চা একটি সম্পূর্ণ প্রকৃতিনির্ভর কৃষিজ পণ্য। মান্ধাতা আমলের উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তে বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এটি এখন শিল্পে রূপ নিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিরূপ আবহাওয়ায় চা খাত নতুন সংকটের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। করোনাকালীন সংকটের পর পরই চলতি বছর তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চা শিল্প। বছরের প্রথম চার মাসে উৎপাদন ও চায়ের গুণগত মান কমে গেছে বৃষ্টিহীনতায়। বিপুল বিনিয়োগের খাতটিতে পরিচালন ব্যয় কমানোর কোনো সুযোগ নেই। আসন্ন বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট মোকাবেলায় সুবিধাভোগী খাতের মধ্যে চা শিল্পকেও অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের চা শিল্প এখনো মানুষের শ্রমনির্ভর। কয়েক বছরের মধ্যে শ্রমমূল্য বেড়ে যাওয়া, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে চায়ের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। দেশে চায়ের কস্ট অব প্রডাকশন (সিওপি) প্রতি কেজিতে বেড়ে ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে। অথচ কয়েক বছর ধরে দেশে চায়ের প্রতি কেজি গড় বিক্রয়মূল্য ২০০ টাকারও নিচে। এভাবে কতদিন বাগানগুলো টিকে থাকবে? বাগান মালিকরা সীমিত সুবিধা নিয়েও প্রতিটি বাগানের হাজার হাজার চা শ্রমিককে সব সুবিধা দিয়ে উৎপাদন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আমদানিনির্ভরতা ৯০ শতাংশের বেশি কমিয়ে আনায় বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে। ফলে চা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে নতুন বাজেটে বিশেষ প্রণোদনা, কর সুবিধা প্রদান জরুরি হয়ে পড়েছে।
চা শিল্পের সবচেয়ে বড় সংকট প্রকৃতিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা। চীন-ভারত-শ্রীলংকার মতো দেশ চা উৎপাদনে প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়িয়েছে। আমাদের দেশে চা খাতকে প্রযুক্তি নির্ভর করতে মেশিনারিজ, ইরিগেশন পণ্য ও যন্ত্রাংশ যুগোপযোগী কর কাঠামো নির্ণয় করা জরুরি। সীমিত পরিসরে শুধু পানির পাম্প আমদানিতে চা শিল্পে কর রেয়াতি সুবিধা দেয়া হলেও সম্পূর্ণ ইরিগেশন সিস্টেমের ওপর সেটি কার্যকর করা প্রয়োজন। প্রতিটি বাগানের কয়েকশ একর জমিকে কৃত্রিম সেচ পদ্ধতিতে আনতে পানির পাম্পের পাশাপাশি পাইপসহ আনুষঙ্গিক পণ্যের প্রয়োজন। পাম্পের পাশাপাশি পাইপসহ বিভিন্ন সেচ পণ্য ও চা উৎপাদনের অত্যাধুনিক মেশিনারিজের ওপর বাজেটে কর সুবিধা বৃদ্ধি প্রয়োজন।
দেশে উৎপাদিত চা নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হয়। এতে সরকার শতভাগ শুল্ক কর পায়। কিন্তু দেশের বিভিন্ন সীমান্ত পথ দিয়ে ভারত থেকে চা প্রবেশ করায় দেশীয় বাগান মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারও হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। সীমান্ত চোরাচালানে চা-কে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে বাগান মালিকদের বাজেটে বিশেষ প্রণোদনা দেয়া হলে স্বয়ংসম্পূর্ণ খাতটি আরো বেশি বিকশিত হবে। এজন্য নিলামে ভালোমানের চায়ের মূল্যস্তর বজায় রাখতে শুল্ক কাঠামোর পুনর্বিন্যাসে উদ্যোগী হতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে। এতে দেশীয় উদ্যোক্তারা পরিমাণের দিকে না তাকিয়ে গুণগত মানসম্পন্ন চা উৎপাদনের দিকেই ঝুঁকবে।
দেশে উদ্বৃত্ত চা উৎপাদন সত্ত্বেও রফতানি বাজার কমে এসেছে। বাংলাদেশের মার্কেট অনুযায়ী বাড়তি উৎপাদিত চা যথাসময়ে রফতানি করতে না পারলে বাজারমূল্য কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাগান মালিকরা। বাগান মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের চা শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। এজন্য রফতানি বাজার তৈরি, বৃদ্ধি ও রফতানিতে নানামুখী প্রণোদনা জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে রফতানিতে সীমিত পরিসরে প্রণোদনা থাকলেও এ সুবিধা বাংলাদেশের চা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। এজন্য বাংলাদেশ চা বোর্ড, বাংলাদেশীয় চা সংসদ, টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টিটিএবি), ব্রোকার্স প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সমন্বয়ের মাধ্যমে চা রফতানিতে প্রণোদনা বাড়ানো জরুরি।
চা জাতীয় চাহিদা পূরণের মাধ্যমে একটি ‘শতভাগ মৌলিক’ রফতানি পণ্য। চাহিদা বাড়লেও আমদানি প্রায় শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার কারণে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে চা খাতের উদ্যোক্তারা। অন্যদিকে সীমিত পরিসরে হলেও রফতানির মাধ্যমে শতভাগ বৈদেশিক মুদ্রা আহরণে কাজ করছে চা খাতের উদ্যোক্তারা। যদিও বছরের পর বছর বিনিয়োগের পরও চা খাতের উদ্যোক্তারা লোকসানের ঘানি টানছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের খাত হিসেবে চা শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এ খাতে সুদহারের বিষয়েও নতুন পরিকল্পনা জরুরি। আসন্ন বাজেটে এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিশেষ সুযোগ বা ছাড় দিতে পারে। না হলে উৎপাদনে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় থাকা চা খাত দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক উৎপাদন প্রবৃদ্ধির কবলে পড়বে। এ সংকট ঘনীভূত হলে আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি, সীমান্তবর্তী দেশগুলো থেকে চোরাচালান বেড়ে সরকারের উল্টো বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষ চা উৎপাদনকারী দেশগুলো চা উৎপাদনের পাশাপাশি চা শিল্পকে পর্যটন, বিকল্প কৃষিজ পণ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশে এ বিষয়ে সুযোগ থাকলেও সরকারি নীতিসহায়তার প্রয়োজন। এজন্য আসন্ন বাজেটে চা খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া সময়ের দাবি চা উদ্যোক্তাদের।





