চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) চামড়া, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা রফতানি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৯৮ মিলিয়ন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ৭ শতাংশ কম। একই সময়ে কেবল চামড়াজাত জুতা রফতানি বিগত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কম। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১০ মাসে সরকারের চামড়াজাত শিল্পের কৌশলগত রফতানি লক্ষ্য থেকে প্রায় ২২ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে। অত্র শিল্পে রফতানি কমছে। ব্যবসা পরিচালনায় রফতানিকারকরা নানাবিধ বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন ফলে অত্র শিল্পের রফতানি প্রতিনিয়ত কমছে।

উদাহরণস্বরূপ, ব্যাংক ঋণে সুদহার পূর্বের ৬-৭ থেকে বেড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ হয়েছে, লোহিত সাগরে জাহাজে জলদস্যুদের হামলার কারণে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় ইউরোপের কিছু রুটে পণ্য পরিবহনের সময় ১০-১৫ দিন বেড়েছে এবং ব্যয় প্রায় ৪০০ শতাংশ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে শিল্প কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ পরিবহন খরচ বেড়েছে। ব্যবসা করার ক্রমবর্ধমান খরচের কারণে সর্বস্তরে বেতন বৃদ্ধির ব্যয় মেটাতে ও গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিসহ অন্যান্য কারণে উৎপাদন খরচ ২৭ শতাংশ বেড়েছে, তবে সে তুলনায় আমাদের রফতানি পণ্যের দাম তেমন বাড়েনি; অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা তাদের ক্রয় মূল্য কমিয়েছে শুধু চাহিদা ধরে রাখতে। এমতাবস্থায় বহুমুখী খাতের বিদ্যমান রফতানি বাজারের শেয়ার রক্ষা ও সম্প্রসারণ করার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত সহায়তা ব্যবস্থাকে জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় এটি রফতানি বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতার অবনতি ঘটাবে এবং একটি উচ্চ সম্ভাবনাময় সেক্টরের বৃদ্ধিকে মন্থর করতে পারে, যা স্বল্পোন্নত দেশ হতে টেকসই উত্তরণের পথকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সার্বিকীভাবে রফতানি শিল্পের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে উদ্দীপিত করার জন্য বেশকিছু প্রবৃদ্ধিমুখী পদক্ষেপ আসন্ন বাজেটে গ্রহণ করা দরকার যেমন:

১। রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বজায় রাখতে ইডিএফের অনুরূপ সহজ শর্তে ও আন্তর্জাতিক সুদহারে রফতানিকারকদের জন্যে মার্কিন ডলারে ঋণ দেয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং রফতানিমুখী ঋণে আন্তর্জাতিক সুদহার ডলারের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করার মতো স্বল্পমেয়াদি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে।

২। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ১৩তম মন্ত্রিপর্যায়ের সম্মেলনে নতুন অগ্রগতি হয়েছে: স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর আরো তিন বছর তথা ২০২৯ সাল পর্যন্ত রফতানি সহায়তা দেয়া আন্তর্জাতিক নিয়ম ও প্রবিধানের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো বড় চ্যালেঞ্জ হবে না। তবে চ্যালেঞ্জ হলো আমাদের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। অর্থাৎ আমাদের এখন পলিসি স্পেস আছে, কিন্তু ফিসকল স্পেস নেই। রিজার্ভ ক্রমাগত চাপের মধ্যে রয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল। সার্বিকভাবে আমরা কঠিন সময় পার করছি। বিগত বহু বছর ধরে সংস্কার না করার খেসারত আমাদের দিতে হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তবে আমরা যদি বৈদেশিক মুদ্রা আয় নিশ্চিত করার জন্য রফতানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে চাই তবে সমস্ত অনুৎপাদনশীল ব্যয় কমিয়ে আমাদের অবশ্যই পলিসি স্পেস তৈরি করতে হবে এবং রেমিট্যান্স ও রফতানি বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট মনোযোগ দিতে হবে।

