বাজেটকে সামনে রেখে মোটরবাইক খাতের সমস্যা ও প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলেছেন টিভিএস অটো বাংলাদেশ-এর সিইও বিপ্লব কুমার রায় সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তোফাজ্জল হোসেন


প্রশ্ন: বাংলাদেশ সরকার অনেক দিন ধরেই দেশে কারখানা স্থাপন করে বিভিন্ন শিল্পের উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় দেশীয় এবং বিদেশী ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে তাদের পণ্য উৎপাদন করছে। এক্ষেত্রে বিদেশী ব্র্যান্ড হিসেবে বাংলাদেশে কতটা নীতিসহায়তা আপনারা পাচ্ছেন?

 

উত্তর: বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে একটি মোটরসাইকেল নীতিমালা দিয়েছে। এ নীতিমালার অধীনে বাংলাদেশে মোটামুটি সব আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল রয়েছে। তেমনিভাবে জাপানি ইয়ামাহা, হোন্ডা ও সুজুকি—এ তিনটি ব্র্যান্ড এবং ভারতীয় টিভিএস, বাজাজ ও হিরো—এ তিনটি ব্র্যান্ড বাংলাদেশে চলছে। ৯০-৯৫ শতাংশ বাংলাদেশের বাজার এ কোম্পানিগুলোর দখলে। এটা সুযোগ হয়েছে নীতিসহায়তার কারণে। ২০১৭ সালে নীতিমালা হওয়ায় ২০১৮ সালে আমরা উৎপাদনে যাই। ২০১৯ সালের পর কভিড-১৯ মহামারীর কারণে সবাই নাস্তানাবুদ। ২০২১ ও ২০২২—এ সময়টাতে পুরোটাই কভিড মহামারী ছিল। এরপর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সাপ্লাই চেইনে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। ফলে বহু প্রতিষ্ঠান তাদের শ্রমিক ছাঁটাইয়ে যেতে হয়েছে। উৎপাদন কমাতে হয়েছে। কিন্তু এরপর যখন হঠাৎ বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পেল তখন কিন্তু উৎপাদকরা পর্যাপ্ত জোগান দিতে পারেনি। ফলে মোটরসাইকেল শিল্পে উৎপাদনের শুরু থেকে কিন্তু আমরা কেউ সরকারের নীতিসহায়তার সুবিধা নিতে পারিনি। এর মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন কমে যায় তখন বাজারে বড় ধরনের ধস আসে। এ পরিস্থিতিতে আমাদের ইন্ডাস্ট্রি ৫০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। সরকারের নীতিসহায়তার পরবর্তী সময়ে একটার পর একটা বাধা এমনভাবে এসেছে যে কোনো কোম্পানিই উৎপাদনে আসার পর থেকে ভালো অবস্থানে নেই। ইন্ডাস্ট্রি যতক্ষণ বড় একটি অবস্থানে না যাবে সবগুলো কোম্পানি মিলে আমরা প্রায় ৩০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান করেছি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। ফলে প্রতিটি কোম্পানির মাথার ওপর বড় ধরনের ঋণের বোঝা। অন্যদিকে ঋণের সুদ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ডলারের ঊর্ধ্বগতির কারণে যে খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে সেটি আমরা পুরোপুরি গ্রাহকের ওপর দিতে পারিনি। কারণ আমাদের কিন্তু গ্রাহকের কথাও চিন্তা করতে হয়েছে। ফলে খুব খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে মোটরসাইকেল শিল্পটা চলছে। সুতরাং সবার আগে আমাদের শিল্পটার যত্ন নেয়া উচিত। কী করে এর ভলিউম বাড়ানো যায় সেটি ভাবতে হবে। যদি ভলিউম বাড়ানো যায় তাহলে কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের সুবিধা দিতে পারবে, নিজেরা প্রফিট করতে পারবে এবং শিল্পটা টেকসই হবে। এতে করে অন্য সুযোগ-সুবিধার দ্বারগুলোও খুলবে।

 

প্রশ্ন: মোটরসাইকেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এ আমদানির ক্ষেত্রে উৎপাদকরা কোনো ধরনের নীতিসহায়তার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন কি?

