বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) সমগ্র বাংলাদেশভিত্তিক সর্বপ্রকার শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী একক ও একমাত্র জাতীয় শিল্প চেম্বার। বিসিআই তরুণ শিল্পোদ্যোক্তা সৃষ্টি, মাইক্রো ও স্মল শিল্পোদ্যোক্তা সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়নের প্রসার, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা এবং বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ছাড়াও স্থানীয় সব শিল্পের সর্বপ্রকার প্রতিবন্ধকতা নিরসনে বিসিআই কাজ করে চলেছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক মন্দা ও ডলার সংকটের মধ্যে সরকারের জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১, এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন-২০৩০, ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রক্রিয়া এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পথপ্রদর্শক হিসেবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট কাজ করবে বলে বিসিআই বিশ্বাস করে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বাংলাদেশের করপোরেট ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নেয়ার ব্যাপারে কাজ শুরু করেছে এবং আমরাও এ ব্যবস্থাকে সাধুবাদ জানাই। এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিল্প খাতের নিম্নলিখিত সমস্যাগুলোর সমাধানের সুপারিশ পেশ করছি—

১. ধারা ৪৬ (৩) মোতাবেক বীমা দাবি, স্যালভেজ বা ক্ষতির পর উদ্ধারকৃত অংশ যদি পরিসম্পদের অবলোপিত মূল্য হইতে অধিক হয় সেক্ষেত্রে ওই অর্থের ওপর সাধারণ করহার (২২.৫%/২৭.৫%/৩০%) প্রয়োগ করা হয়, যদিও রফতানি ও টেক্সটাইল ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক করহার ১০%/১২%/১৫%। এক্ষেত্রে আমরা উক্ত আয়ের ওপর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ের জন্য প্রযোজ্য ব্যবসায়িক করহার নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।

২. ধারা ৪৬ (১০) মোতাবেক প্রারম্ভিক মূলধন যদি ব্যবসা শুরুর ৫ বছরের মধ্যে কমে যায়, তাহলে ওই কমে যাওয়া অংশকে আয় হিসেবে গণ্য করা হয় তথা স্বাভাবিক হারে আয়কর দিতে হয়। আমরা এই বিধান রহিতকরণের প্রস্তাব করছি।

৩. ধারা ৪৯ মোতাবেক বিবিধ খরচ অনুমোদনের কোনো বিধান নেই কিন্তু প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধির সাথে বিবিধ খরচ এবং অনবলোপিত খরচ অপরিহার্য, যা কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় নিতে রাজি নয়, আমরা বিবিধ খরচকে বিবেচনার প্রস্তাব করছি।

৪. ধারা ৫৩ অনুসারে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য উৎস যেমন সিস্টার কনসার্ন বা সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণের বিপরীতে প্রদেয় সুদের পরিমাণ ১৫ লাখ টাকার অধিক হলে খরচ হিসেবে অনুমোদনের জন্য বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত সীমা ও পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। আমার এ ধরনের সুদ যে পরিমাণ হোক না কেন তা খরচ হিসেবে অনুমোদনের প্রস্তাব করছি।

৫. ধারা ৫৫ (ট) অনুসারে যেকোনো ধরনের শ্রমিক/কর্মচারীর যেকোনো পরিমাণ বেতন ভাতা/মজুরি ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধের বিধান করা হয়েছে। আমরা আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর বিধান ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করছি।

৬. ধারা ৫৫ (ত) অনুসারে মূলধনি প্রকৃতির কোনো ব্যয় কোম্পানির প্রফিট অ্যান্ড লস অ্যাকাউন্টে চার্জ করলে তা ধারা ৫৬ (১) অনুসারে বিশেষ ব্যবসা আয় হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ওই আয়ের ওপর সাধারণ করহার (২২.৫%/২৭.৫%/৩০%) হারে কর নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ওই অননুমোদিত মূলধনি ব্যয় এর ক্ষেত্রে তৃতীয় তফসিলের অংশ ২-এর প্যারা ৫ অনুযায়ী পরবর্তী করবর্ষ হতে ১০% শতাংশ হারে এমোর্টাইজেশন ভাতা হিসেবে অনুমোদিত হয় এবং ওই ভাতার ওপর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ের জন্য প্রযোজ্য ব্যবসায়িক করহার অর্থাৎ ১০%/১২%/১৫% হারে সুবিধা প্রদান করা হয়। আমরা ধারা ৫৬ (১) অনুসারে ওই বিশেষ ব্যবসা আয়ের ওপর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ের জন্য প্রযোজ্য ব্যবসায়িক করহার নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।

৭. ধারা ৫৫ (থ) অনুসারে যেকোনো দায় যা সুস্পষ্টভাবে নিরূপিত নহে বলতে আয়কর পরিপত্র ২০২৩-এ কুঋণ সঞ্চিতিকে বোঝানো হয়েছে। আমরা ধারা ৫৫ (থ) রহিতকরণের প্রস্তাব করছি। 

৮. ধারা ৫৫ (দ) অনুসারে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সহিত সম্পর্কিত নহে এরূপ সকল প্রকার ব্যয় যেমন গিফট, ডোনেশনকে ধারা ৫৬ (১) অনুসারে ‘‌বিশেষ ব্যবসা আয়’ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ওই আয়ের ওপর সাধারণ করহার (২২.৫%/২৭.৫%/৩০%) হারে নির্ধারণ করা হয়। আমরা ওই আয়ের ওপর সংশ্লিষ্ট ব্যবসার জন্য প্রযোজ্য ব্যবসায়িক করহার নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।

