ডেমোক্রেটিক বাজেট মুভমেন্ট (ডিবিএম) নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি অরাজনৈতিক ও অলাভজনক প্লাটফর্ম যার লক্ষ্য হচ্ছে কেন্দ্র ও প্রশাসননির্ভর জাতীয় বাজেটকে জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে সাধারণ নাগরিকের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সেজন্য সারা দেশে সামাজিক উদ্যোগ জোরদার করা। জেলাবাজেটসহ ‘বাজেট বিকেন্দ্রীকরণ’ ডিবিএমের একটি ফ্ল্যাগশিপ ক্যাম্পেইন। এ বিষয়ে ডিবিএম গত এক যুগেরও বেশি সময় গবেষণা, বাজেট সাক্ষরতা ও অ্যাডভোকেসি করে আসছে। ডিবিএম ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠন আয়োজিত ‘জন বাজেট সংসদ’ শীর্ষক ছায়া বাজেট সংসদ এক দশক ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে সাধারণ করদাতা, উদ্যোক্তা, কৃষক-শ্রমিক, নারী, দলিত, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী, গবেষক, জনপ্রতিনিধি, ট্রেড ইউনিয়নকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধি এ সংসদে উপস্থিত থেকে জাতীয় বাজেট বিষয়ে তাদের সুচিন্তিত মতামত দেন এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে তা উপস্থাপন করেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জলবায়ু ও আর্থিক সংকট মোকাবেলাকে প্রাধান্য দিয়ে জনবাজেট প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।

গত কয়েক বছরের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। অর্থমন্ত্রী আগামী তিন অর্থবছরের মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিয়েছেন ৬ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে ঘোষণা দেয়া হবে। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৬ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। দেখার বিষয় আইএমএফের ক্রমাগত চাপে এ লক্ষ্যমাত্রা শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে কিনা। কেননা বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। গত দুই বছরের বেশি সময়ে প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি অব্যাহত আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে গত মার্চে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৮১ শতাংশ। যার মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ, বিআইডিএসের হিসাবে তা ১৫ শতাংশ প্রায়। 

এদিকে বেসরকারি বিভিন্ন জরিপ বলছে, জনসাধারণের আয় বাড়েনি, বরং কমেছে। তার ওপর বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর মাত্রাতিরিক্ত ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাসের উচ্চ ট্যারিফ সাধারণের প্রকৃত আয়কে একেবারে চেপে ধরেছে। বিগত দুই বছরে বিশ্ববাজারে পণ্যের মূল্য বেড়েছে, ওই সময় দেশেও তা বেড়েছে। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক কমলেও আমাদের মূল্যস্ফীতির সংকট বেড়েই চলছে। 

মূল্যস্ফীতির ফলে বাড়ছে দারিদ্র্য। এক্ষেত্রে ২০২৪-২৫ বাজেট সাধারণ করদাতা, উদ্যোক্তা ও সরকারের জন্য বিশাল একটা চ্যালেঞ্জ। বিআইডিএসের হিসাব অনুযায়ী করোনাকালে শুধু ঢাকার নিম্ন আয়ের মানুষের ৫১ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। মূল্যস্ফীতির সরাসরি অভিঘাত পড়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর পুষ্টিতে। করোনাকালে অনেক শিশু স্কুল থেকে আগেই ঝরে পড়েছে। অথচ সরকার এ বছরের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বাজেটসহ অপরিহার্য পরিষেবা খাতে বাজেট কর্তন করেছে, যা সাধারণের আর্থিক চাপকে আরো বেকায়দায় ফেলবে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন পেশাজীবী ও নাগরিক সংগঠনের দাবি ছিল যে সরকারের অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী প্রকল্পে ব্যয় কমিয়ে তা সামাজিক সুরক্ষা, নাগরিক পরিষেবা খাত ও কৃষির মতো শ্রমঘন উৎপাদনশীল খাতে পুনর্বণ্টন করা হোক। 

বলাবাহুল্য, নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি। কারণ তারা আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যয় করে খাদ্য ক্রয়ে। বিভিন্ন মিডিয়া রিপোর্ট ও বেসরকারি জরিপের ফলাফল বলছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এক বেলা না খেয়ে থাকছে নিম্ন আয়ের অসংখ্য পরিবার। ফলে মূল্যস্ফীতির প্রথম অভিঘাত পড়ছে দরিদ্র পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টিতে। বর্তমানে চার সদস্যের একটা পরিবারের সুষম খাদ্য সরবরাহে প্রতি মাসে প্রয়োজন হয় ন্যূনতম ১৯ হাজার টাকা। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত নিয়মিত-অনিয়মিত দিনমজুরসহ স্বনিয়োজিত নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে এই পুষ্টি জোগানো প্রায় অসম্ভব। সেখানে খোলাবাজারে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রয়সহ পাবলিক ফুড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমে বাজেট বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি টার্গেট গ্রুপভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরাসরি আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ও পরিধিও বাড়ানো দরকার। ফ্যামিলি ফ্রেন্ডলি কার্ড কর্মসূচিকে আরো শক্তিশালী করা জরুরি। 

পাশাপাশি কর কাঠামোয় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ভ্যাটের মতো পরোক্ষ কর নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তুলনামূলক বেশি চাপ তৈরি করে, যা অন্যায্য। পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারকে স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে অন্তত ৫ লাখ টাকা করা দরকার। রাজস্ব বাড়াতে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থার প্রচলন ও বাস্তবায়ন দরকার। প্রকৃত উচ্চ আয়ের মানুষদের করজালের আওতায় আনা জরুরি। সরকারি পরিসংখ্যানে দেশে টিআইএনধারী বর্তমানে প্রায় এক কোটি। কিন্তু আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন আনুমানিক ৩৫ লাখ করদাতা। যাদের আয় করমুক্ত সীমার ওপরে তাদের আয়করের আওতায় আনা দরকার। সম্পদ কর আহরণের ক্ষেত্রে বিশেষ মনোযোগ দেয়া উচিত। করপোরেট করহারে গত বছরে বেশ ছাড় দেয়া হয়েছে। সুতরাং নতুন কোনো কর সুবিধার প্রয়োজন নেই, বরং এরই মধ্যে ছাড় দেয়া খাতের পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক খাতে প্রণোদনা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রণোদনা বাড়ানো অর্থনীতির জন্য স্বাস্থ্যকর হবে। সর্বোপরি অর্থ পাচার রোধে কালো টাকা সাদা করার নীতি পরিহার করতে হবে। রেমিট্যান্স সরবরাহ বাড়াতে কার্যকর প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।