বাজেটকে সামনে রেখে কেবল খাতের প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলেছেন এলকো ওয়্যারস্ এন্ড কেবলস্ লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও তারেক মাহমুদ মতিন

দেশের কেবল শিল্প বর্তমানে কী চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে এবং আপনারা তা কীভাবে মোকাবেলা করছেন?

বর্তমান বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। দেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে ধাবিত হচ্ছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা সরকারের সুদীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বৈপ্লবিক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। ৩৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ থেকে আজ দেশ ২১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে। উৎপাদিত এ বিশাল পরিমাণ বিদ্যুৎ পরিবহনের সবচেয়ে সুপরিচিত, নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ ও সহজলভ্য উপায় হলো বৈদ্যুতিক কেবল। তবে এ বৈদ্যুতিক কেবলের উৎপাদন, বাজারজাত ও ব্যবহার প্রত্যেক স্তরেই রয়েছে চ্যালেঞ্জ। আজ দেশের কেবল শিল্প বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি রয়েছে। সঠিক কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব। এর জন্য সরকারের আরো আন্তরিকতা ও মানুষের সচেতনতা প্রয়োজন।

দেশে বর্তমানে প্রায় ১০-১২টি কেবল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কেবল উৎপাদনে ব্যবহৃত সিংহভাগ কাঁচামাল আমদানীকৃত। কেবলের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য আমদানীকৃত ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ পিউর কপার, অ্যালুমিনিয়াম, রেসিনসহ অন্যান্য কাঁচামালের কোনো বিকল্প নেই। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান স্থানীয় বাজার থেকে স্ক্র্যাপ কপার, অ্যালুমিনিয়ামসহ অন্যান্য কাঁচামাল সংগ্রহ করে। ফলে কেবলের গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। আমরা ১০০ ভাগ LME (London Metal Exchange) Registered কপার, অ্যালুমিনিয়াম আমদানি করে কেবল উৎপাদন করি এবং অন্য সব ধরনের কাঁচামাল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে কেবল উৎপাদন করি। বর্তমানে আমরা ফাইনেস্ট এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কাঁচামাল দিয়ে কেবল উৎপাদন করছি এবং লেটেস্ট টেকনোলজি মেশিনারি ব্যবহার করে কেবলের গুণগত মান নিশ্চিত করছি। এছাড়া উৎপাদনের পর গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য আমাদের রয়েছে সর্বাধুনিক ল্যাবরেটরি, যার মাধ্যমে আমরা কেবল উৎপাদনের সব ঝুঁকি মোকাবেলা করে নিরাপদ কেবল বাজারে সরবরাহ করার মাধ্যমে উৎপাদন ও বাজারজাতের ঝুঁকি মোকাবেলা করছি। 

কপার, অ্যালুমিনিয়াম ও ইনস্যুলেটিং পণ্যের মতো কাঁচামালের আমদানিতে উচ্চ শুল্ক ও কর আরোপিত থাকায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করা আরো কঠিন হচ্ছে। এটি সম্ভাব্যভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত করছে। ব্যাংক খাতে ঋণপ্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং সঠিক সময়ে ডলার ক্রাইসিসের কারণে সাপ্লাই চেইন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায়। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আমদানিনির্ভর প্রতিটি কোম্পানিই বড় ধরনের এক্সচেঞ্জ লসের সম্মুখীন হচ্ছে। ভ্যাট ও কর ব্যবস্থার জটিলতা এবং পরিবর্তন শিল্পের জন্য আর্থিক ও প্রশাসনিক বোঝা সৃষ্টি করছে। নতুন প্রযুক্তি এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য ক্রমাগত প্রযুক্তিগত আপডেট প্রয়োজন। বাজারে প্রতিযোগিতা ও ক্রমবর্ধমান মূল্য নির্ধারণের চাপ একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

কাঁচামালের উচ্চ শুল্কের প্রভাব মোকাবেলার জন্য বাজেট এবং খরচের পরিকল্পনায় নমনীয়তা রাখছি। ট্যাক্স ও ভ্যাটের জটিলতা মোকাবেলায় কর্মীদের নিয়মিতভাবে কর ও ভ্যাট সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ প্রদান করছি, যাতে তারা সর্বশেষ নিয়মাবলি সম্পর্কে সচেতন থাকে। কর ও ভ্যাট পরিশোধ প্রক্রিয়াকে সহজ ও দ্রুত করতে অটোমেশন ও আধুনিক হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার ব্যবহার করছি। উৎপাদন প্রক্রিয়া ও যন্ত্রপাতিতে নিয়মিত প্রযুক্তিগত আপডেট করছি। কর্মীদের নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করছি। পণ্যের গুণমান উন্নত করছি এবং নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য যোগ করছি। আধুনিক বিক্রয় ও বিপণন কৌশল গ্রহণ করছি, যা বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিশ্চিত করছে।