৩। নীতিসহায়তার মাধ্যমে রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিযোগী দেশগুলোর উদাহারণ অনুসরণ: রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ডব্লিউটিওর অনুমোদিত কর্মযোগ্য ভর্তুকি দিতে পারে, যা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পরও বিভিন্ন দেশের নিজ নিজ সরকার তাদের রফতানিকারকদের নীতিসহায়তার মাধ্যমে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ ভারত সরকার প্রডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ স্কিমের (পিএলআই) মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের ক্রমবর্ধমান বিক্রয়ের ওপর ৪ থেকে ৬ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছে এবং বিহার ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন পলিসি (টেক্সটাইল ও লেদার পলিসি), ২০২২-এর মাধ্যমে বিহারের টেক্সটাইল ও চামড়া শিল্পে বিনিয়োগ করতে চান এমন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকার ১০ কোটি রুপি পর্যন্ত অনুদান দিচ্ছে। এছাড়া এসব শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের প্রতি মাসে ৩-৫ হাজার রুপি বেতন সহায়তাও দিচ্ছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়াও রফতানিকারকদের জন্য প্রণোদনা দিচ্ছে, যেখানে রফতানিকারকরা তাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমপক্ষে তিন মাসের জন্য রাখতে পারে, যাতে বৈদেশিক মুদ্রা অন্যত্র প্রবাহিত না হয়। ইন্দোনেশিয়া সরকার রফতানিকারকদের জন্য “প্রতিযোগিতামূলক”সুদহার দিচ্ছে, যাতে তাদের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন স্থানীয় ব্যাংকে জমা রাখে।

৪। বন্ড ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে আমদানি করের সমহার প্রবর্তন: বর্তমানে বন্ড ব্যবস্থাপনা অনেকাংশেই জটিল প্রক্রিয়া এবং সব উৎপাদক ও রফতানিকারক এ সুবিধা নিতে সক্ষম নন, আবার কাঁচামালের জন্য আমদানি কর অধিকাংশই ভিন্ন ভিন্ন এবং ডিউটি ড্র ব্যাক বা আমদানি কর ফেরত প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ। এক্ষেত্রে রফতানির জন্য ব্যবহৃত সমস্ত শিল্প কাঁচামালের জন্য মোট আমদানি কর ১ শতাংশ সমহার প্রবর্তন করা গেলে নতুন, ক্ষুদ্র কিংবা মাঝারি রফতানিকারক যে কেউ রফতানির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সহজেই পেয়ে যাবে, ফলে লিড টাইম কমে রফতানি ৫০ শতাংশ বাড়তে পারে, যা রফতানি বৃদ্ধির জন্যে এটি একটি গেম চেঞ্জার সিদ্ধান্ত হতে পারে। 

৫। সাধারণ বন্ড সুবিধার আওতায় কমন বন্ডেড ওয়্যারহাউজ পদ্ধতি প্রবর্তন: বিগত অর্থবছরের গৃহীত বাজেটে কমন বন্ডেড ওয়্যারহাউজ পদ্ধতি প্রবর্তনের বিষয়টি প্রস্তাবে উল্লেখ থাকলেও অদ্যাবধি বাস্তবায়ন হয়নি। সাধারণ বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানিকারকদের স্টকহোল্ডিংয়ের জন্য কমন বন্ডেড ওয়্যারহাউজ পদ্ধতি প্রবর্তিত হলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও বন্ড সুবিধা ভোগ করতে পারবেন এবং আমদানি সহজ, আমদানি ব্যয় হ্রাস ও লিড টাইম কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বর্তমানে ভারত ও চীনে এ পদ্ধতি প্রচলিত আছে এবং এটা তাদের রফতানি বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্পের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে এবং সার্বিকভাবে রফতানি শিল্পের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আসন্ন বাজেটে সরকারের সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত রফতানি খাতে উজ্জীবিত করতে সফল হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে, এ প্রত্যাশা রাখি।