স্বাধীনতার পর পরই বাংলাদেশের ফসেট শিল্পের যাত্রা ভালোভাবে শুরু হয়েছে। ফসেট শিল্প মাঝারি শিল্প হিসেবে এসএমইর অন্তর্ভুক্ত। ঐতিহ্যবাহী স্যানিটারি ফসেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ফসেট ও এ ধরনের স্যানিটারি পণ্য উৎপাদন ও বিক্রির সঙ্গে এ দেশের কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। বিশ্ববাজারে ফসেট মার্কেটের আকার বার্ষিক ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। বাংলাদেশ থেকে ভারত, নেপাল, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে বিচ্ছিন্নভাবে দেশে উৎপাদিত পণ্য রফতানি হয়েছে। চীনে এ পণ্যের উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে এ পণ্য রফতানি করা কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। রফতানি শুল্ক কমিয়ে এনে এসব দেশে পোশাক শিল্পের মতো মেড ইন বাংলাদেশ ব্র্যান্ডের ফসেট রফতানি করার দারুণ সুযোগ রয়েছে। একটি ফসেট উৎপাদনে অনেক যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয়। এর প্রতিটি পার্ট উৎপাদনে এ ইন্ডাস্ট্রিতে ছোট-বড় এক হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মেধাবী ও পরিশ্রমী কর্মী রয়েছেন। বাংলাদেশের স্যানিটারি জগতে দেশী ও বিদেশী মিলিয়ে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি পণ্য কেনাবেচা হয়। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ বিদেশী পণ্য রয়েছে।

রফতানি শুল্ক কমিয়ে এনে এসব দেশে পোশাক শিল্পের মতো মেড ইন বাংলাদেশ ব্র্যান্ডের ফসেট রফতানি করার দারুণ সুযোগ রয়েছে। এ খাতের চ্যালেঞ্জ ও বাজেট প্রত্যাশা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন রাজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. নজরুল ইসলাম 

বিগত বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে? 

আমাদের বাজেট ফসেট শিল্পবান্ধব নয়। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে ফসেট শিল্পের জন্য ৫ শতাংশ ভ্যাট হার নির্ধারণের দাবি করেছিলাম। মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে ফসেট শিল্প এসএমইর অন্তর্ভুক্ত। এ শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী নয়। আমাদের যুক্তি ছিল যেহেতু আমাদের শিল্পের মূল কাঁচামাল হিসেবে স্ক্র্যাপ ব্যবহার করা হয় তাই শক্তিশালী বৃহদায়তন শিল্পের জন্য নির্ধারিত ভ্যাট হার আমাদের মতো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে আরোপ করার কারণে তা এ শিল্পের বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

এবারের বাজেটে ফসেট শিল্পের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবগুলো কী?

আমি এ শিল্পের সার্বিক বিকাশে সহনীয় ভ্যাট হার চাই, যা ৫ শতাংশের বেশি হতে পারে না। ঐতিহাসিকভাবে ফসেট শিল্প ঢাকার ভেতরে যাত্রাবাড়ী ও এর আশপাশে গড়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে এ শিল্পকে বৃহদায়তন রূপ দিতে হলে বড় পরিসরে আধুনিক শিল্প সুবিধাসম্পন্ন জায়গা প্রয়োজন। আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো হতে পারে আদর্শ স্থান। কিন্তু এখানে যেসব শর্ত আরোপ করা হয়েছে তা বড় শিল্প তথা শিল্পগোষ্ঠীর জন্য উপযোগী। তাই অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় ফসেট শিল্পের জন্য বিশেষ সুবিধায় প্লট বরাদ্দ প্রয়োজন। এছাড়া বিদেশ থেকে সহজেই ফসেট আমদানি করা যায় বলে আমাদের ফসেট মার্কেটের প্রায় ৫০ শতাংশ আমদানিকারকদের দখলে। দেশীয় ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প বাঁচাতে হলে আমদানিনির্ভরতা কমানো জরুরি। তাই ফসেট আমদানিতে শুল্ক হার আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। 

ফসেট শিল্পের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট কোন নীতিসহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন?