দেশের কেবল শিল্পে উল্লিখিত চ্যালেঞ্জগুলো সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে পারলে শিল্পটি স্থিতিশীল ও ক্রমবর্ধমান উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারবে। কর ও শুল্ক কমানোর জন্য সরকারি সহযোগিতা, আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামের সঙ্গে টিকে থাকার জন্য উদ্ভাবনী কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবেলা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ঘটছে প্রতিনিয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও হইচই হচ্ছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও রেগুলেটরি পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে খাপ খাওয়াচ্ছেন?

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান কেবল শিল্পে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া নিয়মিত রেগুলেটরি পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও রেগুলেটরি পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে কিছু কৌশল গ্রহণ করছি।

অটোমেশনের মাধ্যমে উৎপাদন লাইন অটোমেটেড করে উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, ত্রুটি হ্রাস এবং নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করছি। ডেটা অ্যানালিটিকসের মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে সংগৃহীত ডেটা বিশ্লেষণ করে উৎপাদন প্রক্রিয়া ও সরবরাহ চেইন উন্নত করছি। কর্মীদের নিয়মিতভাবে নতুন নিয়ম ও নীতিমালা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, যাতে তারা সর্বশেষ রেগুলেটরি পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করছি, যা নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের পথে সাহায্য করবে। নিয়মিত বাজার গবেষণা করে গ্রাহকদের পরিবর্তিত চাহিদা ও পছন্দ সম্পর্কে জানার মাধ্যমে পণ্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও উন্নয়ন করছি।

আগামী পাঁচ বছরে কেবল ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎকে কীভাবে দেখেন এবং আপনাদের কীভাবে দেখতে চান?

উন্নত প্রযুক্তি ও ডিজিটালাইজেশনের কারণে কেবল ইন্ডাস্ট্রির বাজার দ্রুত বিস্তৃত হবে। ফাইভজি, ফাইবার টু দ্য হোম এবং ডেটা সেন্টারের বৃদ্ধির ফলে উচ্চ গতির ডেটা ট্রান্সমিশনের জন্য উন্নত মানের কেবলের চাহিদা বাড়বে। ইন্টারনেট অফ থিংস, স্মার্ট হোম এবং স্মার্ট সিটি প্রকল্পের জন্য অত্যাধুনিক কেবল সিস্টেমের প্রয়োজন হবে। উন্নত সেন্সর ও সংযোগ স্থাপনের জন্য উন্নত কেবল ব্যবহৃত হবে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ও পরিবেশবান্ধব কেবল উৎপাদন প্রযুক্তির দিকে ঝোঁক বাড়বে। গ্রিন টেকনোলজির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কেবল ব্যবহারে গুরুত্ব দেয়া হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ইন্টারনেট ও টেলিকম নেটওয়ার্কের বিস্তৃতির ফলে নতুন বাজারের সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোয় কেবল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের বিনিয়োগ বাড়বে।

দেশে রিনিউয়েবল এনার্জি (সোলার পাওয়ার) প্লান্টের ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করেছে। এখানে নতুন ধরনের কেবলসের চাহিদা পূরণের জন্যও কাজ করে যাচ্ছি। মধ্যম আয়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। নতুন নতুন মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। এ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে এক্সট্রা ভোল্টেজ কেবলসের ব্যাপক চাহিদা বাড়বে। আমরা উন্নতমানের এক্সট্রা ভোল্টেজ কেবলসের ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটানোর জন্য এখন থেকেই কাজ করে যাচ্ছি।

আমরা আগামী পাঁচ বছরে কেবল প্রযুক্তির গবেষণা ও উন্নয়নে নেতৃত্ব দিতে চাই। আধুনিক ল্যাব ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে নতুন নতুন কেবল প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে চাই। নতুন ও উন্নতমানের কেবল পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করতে চাই। বৈশ্বিক মানের কেবল তৈরি ও আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণ করতে চাই।

আমরা টেকসই শিল্প, সবুজ অর্থনীতির কথা বলছি। আপনারা এর জন্য কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন এবং এর সঙ্গে অভিযোজন করছেন কীভাবে?

