প্রথমেই আমি একজনকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা, দূরদর্শী ও বিচক্ষণ পরিকল্পনা এবং আন্তরিক প্রয়াস আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সুদৃঢ় করেছে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করেছে। বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। সেই সঙ্গে আমরা ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট উন্নত বাংলাদেশে উন্নীত হওয়ার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

বর্তমানে জাতীয় অর্থনীতি একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ালেও করোনা-পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব এবং চলমান রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যেও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতির উন্নয়নের গতিধারাকে এগিয়ে নিতে হচ্ছে। এজন্য দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সহায়ক পরিবেশকে আরো সুদৃঢ় ও জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ অর্থনীতি সঠিক গতিতে চললেই সরকার তার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ করতে পারবে।

বর্তমান সরকার পর পর চতুর্থবারের মতো দায়িত্ব গ্রহণ করায় আগামী বাজেটকে ঘিরে জনগণের ব্যাপক প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে। সামগ্রিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এবারো অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে একটি জনমুখী ব্যবসাবান্ধব বাজেট প্রণীত হবে বলে আমরা আশা করি।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বাজার মনিটরিং, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স প্রবাহ, রফতানি বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ/বহুমুখীকরণ/নতুন বাজার সংযোজন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সুদহার এবং আর্থিক ও ব্যাংক খাতের সংস্কার, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন কার্যক্রম জোরদারকরণ, ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও বৃদ্ধিকরণ, রাজস্ব নীতির সংস্কার এবং মুদ্রা ও রাজস্ব নীতির মধ্যে সমন্বয়, সর্বস্তরে সুশাসন এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাই জাতীয় অর্থনীতিতে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে আমি মনে করি।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, অষ্টম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনা, এসডিজি অর্জন, নির্বাচনী ইশতেহার, স্মার্ট বাংলাদেশ ও সর্বোপরি ভিশন ২০৪১-কে সামনে রেখে আমাদের অর্থনৈতিক পলিসি সমন্বয় করা জরুরি। বিদ্যমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রাগুলোর আলোকে সুষ্ঠু অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সমুন্নত রাখতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় পর্যায়ক্রমে সুদৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করার লক্ষ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকবে বলে এফবিসিসিআই মনে করে।

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানকে দৃঢ় করতে ব্যবসায়িক খরচ (কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস) কমিয়ে আনা, বিনিয়োগ সুরক্ষা, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুষম বিনিয়োগ সহায়ক মুদ্রা ও শুল্ক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, শিপিং খরচসহ সব ধরনের পরিবহন খরচ হ্রাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ প্রভূতি ক্ষেত্রে স্থায়ী পরিকাঠামো উন্নয়নে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর আদায়ের ক্ষেত্রে হয়রানি ও জটিলতা দূরীকরণের মাধ্যমে ব্যবসাবান্ধব কর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে আগামী বাজেটে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়ার জন্য আমরা আহ্বান জানাচ্ছি।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ১৫ বছরে ৯০ বিলিয়ন থেকে ৪৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। সামনের দিকে আরো বড় হবে অর্থাৎ ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে বেশি সময় লাগবে না। তবে সে অনুপাতে আমাদের সক্ষমতা হয়নি। আমরা জানতে পারছি, আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৮ লাখ কোটি টাকা। এজন্য রাজস্বসংক্রান্ত আইনকানুন প্রণয়ন, আধুনিকায়ন করা এবং দেশের অর্থনীতির স্বার্থে তা সঠিকভাবে বাস্তবায়নে সরকার এবং বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করার বিকল্প নেই।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ওপর বিশেষ নজর দেয়া জরুরি বলে আমি মনে করি। এর মধ্যে কর্মসংস্থানের স্বার্থে বিনিয়োগ, দেশীয় শিল্প ও সেবা এবং সিএমএসএমইকে শুল্ক করের যৌক্তিক প্রতিরক্ষণ প্রদান, ক্ষেত্রবিশেষে অব্যাহতি বা বন্ড সুবিধা দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক ভিত্তিতে রফতানি বৈচিত্র্যকরণের প্রয়াস অব্যাহত রাখা, ভোগ্যপণ্যসহ নিত্যব্যবহার্য পণ্যের মূল্য ও সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, করনীতি, কর পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন, অটোমেশন ও ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে নেট বা কর জাল সম্প্রসারণ করা, স্বেচ্ছায় কর প্রতিপালন হার বৃদ্ধিপূর্বক রাজস্ব আদায় তথা কর জিডিপির অনুপাত বৃদ্ধি করা, আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও যথাযথ করনীতির মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করা, সমন্বিত শুল্ককর এবং মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।