৯. ধারা ৫৫ অনুসারে মার্কেটিং, এন্টারটেইনমেন্ট, সেম্পল, বিদেশ ভ্রমণ, এমপ্লয়ি পারকুইজিট, ইনসেনটিভ বোনাস, টেকনিক্যাল ফি ইত্যাদির ক্ষেত্রে খরচের সীমা রহিত করে প্রকৃত খরচ হিসেবে আমলে নেয়ার প্রস্তাব করছি।

১০. ধারা ৫৫ অনুসারে কোনো খরচ বা বিয়োজন অনুমোদন না হলে সাধারণ করহার (২২.৫%/২৭.৫%/৩০%) আরোপ করা হয়, যা রফতানি ও টেক্সটাইল কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য করহারের প্রায় দ্বিগুণ। এক্ষেত্রে আমরা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ের জন্য প্রযোজ্য ব্যবসায়িক করহার নির্ধারণের প্রস্তাব করছি। 

১১. ধারা ৫৬ (২) অনুসারে ‘‌বিশেষ ব্যবসা আয়’ বা ব্যবসা হতে আয় এর বিশেষ ক্ষেত্রে আয়ের বিপরীতে কোনো প্রকার ব্যয়, লোকসান সমন্বয় বা জের টানা বা তৃতীয় তফসিলের অধীনে কোনো অবচয় ভাতা অনুমোদিত হবে না বরং এই আয়ের ওপর সাধারণ করহার নির্ধারণ করা হয় (২২.৫%/২৭.৫%/৩০%)। আমরা ওই আয়ের ওপর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ের জন্য প্রযোজ্য ব্যবসায়িক করহার নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।

১২. ধারা ৬৭ (৭) অনুসারে, সম্পদ অর্জনের (Asset Acquisition) ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তন না করা হলে তা অন্যান্য উৎসের আয় হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং সাধারণ করহারে কর আরোপ করা হয়। আমরা এ বিধান বাতিলের প্রস্তাব করছি।

বিসিআই মাইক্রো, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তরুণ শিল্পোদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং তার ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ২০২৪-২৫-এ বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য নিম্নলিখিত সুপারিশ পেশ করছে—

১. তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের জন্য বাজেটে বিশেষ তহবিল গঠন করার প্রস্তাব করছি;

২. ক্ষুদ্র শিল্প ও নারী উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে খাতভিত্তিক যৌথ রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভাগভিত্তিক দুই-তিনটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন সাপেক্ষে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রদান করা;

৩. LDC থেকে উত্তরণের পথে রফতানিতে বর্তমান নগদ প্রণোদনা ও ভর্তুকির মধ্যে যেগুলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেগুলো ক্রমান্বয়ে কমিয়েে আনার প্রস্তাব করছি।

আয়করসংক্রান্ত প্রস্তাবাবলি

১. উচ্চ করহার নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসাবান্ধব ও সহনশীল করপোরেট করহার নির্ধারণ জরুরি।

২. মাইক্রো, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প এবং তরুণ শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য ন্যূনতম পাঁচ বছর কর অবকাশ প্রদান করার প্রস্তাব করছি;

৩. আয়কর এসআরও নং ৩৩৩-আইন/আয়কর-২০২৩ অনুযায়ী Recognized Provident Fund, Approved Gratuity Fund, Approved Superannuation Fund ও Approved Pension Fund ক্ষেত্রে উদ্ভূত আয়ের ওপর আয়করের হার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। আমারা ওই ফান্ডগুলোর করহার ১৫ শতাংশ বহাল রাখার জন্য প্রস্তাব করছি।

আমদানি শুল্ক

১. কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্দেশিত হয়ে আমদানীকৃত পণ্যের ল্যাব টেস্টের জন্য সাধারণত ১৫-২০ দিন সময় লাগে। সেক্ষেত্রে আমদানিকারকদের অতিরিক্ত চার্জ দিতে হয়। আমরা টেস্টের কার্যক্রম তিন-পাঁচদিনের মধ্যে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা এবং যদি বিলম্ব হয়ে যায় তাহলে বিলম্ব শুল্ক চার্জ (পোর্ট ও শিপিং লাইন) থেকে অব্যাহতি প্রদানের প্রস্তাব করছি।

২. বিনামূল্যে আমদানীকৃত পণ্য (যন্ত্রাংশ), যা মেশিনারিজের রূপান্তর/আধুনীকীকরণের জন্য ব্যবহার হয় তা যথাযথ ক্যাটালগ প্রদর্শন সাপেক্ষে পণ্য ছাড়করণ আইটেমের নাম/এইচএস কোড, শুল্ক কর ট্যারিফ শিডিউল অনুসারে শুল্কায়ন করা এবং কোনো জরিমানা আরোপ না করার প্রস্তাব করছি।

মূল্য সংযোজন কর (মূসক)

১. মূসক আওতাবহির্ভূত ব্যবসায়ের বার্ষিক টার্নওভারে ঊর্ধ্বসীমা ৩ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৪ কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছি। 

২. মাইক্রো, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতে সব ধরনের Utility-এর ওপর ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব করছি;