টেকসই শিল্প ও সবুজ অর্থনীতির দিকে ধাবিত হওয়ার জন্য আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া, পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার এবং পরিবেশ সুরক্ষার জন্য নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার।

কম কার্বন নির্গমনের জন্য উন্নত ও কার্যকর মেশিনারিজ ও সরঞ্জাম ব্যবহার করছি। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় এনার্জি অ্যাফিশিয়েন্ট প্রযুক্তি এবং প্রক্রিয়া গ্রহণ করছি, যা শক্তি খরচ কমায় এবং পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস করে। পুনর্ব্যবহৃত কাঁচামালের ব্যবহার করছি, যেমন কপার ও অ্যালুমিনিয়াম। পরিবেশবান্ধব কাঁচামাল ব্যবহার করছি, যা পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমায়। কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করেছি, যা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করছে। পরিবেশবান্ধব এবং কম বিষাক্ত ইনসুলেশন উপকরণ ব্যবহার করছি, যা পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর। কর্মীদের জন্য পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি ও টেকসই প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান করছি। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কমিউনিটির উন্নয়নে অবদান রাখছি।

কাঁচামাল যেমন কপার, অ্যালুমিনিয়াম, ইনস্যুলেটিং পণ্যের আমদানির ওপর নির্ভর করে কেবল ইন্ডাস্ট্রি পরিচালিত হয়। কিন্তু কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ করের বোঝা রয়েছে। এটা উৎপাদন ও উৎপাদিত পণ্যের দাম নির্ধারণে কীভাবে প্রভাব ফেলে?

কাঁচামাল যেমন কপার, অ্যালুমিনিয়াম ও ইনস্যুলেটিং পণ্যের আমদানিতে উচ্চ করের বোঝা কেবল ইন্ডাস্ট্রির উৎপাদন খরচ এবং উৎপাদিত পণ্যের দাম নির্ধারণে বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলছে।

আমদানি শুল্ক ও করের কারণে কাঁচামালের দাম বাড়ে। এটি সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়াতে প্রভাব ফেলছে। কাঁচামাল আমদানির ওপর কর বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়ছে। এর মধ্যে থাকে ট্রান্সপোর্টেশন, স্টোরেজ ও প্রক্রিয়াকরণের খরচ। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। এ কারণে গ্রাহকদের বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। পণ্যের দাম বাড়ার কারণে বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে, যেখানে প্রতিযোগিতামূলক দাম বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানির মুনাফা মার্জিন হ্রাস পাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে তাদের লাভ কমাতে হয়, যাতে তারা বাজারে প্রতিযোগিতামূলক থাকতে পারে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ছোট ও মাঝারি আকারের কোম্পানিগুলোর জন্য লাভজনকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক সময় কোম্পানিগুলো স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সরবরাহকারীদের খোঁজে থাকে, যাতে আমদানি শুল্কের বোঝা এড়ানো যায়। তবে এটি সবসময় সম্ভব নয়, কারণ স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত ও গুণগত মানের কাঁচামাল পাওয়া সবসময় সহজ নয়। কিছু কোম্পানি কম খরচে কাঁচামাল আমদানির জন্য বিকল্প উৎস খুঁজে বের করে, যদিও এটি সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

কাঁচামালের ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক কেবল ইন্ডাস্ট্রির উৎপাদন খরচ এবং পণ্যের দামে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং মুনাফা মার্জিন কমে যাওয়া এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, বিকল্প সরবরাহকারীর সন্ধান এবং সরকারের নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।

দেশে কর হার প্রতি বছরই পরিবর্তিত হয়। এখানে ভ্যাট পদ্ধতিও কিছুটা জটিল। এ সমস্যা মোকাবেলা করেন কীভাবে?

দেশে কর হার এবং ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) পদ্ধতির পরিবর্তন এবং জটিলতা কেবল ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ। কর ও ভ্যাটের জটিলতা মোকাবেলার জন্য পেশাদার ট্যাক্স পরামর্শক ও হিসাবরক্ষক নিয়োগ করছি। এরা নিয়মিত পরিবর্তনগুলোর সঙ্গে আপডেটেড থাকেন এবং সঠিক কর পরিশোধে সহায়তা করতে পারেন। প্রতিষ্ঠানের ফাইন্যান্স ও অ্যাকাউন্টিং বিভাগে কর্মরতদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান করছি, যাতে তারা সর্বশেষ কর ও ভ্যাট নিয়মাবলি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখতে পারে। উন্নত হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার ব্যবহার করে কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত হিসাবরক্ষণ স্বয়ংক্রিয় করছি। এটি সময় বাঁচায় ও ভুল কমিয়ে আনে। সরকারের কর ও ভ্যাটবিষয়ক নীতিমালা নিয়মিত মনিটরিং করছি এবং সেগুলোর সঙ্গে সংগতি রেখে ব্যবসায়িক কৌশল পরিবর্তন করছি। ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং বাজেট তৈরিতে নমনীয়তা রাখছি, যাতে কর হার পরিবর্তন এবং ভ্যাট জটিলতা সহজে সামলানো যায়। অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নিরীক্ষা প্রক্রিয়া চালু রাখছি, যাতে কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত ত্রুটি ও দুর্নীতি কমানো যায়। কর্মীদের কর ও ভ্যাট সম্পর্কে সচেতন করছি এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করছি।