 

উত্তর: আসলে আমরা আমদানিনির্ভর দেশ। কারণ আমাদের সম্পদ সীমিত। ফলে আমাদের মতো ছোট দেশগুলোকে উৎপাদনে যাওয়া উচিত। আজকে যদি উৎপাদন সাপোর্ট দেয়া যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে যদি যেতে পারি আমরা (শুধু মোটরসাইকেল খাত নয়, যেকোনো খাতের ক্ষেত্রেই) তাহলে জনশক্তির দক্ষতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। তখন দেশের অর্থনীতি অনেক দ্রুত এগিয়ে যাবে। তৈরি পোশাক শিল্পে যেমন সুবিধা দেয়া হয়েছে, মোটরসাইকেল খাতে যে আমদানি খরচ হচ্ছে, সেটিকে পুনরায় সাজানো যেতে পারে। এখন যে মডেলটি গ্রাহকের কাছে আছে, সেটি সে কেনার পর অনেকগুলো নতুন মডেল বাজারে এসেছে। একটা মডেল পরিবর্তন হলে অনেকগুলো নতুন আইটেম চলে আসে। আবার আগের মডেলের জন্য যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হচ্ছে। এখন আমরা যে শিল্প নিয়ে কাজ করছি সেটি একটি টেকনিক্যাল খাত। এখানে প্রযুক্তি খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যদি টেবিলটাকে একটু পরিবর্তন করে দেয়া হয়, তাহলে আমাদের নতুন মডেল বাজারে আনার ক্ষেত্রে অনেক সুবিধা হয়।

 

প্রশ্ন: মোটরসাইকেল খাতের ব্যবসার খরচ কতটা বেড়েছে? এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই।

 

উত্তর: এখানে বাজারে টিকে থাকতে হলে ইন্ডাস্ট্রি বড় করার বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে আমি দুটি বিষয় বলব। একটা হচ্ছে রিটেইল ফাইন্যান্স। বিশ্বের যেসব জায়গায় মোটরসাইকেল মার্কেট গ্রো করেছে সেসব জায়গায় বড় অবদান হচ্ছে রিটেইল ফাইন্যান্সের। যেটি বাংলাদেশে পুরোপুরি অনুপস্থিত। বাংলাদেশে কিন্তু গাড়ির লোন পলিসি আছে। কিন্তু মোটরসাইকেলের কোনো লোন পলিসি নেই। যেটা সবার আগে দরকার। সবার কমিউটিং দরকার আছে। আজকে আমার কাস্টমার কে? যারা লো ও মিডল ইনকামে চলে তারা। তাদের অনেকেই গাড়ি কিনতে পারছে না দেখে মোটরসাইকেল কিনছে। কারণ তাকে কোনো না কোনোভাবে যোগাযোগ রক্ষা করতে হচ্ছে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে হচ্ছে তার প্রফেশনাল কাজে হোক বা ব্যক্তিগত কাজে হোক। আজকে যদি আমাদের দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো ভালো হতো, সহজ হতো এবং কম খরচে হতো তাহলে কিন্তু মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমে যেত। যেহেতু আমাদের এখনো রুট লেভেল পর্যন্ত যোগাযোগটা পৌঁছায়নি, ফলে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের বিকল্প নেই। প্রত্যন্ত অঞ্চলে যদি যান ক্ষেত্রবিশেষে অ্যাম্বুলেন্সের ভূমিকা রাখছে মোটরসাইকেল। এর খারাপ দিকগুলো আছে, আমি বলছি না সব ভালো দিক। কিন্তু মোটরসাইকেল আমাকে সর্বশেষ গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছে। এটা কিন্তু অন্য কোনো বাহন ওই সময়ের মধ্যে পারছে না। আসলে মানুষের দরকার আছে মোটরসাইকেল। দ্বিতীয় হচ্ছে আমদানির ক্ষেত্রে যদি ট্যারিফ যেটা আছে সেটি যদি আরেকটু সহজ করা হয়, এ জায়গায় আরেকটু সহজ করা হয় তাহলে ব্যবসা করাটা সহজ হয়। তৃতীয়ত, নতুন প্রযুক্তি আসছে ফলে সেটিকে সময় সময় আপডেট করা প্রয়োজন। চতুর্থত, যেহেতু ইন্ডাস্ট্রি ওভারঅল ইকোনমির জন্য খারাপ অবস্থার দিকে যাচ্ছে। ফলে ঋণের সুদের হারটা যদি কিছুটা শিথিল করা যায় ইন্ডাস্ট্রির জন্য তাহলে বিনিয়োগকারীদের জন্য এটা ভালো কিছু হবে। এখন সাময়িকভাবে কী করতে হবে? এখন আমি যেমন বিনিয়োগকারী আমার যেমন ভলিউম দরকার, তেমনই আমার গ্রাহকের এফোর্টেবিলিটি নেই। তাকেও এফোর্টেবিলিটির মধ্যে আনতে হবে। এ মুহূর্তে আমি দাবি জানাব সরকারের কাছে, ইন্ডাস্ট্রিটার যত্ন নেয়ার জন্য। কারণ আমার গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে বাজার কমে গেছে। কিন্তু আমার ঋণের সুদ কমেনি, এটি আরো বেড়েছে। ফলে আমার কিন্তু বেশি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এতে বিনিয়োগকারীরা দুর্বল হয়ে যাবে। ইন্ডাস্ট্রিটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখন ভ্যাটে ওয়েভার যদি দেয়া হয়, তাহলে গ্রাহকের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে মোটরসাইকেল চলে আসবে। আবার বিক্রি বাড়বে এবং উৎপাদকরা লাভবান হবেন।

 

প্রশ্ন: মোটরসাইকেল খাতের জন্য এবার কেমন বাজেট প্রত্যাশা করেন?

