ডেমোক্রেটিক বাজেট মুভমেন্ট (ডিবিএম) নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি অরাজনৈতিক ও অলাভজনক প্লাটফর্ম যার লক্ষ্য হচ্ছে কেন্দ্র ও প্রশাসননির্ভর জাতীয় বাজেটকে জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে সাধারণ নাগরিকের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সেজন্য সারা দেশে সামাজিক উদ্যোগ জোরদার করা। জেলাবাজেটসহ ‘বাজেট বিকেন্দ্রীকরণ’ ডিবিএমের একটি ফ্ল্যাগশিপ ক্যাম্পেইন। এ বিষয়ে ডিবিএম গত এক যুগেরও বেশি সময় গবেষণা, বাজেট সাক্ষরতা ও অ্যাডভোকেসি করে আসছে। ডিবিএম ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠন আয়োজিত ‘জন বাজেট সংসদ’ শীর্ষক ছায়া বাজেট সংসদ এক দশক ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে সাধারণ করদাতা, উদ্যোক্তা, কৃষক-শ্রমিক, নারী, দলিত, আদিবাসী, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী, গবেষক, জনপ্রতিনিধি, ট্রেড ইউনিয়নকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধি এ সংসদে উপস্থিত থেকে জাতীয় বাজেট বিষয়ে তাদের সুচিন্তিত মতামত দেন এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে তা উপস্থাপন করেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জলবায়ু ও আর্থিক সংকট মোকাবেলাকে প্রাধান্য দিয়ে জনবাজেট প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে।
শ্রম খাতে বাজেটের ধরন-ধারণ
বাংলাদেশে সর্বশেষ শ্রম জরিপের তথ্যানুযায়ী দেশে শ্রমশক্তিতে এখন ৭ কোটি ৩৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ আছে। ২০১৮ সালের মার্চে প্রকাশিত শ্রম জরিপের তথ্যানুযায়ী শ্রমশক্তির আকার ছিল ৬ কোটি ৩৫ লাখ। পাঁচ বছরের ব্যবধানে শ্রমশক্তির আকার বেড়েছে প্রায় এক কোটি। অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রায় ২০ লাখ নতুন শ্রমশক্তি যুক্ত হয় পুরনো ভাণ্ডারে। এই শ্রমশক্তির বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ‘শ্রমিক’। প্রশ্ন হলো, তাদের উন্নয়ন প্রশ্নে জাতীয় বাজেট কতটা যত্নশীল এবং এ বিষয় নিয়ে কথা বলার দরকার কিনা।
শ্রম খাতসংশ্লিষ্ট দুটি মুখ্য মন্ত্রণালয় হলো শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। বিগত সাত বছরের বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বেড়েছে ১৬ শতাংশের মতো। তবে জাতীয় সম্মিলিত বরাদ্দের মধ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের হিস্যা কমেছে, যা দাঁড়িয়েছে দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে। একই চিত্র প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রেও। টাকার অংকে বরাদ্দ বাড়লেও আনুপাতিক হিস্যায় বরাদ্দ কমেছে এবং যেটা দাঁড়িয়েছে মোট বরাদ্দের মাত্র দশমিক ১৩ শতাংশে।
শ্রমসংশ্লিষ্ট দুটি মন্ত্রণালয়ের উপরোক্ত বাজেটপ্রবণতা থেকে এটা অনুমান করা যায়, জাতীয় বরাদ্দের ক্ষেত্রে শ্রম খাতের গুরুত্ব কম। অর্থাৎ বরাদ্দের অগ্রাধিকার তালিকায় নেই তারা। বছরওয়ারি জাতীয় বরাদ্দের হিস্যায় শ্রমজীবীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর অংশীদারত্ব বাড়ছে না।
২০২২-২৩ সালের বাজেটে আমরা দেখেছি, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে করোনাভাইরাসের অভিঘাত প্রতিহত করতে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু তাতে শ্রমজীবীদের কোনো বিশেষ অগ্রাধিকার ছিল না।
বাজেটকালে শ্রমিকরা কী চান?
শ্রমজীবীরা চায় সংবিধানের ১৪ ও ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন। সংবিধান যেহেতু ‘রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি’র অংশ এবং ‘প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন’, সেজন্য সংবিধানের মূলনীতির আলোকে বাজেটের কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস চান শ্রমিকরা। যেমন বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪ ও ১৫ নং অনুচ্ছেদ বলছে:
১৪। রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে—কৃষক ও শ্রমিককে—এবং জনগণের অনগ্রসর অংশকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা।
১৫। রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে...
(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা;
(খ)...যুক্তিসংগত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের অধিকার নিশ্চিত করা;
...
