দেশে সুপারশপ সংস্কৃতি গড়ে উঠতে শুরু করেছে। সুপারশপ মার্কেটের আকার বর্তমানে ৪০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। পাঁচ বছর ধরে এটি বাড়ছে ১২-১৪ শতাংশ হারে। বড় বড় ব্র্যান্ডের সুপারশপের পাশাপাশি এখন পাড়ার অনেক দোকানও সুপারশপ মডেলে গড়ে উঠছে। এজন্য বড় ব্র্যান্ডের সুপারশপগুলোর অবদান রয়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ সুপারশপের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। অভিজাত এলাকাগুলোয় একসময় সুপারশপ, মেগাশপ, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রেতাদের চাহিদা ও সংখ্যা বিবেচনা করে নতুন আউটলেট খুলছে বিভিন্ন সুপারশপ ও মেগাশপ। সুপারশপে হলুদের গুঁড়া থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, কসমেটিকস সবই থাকে। বাংলাদেশ সুপারমার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের অনুমান, বর্তমানে দেশে নিত্যপণ্যের খুচরা বাজারের আকার প্রায় দেড় হাজার কোটি মার্কিন ডলারের। এর মধ্যে সুপারশপের অংশ দুই-আড়াই শতাংশ। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে সুপারশপের বাজার ১৯০ কোটি ডলার ছাড়াবে বলে আশা এ খাতের ব্যবসায়ীদের। দেশে ২০০০ সালের পর থেকে সুপারশপের ব্যবসা শুরু। বর্তমানে সারা দেশে দেড় হাজারের বেশি সুপারশপ রয়েছে। এর মধ্যে চেইন সুপারশপ আছে ছয় শতাধিক। দেশে উল্লেখযোগ্য বড় চেইন সুপারশপগুলোর মধ্যে রয়েছে আগোরা, স্বপ্ন, মীনা বাজার, ডেইলি শপিং, ইউনিমার্ট, আলমাস, প্রিন্স বাজার, ডেইলি সুপারশপ (ডিসিসি)।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সুপারশপ ধারণা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দেশের বাজারে। দেশের অন্যতম সুপারশপ চেইন ইউনিমার্টও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সুপারশপের বর্তমান, ভবিষ্যৎ ও নানা অন্তরায় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ইউনিমার্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুরতজা জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মহিউদ্দিন মাহি
সুপারশপ খাতের ব্যবসার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই?
আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার একটি প্রয়োজনীয় উপাদান সুপারশপ। একটা দেশের অর্থনীতি যখন একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে চলে যায়, তখন প্রত্যেকটা পক্ষ থেকেই জিনিসটার প্রয়োজনীয়তা আসে। সমস্যাটা হচ্ছে, ব্যবসাটা বিকাশের জন্য সমান সুযোগ নেই। যেমন শুধু সুপারশপ থেকে পণ্য কেনার কারণেই ভোক্তাকে ৫ শতাংশ মূসক দিতে হয়। যেটা বাইরে থেকে কিনলে দিতে হয় না। এটি সমান সুযোগ ক্ষেত্রের প্রধান অন্তরায়।
তবে সুপারশপের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল না হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ এটা তো নিত্যপ্রয়োজনীয়। এটাকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সুপারশপের মাধ্যমে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, সরকারের রাজস্ব আদায় কিংবা কর্মসংস্থান—সবই সুপারশপের মাধ্যমে হয়। একটু সমর্থন পেলে সুপারশপের ভবিষ্যৎ অনেক দূর। আমাদের উপমহাদেশের দিকে তাকালেই দেখা যাবে শ্রীলংকা কিংবা ভারতে সুপারশপের মার্কেট রিচ অনেক বেশি। সেখানে আমরা এখনো ২ শতাংশেও পৌঁছতে পারিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আপনাদের সুপারশপের ব্যবসায় কেমন প্রভাব ফেলেছে?
মূল্যস্ফীতির উল্লেখযোগ্য প্রভাব আমার ব্যবসায় পড়েছে। গত এক-দুই বছরে ক্রমবর্ধমান যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে, এ কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামও বেড়ে গেছে। এটার চাপ অন্যান্য জায়গার মতো সুপারশপেও পড়েছে এবং এখানে ভালো একটা প্রভাব রয়েছে। আমাদের সাধারণ ভোক্তাদের দেখছি, মূল্যস্ফীতির কারণে তারা তাদের খরচটাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। এতে সুপারশপগুলোর বিক্রির পরিমাণও কমেছে। আমাদের ১৫-১৬ শতাংশ বিক্রি কমেছে।
সুপারশপের ধারণা রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের পাশাপাশি জেলা-উপজেলা পর্যায়েও পৌঁছে যাচ্ছে। এ পর্যায়ে সুপারশপ খাতের সুষ্ঠু বিকাশে সরকারের করণীয়গুলো কী?
