ডেমোক্রেটিক বাজেট মুভমেন্ট (ডিবিএম) নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি অরাজনৈতিক ও অলাভজনক প্লাটফর্ম যার লক্ষ্য হচ্ছে কেন্দ্র ও প্রশাসননির্ভর জাতীয় বাজেটকে জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে সাধারণ নাগরিকের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সেজন্য সারা দেশে সামাজিক উদ্যোগ জোরদার করা। জেলাবাজেটসহ ‘বাজেট বিকেন্দ্রীকরণ’ ডিবিএমের একটি ফ্ল্যাগশিপ ক্যাম্পেইন। এ বিষয়ে ডিবিএম গত এক যুগেরও বেশি সময় গবেষণা, বাজেট সাক্ষরতা ও অ্যাডভোকেসি করে আসছে। ডিবিএম ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠন আয়োজিত ‘জন বাজেট সংসদ’ শীর্ষক ছায়া বাজেট সংসদ এক দশক ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে সাধারণ করদাতা, উদ্যোক্তা, কৃষক-শ্রমিক, নারী, দলিত, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী, গবেষক, জনপ্রতিনিধি, ট্রেড ইউনিয়নকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধি এ সংসদে উপস্থিত থেকে জাতীয় বাজেট বিষয়ে তাদের সুচিন্তিত মতামত দেন এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে তা উপস্থাপন করেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জলবায়ু ও আর্থিক সংকট মোকাবেলাকে প্রাধান্য দিয়ে জনবাজেট প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।
মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ বিপর্যয় ক্রমেই মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন বিশুদ্ধ খাবার ও সেচের পানি, মাটির উর্বরতা, বৃষ্টির পরিমাণ কমার কারণে খাদ্যশস্য উৎপাদন কমছে, ফলে বিশ্বব্যাপী বিদ্যমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। উল্লেখ্য, প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ২০৩০ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার প্রত্যাশা ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ ৩ ডিগ্রিতে দাঁড়াতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, যদি তাপমাত্রা মাত্র ১ ডিগ্রি বাড়ে তাতে বৈশ্বিক উৎপাদন ১২ শতাংশ কম হবে। যদি অকল্পনীয়ভাবে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা বাড়ে তাহলে বৈশ্বিক উৎপাদন, মূলধন ও ভোগের পরিমাণ ২১০০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ কমে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির চেয়ে বাংলাদেশে বছরে ৩ দশমিক ৪২ মিলিমিটার বেশি হারে বাড়ছে। এতে খাদ্য উৎপাদন ও জীবিকার উৎসের ওপর ধারণার চেয়েও বেশি প্রভাব পড়বে। একই গবেষণায় প্রায় ১০ শতাংশ আমন ধানের উৎপাদন হ্রাসের ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। ক্রমেই বহুমাত্রিক ক্ষয়ক্ষতির শিকার পৃথিবীর প্রকৃতি ও জীবনের ওপর পড়া নেতিবাচক প্রভাব পরিমাপে অসমর্থ হয়ে উঠছে। পরিবেশ বিপর্যয়, দুর্যোগ ও চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যয় প্রাধান্য পাওয়ায় প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সরকারের ব্যয় সক্ষমতা কমছে। দুর্যোগের পরিমাণ বাড়তে থাকলেও বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে জলবায়ু সম্পর্কিত ব্যয়ের পরিমাণ কমছে, তাতে ঋণনির্ভরতা বাড়বে সামনের দিনে।
প্রাণ ও প্রকৃতির উৎপাদনশীলতা কমছে, বাজেটে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব বিবেচনা করলে টেকসই অগ্রগতির পথ থেকে দেশ বিচ্যুত হয়ে ঋণ-ফাঁদে পড়বে, যা কাম্য নয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে সবুজ করভিত্তিক সুষম কর বাজেট গ্রহণের বিকল্প নেই। যা বাস্তবায়নে প্রয়োজন নীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর সার্বিক পরিবর্তন, জনসাধারণের কার্যকর অবদান ও মূল্যায়ননির্ভর টেকসই উদ্যোগের প্রসার, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও পরিবহন। এছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি প্রত্যাহার করে স্মার্ট পুনর্নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ; সবুজ কর্ম ও স্বাস্থ্য খাত গঠন জল, বন এবং জীববৈচিত্র্যের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। পরিবেশগত লক্ষ্য নির্ধারণ করে সরকারি ব্যয় এবং করনীতি মূল্যায়ন; দূষণকারী শিল্পের জন্য ভর্তুকি বা কর রেয়াত প্রত্যাহার; পরিবেশগতভাবে ক্ষতিকারক কার্যক্রম থেকে তহবিল সরিয়ে সবুজ উদ্যোগে বরাদ্দ; জনসাধারণের কাছে সবুজ বাজেটের লক্ষ্য এবং অগ্রগতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরলে আস্থা বাড়বে, সবুজ করনীতির প্রতি সমর্থন বাড়বে।
সবুজ করনীতিতে প্রকৃতিবান্ধব উৎপাদন, ভোগ ও বিনিয়োগকে সুষম, ন্যায্য এবং নিম্ন হারে প্রত্যক্ষ করারোপ এবং সব ধরনের প্রকৃতিবিরোধী উৎপাদন ও ভোগকে প্রগতিশীল হারে করারোপ করতে হবে। টেকসই অর্থায়ন কৌশল নির্ধারণ করে জলবায়ু ও পরিবেশ ঝুঁকি তহবিল প্রতিষ্ঠায় সবুজ বাজেটের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিবেশগত ও সামাজিক বিবেচনাকে অগ্রাধিকার প্রদান করে ঢেলে সাজাতে হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অনুদান, কার্বন ও দূষণ করারোপ, সিএসআর-যুক্ত তহবিলে প্রধান জোগানদাতা হবে। এছাড়া বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের বিনিয়োগে সৃষ্ট সবুজ বন্ডে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। প্রাকৃতিক ও বৈষয়িক সম্পদের সুরক্ষায় ভর্তুকিভিত্তিক ঝুঁকি বীমা এবং ঋণ প্রদানের মাধ্যমে সবুজ ব্যবসাকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। তবে সবুজ বাজেটের সফলতা নিশ্চিতে বাস্তবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, শুদ্ধাচার চর্চা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের বিকল্প নেই।