(ঘ) সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার...অভাবের সময় সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার নিশ্চিত করা।
সংবিধানের এসব অনুচ্ছেদের বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট আইনগত ও উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই।
জাতীয় ন্যূনতম মজুরি
বিশ্বের অন্তত ৭৫টি দেশে এরই মধ্যে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি রয়েছে। কোথাও সেটা আছে ঘণ্টার হিসাবে, কোথাও আছে দিন, সপ্তাহ বা মাসের হিসাবে। বাংলাদেশে সরকারের দারিদ্র্য নির্মূল কর্মসূচি সফল করতে হলে এবং শ্রমিকদের জীবনমান বাড়াতে হলে শ্রমের ন্যূনতম দর ঠিক করা দরকার। মজুরির জাতীয় ন্যূনতম মানদণ্ড ছাড়া সরকার অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কোটি কোটি কর্মজীবী পরিবারকে দারিদ্র অবস্থা থেকে চূড়ান্তভাবে উদ্ধার করতে পারবে না। অথচ দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়া সরকারের প্রধান লক্ষ্য। বলা যায়, জাতীয় বাজেটের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি আইনের অভাবে।
শ্রমিকদের বসবাসের জন্য জেলায় জেলায় আবাসন
একট সময় পাটসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমিকদের জন্য বিস্তর কলোনি ছিল। অথচ স্বাধীন দেশে সবচেয়ে বড় শ্রম খাত পোশাক শিল্পে ১ শতাংশ শ্রমিকও থাকার জায়গার প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা পান না। বাংলাদেশ যখন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রমিক প্রেরণের বিষয়ে চুক্তি করে তখন সেখানে আবাসন সুবিধা চাওয়া হয়। ঠিক একইভাবে নিজ দেশে কর্মস্থলের আশপাশে মালিকদের দ্বারা শ্রমিকদের থাকা নিশ্চিত করার বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে এখন।
শ্রমিকদের জন্য পৃথক হাসপাতাল
শ্রমিকদের সুস্থতা শিল্পের স্বার্থেই জরুরি। শ্রম আইনে পেশাগত কারণে শ্রমিকদের ৩৩ ধরনের ব্যাধির উল্লেখ আছে। শিল্পের বিকাশ যেভাবে ঘটছে, ব্যাধি যেভাবে বাড়ছে সেভাবে নেই শ্রমিকদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল। প্রতিটি জেলার শিল্পঘন এলাকাগুলোয় শ্রমজীবীদের জন্য হাসপাতাল দরকার। বাড়ি ভাড়া ও প্রাইভেট মেডিকেলের খরচ শেষে শ্রমিকদের হাতে খাওয়া খরচ বিশেষ কিছু থাকে না।
রেশন কার্ড
খাদ্য কেবল বেঁচে থাকার জন্য নয়। শ্রম উৎপাদনশীলতার জন্যও খাবারের সংস্থান দরকার এবং সেজন্যই বর্তমান বাজারে শ্রমিকদের রেশন পাওয়া জরুরি। বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে শ্রমিকরা প্রায় কেউ এখন আর তৃপ্তি করে ভরপেট খেতে পারছেন না। দেশজুড়ে রেশনের দোকান স্থাপন করতে হবে এবং এ রকম যেকোনো দোকান থেকে একজন শ্রমিক তার কার্ড দেখিয়ে যাতে বরাদ্দ তুলতে পারেন, সে রকম ডিজিটাল ব্যবস্থা করতে হবে।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ভাতা
সর্বশেষ শ্রম জরিপে বলা হয়েছে, দেশে কর্মজীবী নারী আছেন আড়াই কোটি। এর বড় অংশই কাজ করেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মজীবী নারীরা শ্রমিক হয়েও শ্রম আইনের সুবিধাবঞ্চিত। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও আর্থিক সুবিধা আছে। কিন্তু অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের নারী শ্রমিকদের (যেমন গৃহশ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক ইত্যাদি) জন্য গর্ভকালে কোনো সুবিধা নেই। বিশ্বের অনেক দেশে এ রকম সুবিধা আছে। তার জন্য রাষ্ট্রের খরচ হয় সামান্যই। মাতৃত্ব ভাতায় এসকল নারী শ্রমিকের অন্তভূক্তি দরকার।
শ্রমিকের জন্য কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ
করোনাকালে আমরা দেখেছি, শ্রমিকের সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজ না থাকায় সরকারের বা বিদেশী সংস্থার অনেক সহায়তা শ্রমিকের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তাছাড়া সঠিক ডাটাবেজের অভাবে সঠিক পরিকল্পনার ঘাটতি তৈরি হয়। শ্রমিকের দক্ষতা-যোগ্যতা বৃদ্ধিসহ প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে শ্রমিক সম্পর্কিত সঠিক তথ্য থাকতে হবে। এ বছরের বাজেট প্রণয়নে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয়া দরকার।
বেকারের সংজ্ঞা পরিবর্তন
সর্বশেষ শ্রম জরিপে বলা হয়েছে, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৩০ হাজার। এ রকম তথ্যে অনেকে বিস্মিত হয়ে বলেছেন, যে সংজ্ঞার আলোকে জরিপ বিভাগ বেকারের সংখ্যা নির্ধারণ করেছে তাতে গলদ আছে। এ সংজ্ঞা অনুযায়ী সপ্তাহে ১ ঘণ্টা কাজ করলে কেউ আর বেকার নন। এ রকম সংজ্ঞা দিয়ে বেকারের প্রকৃত সংখ্যা কমিয়ে দেখানো গেলেও জাতীয়ভাবে দেশের কোনো লাভ নেই তাতে। বরং সংজ্ঞাটা আরো প্রসারিত করে বেকারদের প্রকৃত সংখ্যা জানা গেলে যথাযথ কর্মসংস্থান নীতি ও কৌশল নেয়া যায়।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের বাজেটে কর্মসংস্থান সম্পর্কিত তথ্য, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদির জন্য ‘কর্মসংস্থান অধিদপ্তর’ নামে নতুন অধিদপ্তর চালু করার কথা বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হলেও সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বরাদ্দ যেমন বাজেটে ছিল না, পরবর্তীকালে এ রকম দপ্তরের কোনো তৎপরতাও বেকাররা দেখছে না। এবারের বাজেটে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হওয়া দরকার।