সরকার রফতানিমুখী শিল্পে প্রণোদনা, কর অবকাশের মতো সুযোগ দিচ্ছে। এ সুবিধা আপনারা নিতে পারছেন কিনা।

যেহেতু আমরা রফতানি করি না, তাই সরকারের রফতানিমুখী শিল্পে প্রণোদনা ও কর অবকাশের সুবিধা সরাসরি আমার ব্যবসার জন্য প্রযোজ্য নয়।

এ শিল্পের বিকাশে সরকারের কাছ থেকে কী সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন?

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করেছে। ২০০৯ সালে সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিতরণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ফলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ও সংযোগের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০৩০ সালে বাংলাদেশে বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে ৩৪ হাজার মেগাওয়াট।

কেবল ইন্ডাস্ট্রির বিকাশে সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি, যা এ শিল্পের বিভিন্ন দিককে উন্নত করতে সহায়তা করবে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে।

সাসটেইনেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। দেশে এখনো নিম্ন মানের কেবলস প্রস্তুত হচ্ছে। এই নিম্ন মানের কেবলস ব্যবহারের জন্য প্রতিনিয়তই মিল কারখানা ও বাসাবাড়িতে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটছে। আমাদের প্রত্যাশা সরকার তদারকি বাড়িয়ে নিম্ন মানের কেবলস উৎপাদনে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে। কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্কের বোঝা কমানো, যাতে উৎপাদন খরচ হ্রাস পায় এবং স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হয়। নতুন প্রযুক্তি ও ইনোভেশনকে উৎসাহিত করার জন্য কর রেহাই প্রদান করা, বিশেষ করে নতুন মেশিনারিজ ও সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে। ব্যবসা শুরু এবং পরিচালনা করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুত করা। শিল্প এলাকায় উন্নত সড়ক, বিদ্যুৎ, পানি এবং অন্যান্য মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা, যা উৎপাদন কার্যক্রমকে সহজতর করবে। উন্নত লজিস্টিক সুবিধা প্রদান করে কাঁচামাল ও পণ্য পরিবহন সহজ ও খরচসাশ্রয়ী করা। কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং পরিচালনা করে স্থানীয়ভাবে দক্ষ কর্মী তৈরি করা। নতুন পণ্য উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল প্রদান করা। শিল্পের বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রকল্পকে উৎসাহিত করার জন্য সরকারি অনুদান ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। রফতানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রণোদনা প্রদান করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজতর করা। বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য মিশন ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা, যেখানে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্য প্রদর্শন ও বাজার সম্প্রসারণ করতে পারে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করা, যেখানে কেবল ইন্ডাস্ট্রির জন্য বিশেষ সুবিধা এবং কর রেহাই প্রদান করা হবে।

কেবল ইন্ডাস্ট্রির বিকাশে সরকারের কাছ থেকে এ ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি, যা শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

 

আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?

২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে কেবল শিল্পে আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা আছে। এ প্রত্যাশাগুলো শিল্পের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

কেবল শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও কর হ্রাস করার মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমানো। ফলে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত করতে প্রণোদনা ও সহায়তা প্রদান। উদাহরণস্বরূপ কারখানা স্থাপনের জন্য কম সুদে ঋণ বা কর অবকাশের ব্যবস্থা করা। কেবল শিল্পে রফতানি বৃদ্ধি করতে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও রফতানি প্রক্রিয়া সহজতর করা। রফতানির ওপর কোনো প্রকার শুল্ক বা কর না রাখার ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ওপর সাবসিডি প্রদান ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা, যাতে উৎপাদন খরচ কমে আসে। অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে কেবল রফতানি বাজার বিস্তৃত করা। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা প্রদান, যাতে উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত হয় এবং পরিবেশবান্ধব হয়ে ওঠে। দক্ষ কর্মী তৈরি করতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।

এ প্রত্যাশাগুলো পূরণ হলে তারের শিল্পে প্রবৃদ্ধি সম্ভব হবে এবং এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।