বাংলাদেশে আবাসন খাত ৩০ বছর ধরে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আবাসন খাতে বাংলাদেশ অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে চলেছে। কর্মসংস্থানসহ দেশের অন্যান্য শিল্প খাতের বিকাশেও ভূমিকা রয়েছে আবাসন খাতের। বিদেশী ব্যক্তিদের বাংলাদেশে জমি বা বাড়ি কেনার ক্ষেত্রে আগে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে সরকার ১৯৯৬ সালে বিদেশীদের কেবল ফ্ল্যাট কেনার অনুমতি দেয়। এর পর থেকে খাতটি দিনদিন উন্নতি করতে থাকে। নিবন্ধন অধিদপ্তরের অনানুষ্ঠানিক তথ্য অনুসারে, ২০১৩ থেকে ২০২২ এ ১০ বছরে বিক্রি হয় ২ হাজার ৪৮৬টি ফ্ল্যাট। এর মধ্যে বিদেশী নাগরিকরা ১ হাজার ৩০৪টি এবং বিদেশী বিভিন্ন কোম্পানি ১ হাজার ১৮২টি ফ্ল্যাট কিনেছে। গত বছর বিদেশীদের কাছে বিক্রি হওয়া ২১৬টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ১০৪টির অবস্থান রাজধানীর গুলশান, বনানী, বাড্ডা, উত্তরা ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। বাকিগুলো বিক্রি হয়েছে রাজধানীর অন্যান্য এলাকায় এবং দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে। তবে বর্তমানে দেশে জমি এবং ফ্ল্যাটের নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। বেড়েছে নিবন্ধন খরচও। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কমে গেছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। এসব কারণে মন্দা অবস্থা চলছে দেশের আবাসন খাতে। তবে এ খাতকে বিশেষ সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা গেলে খাতটি দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখবে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিগত এক দশকে দেশের আবাসন শিল্পে নানাবিধ সমস্যা তৈরি হয়েছে। বাজেটকে সামনে রেখে এ খাতের সমস্যা ও প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলেছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন (রিহ্যাব)-এর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী ভূঁইয়া
আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে আবাসন ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা কী? কেমন বাজেট চান আপনারা?
ব্যবসায়ী হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা বাজেট যেন সবার জন্য উপকারী ও ব্যবসায়ীবান্ধব হয়। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশকে আরো সুদৃঢ় করতে শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব বাজেট চাই। আমরা চাই নির্মাণসামগ্রীর মূল্য কমানো হোক। আমাদের নিবন্ধন ব্যয় কমানো এবং স্বল্প ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর আবাসনের লক্ষ্যে বিশেষ তহবিল গঠন করা হোক।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আবাসন ব্যবসা কেমন চলছে? চলমান অর্থনৈতিক সংকট বিশেষ করে ডলার সংকট আবাসন খাতে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে?
আবাসন ব্যবসা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। বিগত এক দশকে দেশের আবাসন শিল্পে নানাবিধ সমস্যা তৈরি হয়েছে। কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে বৈশ্বিকভাবে। বিশেষ করে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি। আবার কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে আমাদের নীতিসহায়তার অভাবে। নতুন ড্যাপে ফার হ্রাস, নিবন্ধন ব্যয় বৃদ্ধি ও গৃহ ঋণের সুদহার বৃদ্ধিসহ নানা কারণে আবাসন শিল্প চাপে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান ডলার সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের সমগ্র অর্থনীতিতে। বিশেষ করে পণ্য আমদানিতে ডলার সংকটের প্রভাব ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাড়িয়েছে বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যয়। অনেক ব্যাংক নতুন করে এলসি খুলতেও পারছে না। নির্মাণের মূল উপকরণ রডের দাম বাড়তি। এমনিতেই আবাসন খাত এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। এর মধ্যে নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এতে প্রতি বর্গফুটে অপ্রত্যাশিতভাবে নির্মাণ খরচ বেড়েছে। রড, সিমেন্ট, ইট, বালি থেকে শুরু করে সব ধরনের নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। বেড়ে গেছে শ্রমিকের মজুরিও। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এদিকে রডের পাশাপাশি দাম বাড়ছে সিমেন্টেরও। ডলার সংকটের কারণে নির্মাণসামগ্রীর যেসব কাঁচামাল আমদানি করা হয়, সেগুলোর দাম বেড়েছে।
টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আগামী দিনের ব্যবসা কেমন যাবে? এজন্য কোনো প্রস্তুতি আছে কি? বাজেটে এ নিয়ে কী সমাধান থাকা উচিত?
টাকা অবমূল্যায়নের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশে যে মূল্যস্ফীতি দেখা গেছে তার অর্ধেকই স্থানীয় মুদ্রা টাকার অবমূল্যায়নের কারণে। চলতি হিসাবে ঘাটতি ও বৈশ্বিক আর্থিক নীতির সংকোচন টাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে ও বৈদেশিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন করেছে। টাকার অবমূল্যায়নের কারণে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে আমাদের ওপর। ফ্ল্যাট নির্মাণ করতে খরচ বাড়ছে। ফলে ফ্ল্যাটের দাম বাড়ছে। আগামীতে হয়তো আরো বাড়বে। বাজেটে সরকারকে এ বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।
আবাসন খাতে মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীদের টিকে থাকা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংকট কাটিয়ে উঠতে আপনার সুপারিশ কী?
আবাসন খাতের বিকাশে মাঝারি ও ছোট ব্যবসায়ীদের বড় ভূমিকা রয়েছে। নানা সমস্যায় তাদের ব্যবসা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মাধ্যমে কিন্তু কর্মসংস্থান হচ্ছে। আমার মনে হয় মাঝারি ও ছোট উদ্যোক্তাদের আয়কর কমিয়ে দেয়া উচিত।
রড-সিমেন্ট-টাইলস সবকিছুর দাম দিন দিন বাড়ছে। আবাসন ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে শুল্ক কমানোর দাবি জানানো হচ্ছে। আপনার ভাবনা কী?
আগেই বলেছি নানাবিধ কারণে রড-সিমেন্ট-টাইলস সবকিছুর দাম দিন দিন বাড়ছে। আমাদের আবাসন ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে শুল্ক কমানোর কথা বলা হয়েছে। আমরা চাই এর একটা সমাধান হোক। সবদিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।
আগামী ১০ বছরের জন্য আবাসন খাতে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ চাওয়া হয়েছে রিহ্যাবের পক্ষ থেকে। এ দাবির বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।
বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার কথা আমরা বলিনি। আমরা বলেছি অপ্রদর্শিত আয় বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার জন্য। যে আয় বৈধ উপায়ে অর্জিত হয়েছে কিন্তু আয়কর দেয়া হয়নি, এমন আয়কে আমরা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়ার কথা বলেছি। এটা করলে দেশের টাকা দেশে থাকবে। আপনি জানেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ টাকা পাচার হয়ে সে দেশে আবাসনে বিনিয়োগ হচ্ছে। আমাদের দেশে বিনিয়োগের সুযোগ দিলে সেটা অর্থনীতির মূল স্রোতে ফিরে আসবে।