এদিকে রাজস্ব সংস্কারসংক্রান্ত প্রস্তাবে আমরা কিছু বিষয় তুলে ধরেছি। এর মধ্যে করহার কমিয়ে আয়কর এবং মূসকের আওতা সম্প্রসারণ করে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ বাড়ানো, ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে আয়করের আওতা বাড়ানো, সক্ষম করদাতাদের আয়করের আওতায় আনা এবং এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সমন্বিত ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জরুরি সংস্কারক আবশ্যক। এছাড়া আমদানি পণ্যের যথাযথ শুল্কায়ন, পণ্য খালাস এবং সব ধরনের শুল্ক ও কর পরিশোধ ত্বরান্বিত করার জন্য বিদ্যমান অ্যাসাইকুডা সিস্টেমের সার্বিক উন্নয়নসহ বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো-সংক্রান্ত কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করার পাশাপাশি বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো বাস্তবায়নের সময়সীমা সুনির্দিষ্ট করা এবং অথরাইজড ইকোনমিক অপারেটরের (AEO) সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া। এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আহরণ এবং রাজস্ব পলিসি কার্যক্রম পৃথক করা এবং ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন বিভাগ নামে একটি বিভাগ গঠন করা, ট্যাক্স, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনকে সমন্বয়করণ ও অটোমেশনের আওতায় নিয়ে আসা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য ও গবেষণা অনুবিভাগকে শক্তিশালী করার জন্য একজন সদস্যকে পৃথকভাবে দায়িত্ব প্রদান করা দরকার। এছাড়া সব ধরনের সুযোগ সুবিধাসহ বাজেট সমন্বয় নামে স্থায়ীভাবে পৃথক একটি অনুবিভাগ গঠন করার সময় এসেছে বলে আমি মনে করি। এছাড়া আমদানীকৃত কাঁচামাল, মধ্যবর্তী কাঁচামালসহ যাবতীয় শিল্প উপকরণের ওপর আরোপিত অগ্রিম আয়কর (এআইটি) এবং ভ্যাট আইনের আওতায় আগাম কর (এটি) প্রত্যাহার করা, ঢাকায় একটি পৃথক বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) এবং চট্টগ্রামে একটি বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) স্থাপনসহ দেশের সব উপজেলায় আয়কর অফিস চালু করে সক্ষম করদাতাদের আয়করের আওতায় নিয়ে আসা, ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি বাস্তবায়নের দায়িত্ব (স্থানীয় শিল্পের স্বার্থে) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে দেয়া, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নিরীক্ষা ও পরিদর্শনসংক্রান্ত কার্যক্রম বিধিগত পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণের মাধ্যমে পরিচালনা করার প্রস্তাব করেছি আমরা।

মূসকসংক্রান্ত প্রস্তাবের ক্ষেত্রে আমরা এফবিসিসিআই থেকে বলেছি, মূসক আইন-৩১(২) ধারার আলোকে পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে আমদানীকৃত উপকরণের ক্ষেত্রে ৩ ও ৫ শতাংশ আগাম কর (AT) প্রত্যাহার করা, উৎসে কর্তন বা VDS সম্প্রসারণ না করে ক্রমান্বয়ে কর্তনের হার কমিয়ে আনার প্রস্তাব করেছি আমরা। 

এর বাইরে সম্পূরক শুল্ক কেবল বিলাসদ্রব্য, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য তালিকাভুক্ত পণ্য এবং অনভিপ্রেত দ্রব্য ব্যবহার সীমিত করার উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা, আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখার লক্ষ্যে আমদানি সীমাবদ্ধ করার জন্য তালিকাভুক্ত পণ্য বা সেবার ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা, রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং বাজার বহুমুখীকরণের উদ্দেশ্যে ছোট, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে কাঁচামালের উপকরণ প্রাপ্তি সহজীকরণ করার উদ্দেশ্যে আংশিক বন্ড চালু করা এবং সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ চালু করা, উৎপাদনকারী, আমদানিকারক ও ট্রেডারদের উদ্ভূত সমস্যা নিরসনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর, মূসক ও শুল্ক বিভাগে প্রতি তিন মাস পর পর আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা, মূলধনি যন্ত্রের খুচরা যন্ত্রাংশ শিল্প আইআরসির আওতায় পৃথকভাবে আমদানি করা হলে উচ্চ শুল্কে শুল্কায়ন করা হয়, যা বিনিয়োগ ও শিল্পের পরিপন্থী বলে আমি মনে করি। এজন্য মূলধনি যন্ত্রের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে রেয়াতি হারে অর্থাৎ ১ শতাংশ শুল্কায়ন করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর প্রস্তাব করেছি।

সার্বিকভাবে বিশ্বায়ন পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার লক্ষ্যে দেশের বেসরকারি খাতকে দৃঢ় অবস্থানে স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টির জন্য একটি সুদূরপ্রসারী, বাস্তব ও যুগোপযোগী পরিকল্পনার প্রতিফলন বাজেটে থাকবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।