তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বাজেটকে সামনে রেখে এ খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন গ্লোবাল ব্র্যান্ড প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আনোয়ার

দেশে আইটি ও আইটিইএস খাতে কর অব্যাহতির জন্য সংশ্লিষ্ট সবাই সরকারের প্রতি আহ্বান করছে। এমনকি প্রতিমন্ত্রীও কিছু প্রোগ্রামে কর অব্যাহতির জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। আপনি কী মনে করছেন? প্রযুক্তি খাতের কর ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত।

বাংলাদেশে আইটিএস খাতে জুলাই ২০০৮ থেকে অদ্যাবধি কর অব্যাহতি চলমান আছে কিন্তু বিভিন্ন সমর্থিত সূত্র থেকে শোনা যাচ্ছে ৩০ জুন ২০২৪-এর পর থেকে কর অব্যাহতি সুবিধা নবায়ন করা হবে না। এরূপ হলে বিষয়টি মোটেও সুখকর হবে না। কেননা রূপকল্প ২০৪১ অনুযায়ী স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নে তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে সরকারের ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অর্জনে ২০৩১ সাল পর্যন্ত কর অব্যাহতি সুবিধা বলবৎ রাখা অত্যাবশ্যক। এ খাতে কর আরোপিত হলে তথ্যপ্রযুক্তি সেবার ব্যয় বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হবে। রফতানিতে গার্মেন্টস শিল্পের পর সম্ভাব্য দ্বিতীয় খাত হিসেবে বিবেচিত খাতটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। অতএব ফ্রিল্যান্সার, তরুণ উদ্যোক্তা ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে কর অব্যাহতির বিকল্প নেই।

স্মার্ট বাংলাদেশে প্রযুক্তি খাতের কর ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত?

  করপোরেট করহার হ্রাস করা অথবা আইটি খাতকে বিশেষ খাত হিসেবে বিবেচনা করে হ্রাসকৃত করহার ধার্য করা।

 প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবসায়ে সব পর্যায়ে ভ্যাট পরিহার এবং যৌক্তিক পর্যায়ে আমদানি শুল্ক নিশ্চিত করা।

 দেশীয় বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা।

 দীর্ঘমেয়াদি করনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৈদেশিক বিনিয়োগকে (এফডিআই) উৎসাহিত করা।

 আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকৃষ্ট করতে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি অনুকূল কর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্মার্ট বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ প্রযুক্তি খাত তৈরি করতে পারে, যা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।

প্রযুক্তি খাতের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হার্ডওয়্যার পণ্যের ওপর কর আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে বাজারে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে?

দেশীয় ল্যাপটপ শিল্পের প্রসার এবং আমদানি নিরুৎসাহিত করার লক্ষে ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ল্যাপটপ আমদানিতে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু গত প্রায় দুই বছরে দেশে কোনো ল্যাপটপ তৈরির কারখানা গড়ে ওঠেনি এবং বিশ্বের কোনো নামকরা ব্র্যান্ডও আগ্রহ প্রকাশ করেনি। এছাড়া কারো কোনো পরিকল্পনাও নেই। বাংলাদেশে গত পাঁচ বছরে গড়পড়তা ল্যাপটপের চাহিদা তিন লাখ ইউনিট। যার মধ্যে রয়েছে বিশ্বের জনপ্রিয় ছয়-সাতটা ব্র্যান্ড। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন মডেল ও সিরিজ। সুতরাং এত ছোট সাইজের বাজারে কোনো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড কারখানা তৈরি করে অর্থনৈতিকভাবে সারভাইব করতে পারবে না।

ভ্যাট আরোপের ফলে ল্যাপটপ আমদানির ব্যয় বাড়ায় অননুমোদিত উপায়ে ল্যাপটপ সংগ্রহের বিস্তারকে উৎসাহিত করেছে এবং কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে আমদানি নিষিদ্ধ ই-বর্জ্য নামে অভিহিত অল্প মূল্যের রিফারবিস্ট ল্যাপটপে বাংলাদেশের বাজার সয়লাব হয়ে পড়েছে। অসাধু ব্যবসায়ী কর্তৃক অননুমোদিত উপায়ে ল্যাপটপ আমদানির ফলে পাইওনিয়ার বা কম্পিউটার ব্যবসার প্রকৃত ব্যবসায়ীরা পণ্যের মূল্যে অসম প্রযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে এবং দিনে দিনে বাজার হারাচ্ছে, বাজার হারানোর ফলে তাদের আমদানি কমছে, যার ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। মানহীন ল্যাপটপ তাদের হাতে পৌঁছার ফলে তারা প্রতারিত হচ্ছে এবং তাদের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। ল্যাপটপ আমদানিতে ভ্যাট আরোপ আমাদের জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং সরকারের রাজস্ব উদ্দেশ্যকেও ক্ষুণ্ন করছে।

ল্যাপটপ আমদানিতে ভ্যাট আরোপের ফলে দেশীয় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা এবং রাজস্ব বৃদ্ধির কোনোটাই অর্জিত হয়নি। অধিকন্তু কম্পিউটারের প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অননুমোদিত উপায়ে কম্পিউটার সংগ্রহের প্রবণতা বেড়েছে, রিফারবিস্ট পণ্য কিনে তারা প্রতারিত হচ্ছে, অধিক ই-বর্জ্যের কারণে পরিবেশগত ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতির পথে এটি একটি প্রতিবন্ধকতা, যা মোকাবেলা করা অপরিহার্য।

প্রযুক্তি পণ্য ল্যাপটপ আমদানিতে ‘ভ্যাট’ জাতীয় অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সুতরাং বাস্তবতার নিরিখে ল্যাপটপ আমদানিতে আগের মতো ভ্যাট প্রত্যাহার জরুরি।