দেশীয় উদ্যোগ বাঁচাতে নতুন সম্ভাবনার কসমেটিকস শিল্প খাতের পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার জরুরি। দরকার অসম প্রতিযোগিতা ও ঝুঁকি থেকে বাঁচিয়ে শিল্পের বিকাশে প্রয়োজনীয় নীতিমালার। এরই মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন শিল্পটির নীতি প্রণয়নে জোরালো সুপারিশ করেছে। তার পরও বিষযটিকে গুরুত্ব না দেয়া স্থানীয় শিল্পের জন্য নেতিবাচক হয়ে উঠতে পারে নিকট ভবিষ্যতে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিআইর সাবেক প্রেসিডেন্ট জসিম উদ্দিনও মনে করেন, এলডিসি উত্তরণের পর দেশীয় শিল্পকে এখনকার মতো সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হবে না। তাই ২০২৬ সালের আগেই কর ও শুল্কছাড় দিয়ে স্থানীয় শিল্পকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে।

দেশে গ্লোবাল ব্র্যান্ডের উৎপাদন কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি সহজলভ্য করা গেলে এবং সরাসরি কসমেটিকস পণ্যের শুল্কহার বাড়ানো হলে দেশীয় উৎপাদন ও উদ্যোগকে এগিয়ে নেয়া সহজ হবে। প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের কসমেটিকস বাজারের শিল্পে বিদ্যমান সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বৈষম্যের কারণ হবে। কারণ এ শিল্পের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ১২ শতাংশ। তাই দেশীয় শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিসহায়তা দরকার। আমদানির বিকল্প হিসেবে দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঘটলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হয়। কর্মসংস্থান ছাড়াও রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়। তাই নীতিনির্ধারণে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত স্থানীয় বিনিয়োগ সুরক্ষাকে। বর্তমানে মানহীন ও ভেজাল পণ্যের ছড়াছড়ির খবর দেখা যায়। এসব ভেজাল পণ্য ব্যবহার করে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন। পড়ছেন বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। তাই স্থানীয় উৎপাদনকে নীতিসহায়তা দিয়ে মানসম্মত পণ্য ক্রেতাদের জন্য সুলভ করা দরকার।

বাংলাদেশে কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজ সামগ্রীর বার্ষিক বাজার ২১ হাজার কোটি টাকার ওপরে। এ খাত দেশের সম্ভাবনাময় একটি খাত হলেও আমদানিনির্ভর বিদেশী পণ্যের ভিড়ে দেশী কোম্পানির পণ্যগুলো অনেকটা চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে খাতটির প্রবৃদ্ধির বেশির ভাগ এখনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুকূলে। সরকারের পক্ষে দেশীয় এসব পণ্য জনপ্রিয় করতে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপকে বলা যায় খাতের অন্যতম বাধা। স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আরোপযোগ্য পণ্যের তালিকায় রয়েছে ওষ্ঠাধার প্রসাধন, চক্ষু প্রসাধন, হাত, নখ বা পায়ের প্রসাধন, পাউডার, সুগন্ধিযুক্ত বাথ সল্ট এবং অন্যান্য গোসল সামগ্রীসহ সংশ্লিষ্ট প্রসাধন সামগ্রী। কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজ পণ্যের কাঁচামাল আমদানির শুল্ক কমালে দেশীয় বাজার আরো সম্প্রসারণ হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা এসব কাঁচামালের প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে উচ্চ মূল্যে আমদানি করতে হয়।

তাছাড়া দেশে বিদেশী নামিদামি ব্র্যান্ডের অনেক কসমেটিকস পণ্য অবৈধপথে বাজারে প্রবেশ করছে। এ কারণে স্থানীয় উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি ক্রেতারা প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। ফলে নানাবিধ রোগবালাই দেখা দিচ্ছে। ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টির জন্য ভেজাল ও মানহীন কসমেটিকস পণ্য দায়ী হলেও তার যথাযথ তদারকি না থাকায় ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছেন। তাই দেশীয় পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের শুল্ক হ্রাস, বিদেশী পণ্য আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধি, অবৈধপথে বাজারে আসা পণ্য ঠেকানো, নকল পণ্য রোধ ইত্যাদি বিষয়ে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশে কসমেটিকস ও টয়লেট্রিজ সামগ্রীর উৎপাদন বাড়বে।

বাজার গবেষণা সংস্থাগুলোর ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের স্কিন কেয়ার বা পারসোনাল কেয়ার শিল্পের আনুমানিক বাজারের আকার ২০২০ সালে ছিল ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৭ সালের মধ্যে এর আকার ২ দশমিক ১২ বিলিয়নে পৌঁছতে পারে। সব ঠিক থাকলে ২০২১-২৭ সাল পর্যন্ত ৮ দশমিক ৫ শতাংশ হারে এ শিল্প বৃদ্ধি পাবে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের কসমেটিকস বাজারকে গুরুত্বের সঙ্গে নিলে খাতটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৃহৎ অনুঘটকে পরিণত হতে পারে।