন হয়েছে। যেটি হাইড্রোকার্বন ইউনিটও অনুমোদন দিয়েছে।
একজন শিল্প মালিক তার কারখানা পরিচালনার জন্য যদি এলপি গ্যাস সিস্টেম গড়ে তুলতে চান, তার জন্য কিন্তু মোটা অংকের অর্থ ব্যয় প্রয়োজন। মজার ব্যাপার হলো প্রাকৃতিক গ্যাসে যে ধরনের ক্যারিগরি সাপোর্ট দরকার, এলপি গ্যাসের সিস্টেম প্রতিস্থাপনে সেই অর্থে বড় কোনো কারিগরি সহায়তার প্রয়োজন নেই। এ ধরনের সিস্টেম প্রতিস্থাপনে দেড়-দুই কোটি টাকার মতো ব্যয় হতে পারে। এক্ষেত্রে শিল্প খাতে এ ধরনের স্থাপনা গড়ে তুলতে সরকার যাতে ট্যাক্স আরোপ না করে, সেজন্য সরকারের দিক থেকে কর ছাড় দিতে হবে। তাহলে সহনীয় মূল্যে একটি গ্যাস সরবরাহ ও সিস্টেম প্রতিস্থাপন করতে আগ্রহী হবেন শিল্প মালিকেরা।
এলপি গ্যাসের বাজার প্রসারের ক্ষেত্রে আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেটে এলপি গ্যাস খাতে কোনো ধরনের প্রণোদনা বা করছাড়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা?
এলপিজি খাতে ট্যাক্সের বিষয়টি বাজেটে বিবেচনায় নিতে হবে। এ খাতে যাতে নতুন করে আর কোনো ট্যাক্স আরোপ না হয়, সেটা দেখতে হবে। আবার এটাও দেখা দরকার, ট্যাক্স ছাড়া তো সরকার দেশ পরিচালনা করতে পারবে না।
অপারেটর পর্যায়ে এলপিজিতে ট্যাক্স রয়েছে ৫ শতাংশ আর ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ে ২ শতাংশ। তাদের ট্যাক্সটা সরকার আদায় করতে না পারায় সেটা অপারেটরদের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে। সরকার এভাবে ট্যাক্স করলে মার্কেট লেভেলে তার প্রভাব পড়ছে। ফলে লোয়াব মনে করে, এলপিচি খাতে যার যার ট্যাক্স তাকেই দিতে হবে। এ খাতে সরকারের ট্যাক্স আদায়ের যে পলিসি এটা নিয়ে আমাদের কথা বলার প্রয়োজন রয়েছে। আপনি দেখেন, সরকার বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি পণ্যে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। কিন্তু এলপিজিতে কোনো ভর্তুকি নেই। পুরোপুরিভাবে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ হচ্ছে পণ্যটি। ভর্তুকি বাদ দিলে অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের সঙ্গে এলপিজি তুলনা করতে দাম অনেক কম।
বিইআরসি ঘোষিত এলপি গ্যাসের দাম নিয়ে গ্রাহকরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, কমিশন ঘোষিত দামে বাজারে এলপি গ্যাস সরবরাহ করেন না অপারেটররা। কথাটি কতটুকু সত্য। এলপি গ্যাসের দামের দাম বাস্তবায়নে অপারেটরা কতটুকু আগ্রহী?
এলপিজি গ্যাসের দাম নির্ধারণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কোনো বিধিমালা নেই। যেটা ডিজেল, কেরোসিন বা অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের জন্য রয়েছে। এলপি গ্যাসের খরচ নিয়ে আমরা বিইআরসিতে আমাদের বক্তব্য দিয়েছি। আমরা লোয়াবের পক্ষ থেকে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি। এর পরও কিছু কিছু জায়গায় জটিলতা থেকেই গেছে, যেটি নিরসর হওয়া জরুরি। তাহলে অপারেটর কিংবা ভোক্তা দুই পক্ষের জন্যই ভালো।
গ্রিন ফুয়েল হিসেবে এলপি গ্যাসের পরিচিতি দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে এলপি গ্যাসের দুর্ঘটনাও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। গ্রাহক সচেতনতা বাড়াতে লোয়াব কী ধরনের কাজ করছে? পরিবেশক ও রিটেইলার পর্যায়ে সচেতনার বিষয়টি কীভাবে প্রচার করছেন আপনারা?