ভ্যাট, ট্যাক্স নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। যেমন কোনো একটি পরিবার যদি মাসে ২০ হাজার টাকার মুদিমাল কিনতে চায়, শুধু সুপারশপ থেকে কেনার কারণে তাকে ১ হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হবে মূসক হিসেবে। সরকার বিষয়টি দেখা দরকার। ভাড়ার বিষয়ে সরকারের নীতি নেই। আমরা প্রচুর পরিমাণে স্টাফ নিয়োগ দিই। এ স্টাফদের প্রশিক্ষণের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রমে কোনো কোর্স নেই। সরকার যদি এ জনশক্তির প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, যেসব ন্যাশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট রয়েছে, সেখানে যদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে আমরা দক্ষ জনশক্তি পেতাম। পুরো খুচরা বিপণন প্রক্রিয়াকে উন্নত করতেই বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ কারিকুলাম থাকা উচিত।
সুপারশপ ব্যবসা স্থাপনে বর্তমানে বড় প্রতিবন্ধকতা কী?
একটা যদি ধরি, ভোক্তা পর্যায়ে ৫ শতাংশ মূসকটাই সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। এটাই সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করে দেয়। তবে ব্যবসা স্থাপনে বড় প্রতিবন্ধকতা বলতে গেলে তিনটি বিষয় আসবে। সুপারশপের উপকরণ আমদানি নীতিমালা সমস্যা, ভাড়া নীতিমালা না থাকা ও ইউটিলিটি বিলের খরচ বেড়ে যাওয়া। এটা কিন্তু অল্প পয়সার ব্যবসা নয়। কম জায়গায় এ ব্যবসা করা যাবে না। ৪-৫ হাজার বর্গফুট ভাড়া নিয়ে, বিদেশী উপকরণ ও পণ্য নিয়ে ব্যবসা করতে হবে। এটি একটি বড় বিনিয়োগ ব্যবসা। এখানে ফান্ডিংয়ের খরচও বেড়ে গেছে। ব্যাংকের ইন্টারেস্ট বেড়ে গেছে।
আবার সুপারশপে যারা পণ্য সরবরাহ করেন, এ সরবরাহকারীদের ওপর সাড়ে ৭ থেকে ১৫ শতাংশ মূসক আছে। উদাহরণস্বরূপ, সুপারশপে যে ফল সরবরাহ করেন সরবরাহকারীরা, তাদের ওপর যদি সাড়ে ৭ শতাংশ মূসক আরোপ করা হয়, একই পণ্য অন্য জায়গায় থেকে কিনে বাইরে বসে বিক্রি করলে সুপারশপের সাড়ে ৭ শতাংশ কম দামে বিক্রি করা যাবে। শুধু সুপারশপে বিক্রি করার জন্য সাড়ে ৭ শতাংশ মূল্য বেশি দিতে হবে।
বাজেটে সুপারশপ খাতের প্রত্যাশাগুলো সম্পর্কে বলুন
আমাদের যে লক্ষ্য, ২০৩০ কিংবা ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা যা হতে চাই, সুপারশপের মতো জিনিসগুলো বাদে আমরা কিন্তু তা হতে পারব না। খাতটা প্রসারিত হতেই হবে। উন্নত দেশগুলোয় কাঁচাবাজার এখন জাদুঘরে চলে গেছে। সেখানে পুরোপুরি বা ৯০ শতাংশের মতো বাজার সুপারশপ-ভিত্তিক। বাংলাদেশে যদি এটি ৫-১০ শতাংশেও না যায়, তাহলে আমরা কীভাবে উন্নয়ন দাবি করব? সেজন্য ভোক্তা ও সরবরাহ পর্যায়ে মূসক অব্যাহতি দেয়া দরকার। একই সঙ্গে আমাদের আমদানি পণ্যের ওপর শুল্কের বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া জরুরি। এসব সমস্যা মিটে গেলে সুপারশপ দেশের বাজারে ভালো একটি অবস্থান তৈরি করবে।