 

উত্তর: আমরা বর্তমানে খুবই চ্যালেঞ্জিং টাইম পার করছি। এ সময়ে সরকার তার নীতির মাধ্যমে, মনিটরিং পলিসির মাধ্যমে এবং বাজেটের মাধ্যমে আমাদের সহায়তা দিতে পারে। ফলে আমি বলব যে ভ্যাট ওয়েভার আমাদের সাময়িকভাবে দেয়া যায় কিনা, যে ট্যারিফটা আছে সেটিকে পুনরায় সাজিয়ে আমাদের জন্য কিছুটা শিথিল করা যায় কিনা, যে টেবিল আমরা প্রোভাইড করি সেটিকে নতুন প্রযুক্তি বাজারে নিয়ে আসার জন্য উপযোগী করে দেয়া।

 

প্রশ্ন: সরকার মোটরসাইকেলসহ সব যানবাহনের গতিসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এটি মোটরসাইকেল খাতের জন্য কতটা সুবিধা বা অসুবিধা সৃষ্টি করবে?

 

উত্তর: আমরা আমাদের বক্তব্য খুব তাড়াতাড়ি সরকারের কাছে পেশ করব। আমাদের কাছে মনে হয়েছে যেটা দিয়েছে সেটি বাস্তবসম্মত হয়নি। আজকে আমাদের কোনো সুপার হাইওয়ে নেই। আমাদের সরু রাস্তার মধ্যেই সব যানবাহন চলাচল করতে হচ্ছে। অন্যদিকে আমাদের রোড কনস্ট্রাকশন এবং অবকাঠামো অতটা রিচ না। আমরা কিন্তু সেপারেট লেন তৈরি করতে পারছি না। একই লেনে যখন সব যানবাহন চলাচল করছে তখন ভিন্ন গতির কারণে এটি সুবিধার চেয়ে অসুবিধা তৈরি করছে কিনা সেটি নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। ফলে আমরা নিজেরা বৈঠক করেছি। যেটা নিয়ে আমাদের অবস্থান ঠিক করার জন্য। আমরা কিন্তু চাই না কেউ ওভার স্পিডে চলাচল করুক। সেফ জার্নি আমরা সবাই চাই। কারণ দুর্ঘটনায় মৃত্যু যেমন হচ্ছে, তেমনি মানুষকে পঙ্গুত্বও বরণ করতে হচ্ছে। এটি বন্ধ হওয়াই আমাদের কাম্য। আমি বলছি না এ নতুন নীতিমালার বিপক্ষে আমরা, আবার বলব না যে পুরোটা বিজ্ঞানসম্মত হয়েছে। ফলে আমরা লেন আলাদা করে দিতে সরকারের কাছে দাবি জানাব এবং এ নীতিটাকে পুনরায় বিবেচনায় নেয়ার জন্য বলব। যারা ওভার স্পিডে চালাবে তাদের শাস্তি হোক আমরা এটা চাই।

 

প্রশ্ন: মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের মধ্যে একটা অভিযোগ থাকে বাজারে পার্টসের অ্যাভেইলেবলিটি থাকে না। এটি কেন হয়? এর সমাধানইবা কী?

 

উত্তর: সরকারের মুদ্রানীতির কারণে আমাদের কিছু পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে রেস্ট্রিকশন আনতে হয়েছে। পার্টসটাকে সরকার নিয়েছে নন-অ্যাসেনশিয়াল হিসেবে। ফলে এর ডিউটি ১০০ শতাংশের বেশি। যেটি অনেক আমদানিকারককে বড় ধরনের হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আবার ডলারের দুষ্প্রাপ্যতা। ফলে এ অবস্থাটা তৈরি করেছে। আমার বক্তব্য হচ্ছে স্পেয়ার পার্টস অ্যাসেনশিয়াল নয়, এটি নেসেসিটি। যে বাইকটা গ্রাহকের কাছে আছে, তার পার্টস যদি বাজারে না থাকে, তাহলে সে চলবে কীভাবে? এ জায়গাটায় আমি বলব যারা পলিসি তৈরি করেন, তারা এ বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন। ফলে যদি এটিকে অ্যাসেনশিয়ালে নিয়ে আসা যায়, নেসেসিটি হিসেবে বিবেচনা করা হয় তাহলে পার্টসের দুষ্প্রাপ্যতাটা দূর করা সম্ভব।