আমরা বিষয়টি নিয়ে খুব ভালো প্রোগাম হাতে নিয়েছি। জাতীয় পর্যায়ে এ নিয়ে একটা নিরাপত্তাবিষয়ক সম্মেলন করতে চাই। দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে এলপি গ্যাসের সব ধরনের ভোক্তাদের (আবাসিক, শিল্প, অটোগ্যাস) এ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানাতে চাই। এটা আসলে সম্মেলনের আদলে একটা ওয়ার্কশপ। যেখানে নিরাপত্তাবিষয়ক সব ধরনের টুলসগুলো নিয়ে আমরা কথা বলব। এছাড়া প্রত্যেক অপারেটরের একটা বাধ্যতামূলক সেফটি বুক তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে আমাদের। এ বই ভোক্তারা যাতে পেতে পারে সেজন্য ডিলার ও পরিবেশককে বাধ্য করার চেষ্টা রয়েছে এবং ওই ডিলারদের যে লোকবল রয়েছে, তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে পারে সে বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন আমাদের।
এলপিজি ব্যবসায় বাজারে বেশ কয়েকটি বিদেশী কোম্পানি ব্যবসা শুরু করেছে। বিদেশী কোম্পানি দেশের ছোট বাজারে ব্যবসা করায় কোনো ধরনের সংকট মনে করেন কিনা? লোয়াব এটি কীভাবে দেখে?
বিদেশী যেসব কোম্পানি আমাদের দেশে এলপিজি খাতে ব্যবসা করছে, তারা কিন্তু নতুন কোনো অবকাঠামো গড়ে তোলেনি। এ খাতে বিনিয়োগের জন্য যে পরিমাণ ক্যাপিটাল ইনটেনসিভ দরকার তা নিয়েই কিন্তু তারা এ ব্যবসায় নেমেছে। বিদেশী কোম্পানি মনে করে তারা এখানে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশে ভালো ব্যবসা করবে। কারণ তাদের সে ধরনের ক্যাপিটাল রয়েছে, সেই লক্ষ্যও রয়েছে। এটা এ খাতের বাজারের জন্য ভালো। কারণ তারা মনে করে এখানে বড় বাজার রয়েছে। কিন্তু বিদেশী কোম্পানি যারা ব্যবসা করছে তারা কিন্তু শীর্ষ পাঁচটি কোম্পানি তালিকায় এখনো উঠে আসতে পারেনি।
গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে এলপিজি অবকাঠামো গড়ে তোলা যায় কিনা, বেসরকারি উদ্যোক্তারা কী ধরনের কাজ করতে পারেন এখানে?
এলপিজি খাতের অবকাঠামোয় এখন সেন্ট্রালাইজ সিস্টেম গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রাকৃতিক গ্যাস যেমন পাইপলাইনে সরবরাহ করা হচ্ছে। সে রকম একটা সিস্টেম। এটা আঞ্চলিকভাবে হতে পারে। অর্থাৎ স্যাটেলাইট টাউনশিপের মাধ্যমে এলপিজি সরবরাহ করা যায়। যেমন কোনো একটি বিভাগীয় শহরে পাইপলাইনের এলপি গ্যাস সরবরাহ করা হবে, তার জন্য সেন্ট্রাল স্টোরেজ সিস্টেম করতে হবে। যেখানে রোড ট্যাঙ্কার কিংবা বার্জের মাধ্যমে এসব সেন্ট্রাল স্ট্রোরেজে এলপিজি সরবরাহের ব্যবস্থাপনা থাকবে। এরপর একটি নির্দিষ্ট স্টোরেজ থেকে ওই অঞ্চলে পাইপলাইনের মাধ্যমে ভোক্তার বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ করা হবে।
সরকার বৃহৎ আকারে এলপি গ্যাসের স্টোরেজ ক্যাপাসিটি গড়ে তুলতে চায় মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে। এটি দীর্ঘদিন ধরে বলে এলেও অর্থ সংকটের কারণে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বেসরকারি খাত এগিয়ে আসতে পারে কিনা?
মাতারবাড়ীতে সরকার এলপিজি স্টোরেজ গড়ে তোলার জন্য অনেক আগেই উদ্যোগ নিয়েছিল এবং সেখানে ভূমি উন্নয়ন, গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলার জন্য জাপান সরকার বড় অংকের ঋণ দিতে চেয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা গেছে যে পরিমাণ ঋণ দেয়ার কথা ছিল, সেটি বাংলাদেশে আসেনি। বর্তমানে একটি মাত্র বিদ্যুৎ কেন্দ্র জাপানি অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়েছে সেখানে। তবে এলপিজি স্টোরেজ ক্যাপাসিটি বেসরকারি অর্থায়নে গড়ে তোলা যাবে ওখানে। ৯৮ শতাংশ এলপিজি কিন্তু বেসরকারি খাত সরবরাহ করছে। ওমেরা নিজেও এ খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু তার জন্য একটা ডিপ সি টার্মিনাল দরকার। কারণ এটা ছাড়া এ ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা যাবে না। কারণ এখানে বড় বড় জাহাজ আসা-যাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। যার মাধ্যমে সাপ্লাই চেইনটা স্বাভাবিক থাকবে। সরকার এলপিজি স্টোরেজ অবকাঠামো করুক বা না-ই করুক বেসরকারি খাত ঠিকই কিন্তু একটা সময় এটার উন্নয়ন করে ফেলবে।





