মাংস প্রক্রিয়াকরণে দেশের শীর্ষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল মিটস প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। আগামী বাজেটকে সামনে রেখে দেশের গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা, মাংস উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণসহ প্রাণিসম্পদ খাতের বিভিন্ন দিক নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাপ্লাই চেইন ও রফতানি বিভাগের এজিএম (অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার) এ কে এম সায়েদুল হক ভূঁইয়া (আল আমিন)। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইয়াহইয়া নকিব
দেশে মাংসের চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি থাকলেও দাম নিয়ে ভোক্তারা অসন্তুষ্ট কেন?
প্রাণিসম্পদ খাতে পশুখাদ্যের পেছনে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করতে হয়। এটা দেশের পশুপালন খাতের জন্য একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ খাতে আমদানি ব্যয় অনেক বেশি। এখানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অনেক কাজ করার বিষয় রয়েছে। ফিড ব্যয় না কমানো গেলে চাহিদার চেয়ে মাংস বেশি উৎপাদন হলেও দাম কমানো যাবে না। মাংসের দাম বেশি হওয়ার এটা অন্যতম কারণ। তাই আমাদের পশুখাদ্যের আমদানিনির্ভরতাও কমাতে হবে।
মাংসের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আনতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?
ফিডের ক্ষেত্রে অনেক ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এসেছে। এসব প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বিষয় রয়েছে। আবার দেশের কৃষকরা এখন বেশি মাত্রায় পশুর দানাদার খাবারের ওপর নির্ভরশীল। ভুট্টা-গম আমদানি করে এসব পশু খাবারের উৎপাদন বাড়ানো যায়। এতে আমদানিনির্ভরতা কমতে পারে। তবে আমাদের দানাদার পশুখাদ্যের নির্ভরতা কমিয়ে ঘাসের দিকে যেতে হবে। ঘাসের খরচও কম। তবে যেসব ঘাসে নিউট্রিশন বেশি থাকে সেদিকে নজর দিতে হবে। সে ধরনের ঘাস চাষ করতে হবে। এতে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত সময়ে পশুর গ্রোথ হবে। এক্ষেত্রে পশুপালনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ফিডের ব্যবহার কমলে উৎপাদন ব্যয়ও কমবে।
প্রক্রিয়াজাত মাংস খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কেমন?
দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হচ্ছে। অনেক নতুন নতুন খাবার হোটেল তৈরি হচ্ছে। এসব হোটেলে ভোক্তাও বাড়ছে। বিদেশী চেইন শপও চালু হচ্ছে। তবে মাংস প্রক্রিয়াকরণ খাতে নিরাপদ খাবারের জন্য সচেতনতা দরকার। নিরাপদ খাদ্যের জন্য আইনি কাঠামো প্রয়োজন। দেশে এটা নিয়ে কাজও হচ্ছে। তবে বিশ্ব নিরাপদ খাদ্যে অনেক এগিয়ে গেছে। মানুষ সচেতন হলে এখানে গ্যাপ থাকবে না। মানুষ সচেতন হলে এ খাত আরো এগিয়ে যাবে। আমরাও সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি।
এ খাতের উন্নয়নে আপনারা সরকারের কাছে কী ধরনের নীতি সহায়তা প্রত্যাশা করেন?
সম্পূর্ণ দেশীয় পণ্যের ওপর নির্ভর এ খাতের ওপর অন্যান্য শিল্পের মতো করপোরেট ট্যাক্স-ভ্যাট আরোপ করা শিল্পসহায়ক হবে না। এ খাতের সহায়ক একটি করপোরেট কর নির্ধারণ করা উচিত। আবার ভ্যালু অ্যাডেড পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ এ খাতের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন এ শিল্প বিকাশের সময়। পরবর্তী সময়ে এ হারে ভ্যাট দেয়া যাবে। কিন্তু এ মুহূর্তে শিল্পকে টেকসই করার জন্য ট্যাক্স-ভ্যাট সহনীয় করা উচিত। কোল্ড চেইন যন্ত্রপাতি আমদানি করতে গেলেও অন্য খাতের মতো শুল্ক দিতে হয়। এটাকে কীভাবে সহনীয় করা যায়, তা ভাবতে হবে। কয়েক বছর ধরে আমরা এসব বলে আসছি। কিন্তু কোনো সমাধান পাইনি।
আবার কৃষক পর্যায়ে ঋণ নিতে অনেক ডকুমেন্ট লাগে। সুদের হারও বেশি। কৃষকদের অ্যাকসেস টু ফাইন্যান্স সহজ করা উচিত। তখন খামারিরা একটির জায়গায় ১০টি গরু পালতে পারবেন। ধান-পাটের মতো এ খাতেও ভর্তুকি দেয়া প্রয়োজন। গবেষণা ও প্রযুক্তিগত প্রকল্প নেয়া দরকার।
বিদেশ থেকে কম দামে মাংস আমদানির কথা বলা হচ্ছে, এ বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী?
এ বিষয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে শুধু আমরা উদ্বিগ্ন নই। অন্য সবারও উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা। কারণ ভারত থেকে আগে আমরা গরু ও ডিম আমদানি করতাম। কিন্তু এখন নিজেরা উৎপাদন করতে পারছি। ফলে আমদানিনির্ভরতা কমেছে আমাদের। দেশে এখন এক লাখের বেশি খামার হয়েছে। এতে বিপুল বিনিয়োগ আছে। সম্পূর্ণ দেশীয় এ শিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থান হয়েছে। এখন মাংস আমদানি করা হলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। যেমন ধরুন এসব খামারের গোবরের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা ঠিক থাকছে। যা সার দিয়ে হবে না। আবার মাংস আমদানি করতে গেলে খামার বন্ধ হয়ে যাবে। তখন দুধের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। এখানেও আমদানিনির্ভরতা তৈরি হবে। ৫০০ টাকা কেজি মাংস আমদানি করে খাওয়ানো যাবে। কিন্তু তখন দেশীয় পশুপালন শিল্প প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যাবে। আশা করছি সরকার এসব বিষয় চিন্তা করেই সিদ্ধান্ত নেবে।
সরকারের কোনো নীতি এ খাতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন কি?
উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য বিদেশী জাত আনার চেষ্টা করতে হবে। দেশীয় জাতের ক্ষতি না করেই এটা করতে হবে। ব্রাহামা জাত আনার চেষ্টা করা হয়েছিল এখানে। দুধের ও মাংসের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে দশটির বদলে একটি গরু ভালো হবে কিনা, সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একটি গরু দিয়েই এখন ১০টির সমান দুধ উৎপাদন সম্ভব।
দেশে মাংস উৎপাদনের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে?
ফিডের উচ্চ দাম এখন বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। পশুখাদ্যের ব্যয় কমলে মাংসের দামও কমে যাবে। আর প্রাণী লালন-পালনের জ্ঞানের অভাব রয়েছে আমাদের। ভ্যাকসিন ও হাইজিনের মতো বিষয়ে খামারিদের নলেজ গ্যাপ কমাতে হবে। এসব ক্ষেত্রে প্রযুক্তিরও অভাব রয়েছে। পরিচর্যার বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। আধুনিক ফ্যাটেনিং পদ্ধতি প্রয়োগের দিক দিয়েও আমরা পিছিয়ে রয়েছি। তাই এসব নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।