ফাউন্ড্রি শিল্পে স্থায়ীভাবে সংগৃহীত স্ক্র্যাপ ব্যবহার করলে ভিডিএস বা উৎসে কর অব্যাহতি দেয়া হয়। আমাদের ফসেট ইন্ডাস্ট্রি ফাউন্ড্রি শিল্প হওয়া সত্ত্বেও আমরা কর অব্যাহতি পাচ্ছি না। একটি ফসেট উৎপাদনে অনেক যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয়। এর প্রতিটি পার্ট উৎপাদনে এ ইন্ডাস্ট্রিতে ছোট-বড় এক হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মেধাবী ও পরিশ্রমী কর্মী থাকলেও মূলধনের তীব্র সংকট রয়েছে। দেশের প্রচলিত ব্যাংক ব্যবস্থায় লোন সংগ্রহ করা অত্যন্ত জটিল। শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলতে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা লোন সংগ্রহ সহজ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে এ ইন্ডাস্ট্রিতে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন অত্যাবশ্যক। সরকারি সহায়তায় দক্ষতা উন্নয়নে পর্যাপ্ত কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে দেশীয় শিল্প হিসেবে ফসেট ইন্ডাস্ট্রি মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।

বাংলাদেশে ফসেটের বাজারের আকার কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে? 

বাংলাদেশের ফসেট শিল্পের আকার দেশীয় ও বিদেশী পণ্য মিলিয়ে আনুমানিক ৪ হাজার কোটি টাকা। আবাসন খাত, নির্মাণ শিল্প ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে ফসেট শিল্পের উন্নয়ন জড়িত। গত এক দশকে বাংলাদেশে গড়ে ১২ থেকে ১৫ হাজার ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে। এছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতাধীন দেশব্যাপী অসংখ্য সরকারি আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এসব স্থাপনায় রাজা মেটালসহ দেশী-বিদেশী বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অসংখ্য ফসেট ব্যবহৃত হয়েছে বিধায় বিগত এক দশকে ফসেট শিল্পের শক্তিশালী ভিত গড়ে উঠেছে। ফসেটের এ চাহিদা প্রতি বছর ১০-১২ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা এ শিল্পকে করে তুলেছে আরো সম্ভাবনাময়। 

অভ্যন্তরীণ চাহিদার বিপরীতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কতটুকু?

দেশের ফসেট চাহিদার প্রায় ৫০ শতাংশ দেশীয় পণ্য দ্বারা পূরণ হচ্ছে। বাকি ৫০ শতাংশের সিংহভাগ ফসেট মূলত চায়না থেকে আমদানি করা। দেশীয় ফসেটের তুলনায় চায়নিজ ফসেট দেখতে আকর্ষণীয় ও দামে কম। তাই দেশীয় ফসেট ব্র্যান্ডগুলোর অনেকেই বিদেশ থেকে নিজ নামে ফসেট আমদানি করে। তাতে দেশীয় এ শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। আমরা রাজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ  জাপান, তাইওয়ান, জার্মানি ও চায়না থেকে উন্নত প্রযুক্তির মেশিন আমদানি করেছি। তাই আমাদের পণ্যের মান বহুগুণে বেড়েছে। 

আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশী ফসেট পণ্যের সম্ভাবনা ও সক্ষমতা কতটুকু?

ফসেটের আন্তর্জাতিক বাজারে অসংখ্য ব্র্যান্ড রয়েছে। প্রতিটি মার্কেট ভিন্ন ধরনের। আমাদের নিকটবর্তী আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরামে ফসেটের বড় বাজার রয়েছে। সেখানে জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে। ভারত সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য নতুন নতুন পদক্ষেপ নেয়ায় সেখানে ফসেটের চাহিদা বেড়েছে। এছাড়া নেপাল, ভুটান ও আফ্রিকার দেশগুলোয় মেড ইন বাংলাদেশ ফসেট রফতানি করা সম্ভব। 

দেশে উৎপাদিত ফসেট কতটুকু শাইনি? ফসেট পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া এবং কোয়ালিটি পণ্য সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও বিদেশী ফসেটের তুলনায় দেশীয় ফসেট নিম্নমানের ছিল। বর্তমানে দেশীয় ফসেটের শাইনিং বহু গুণে বেড়েছে। কক্সবাজারসহ কোস্টাল এরিয়ায় আগে দেশীয় ফসেটে দ্রুত মরিচা পড়ে যেত। রাজা ফসেটে মরিচারোধী থ্রি লেয়ার ইলেকট্রোপ্লেটিং থাকায় আমরা নিশ্চিন্তে ১২ বছরের গ্যারান্টি দিচ্ছি। এছাড়া দেশীয় ফসেটে উন্নতমানের কার্ট্রিজ ব্যবহৃত হচ্ছে। রাজা মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের নিজস্ব মোল্ড তৈরির মেশিন থাকায় আধুনিক ডিজাইনের ফসেট আমরা দেশেই উৎপাদন করা শুরু করেছি।  

দেশে ফসেট উৎপাদনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সংকট অনুভব করেন কি?

ফসেট উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল ও কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। ডলার সংকটের কারণে এসব আমদানি করা জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় প্রায়ই উৎপাদন জটিলতায় পড়তে হয়। সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোয় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। এছাড়া এ শিল্পে দেশীয় কাঁচামাল ও দক্ষ শ্রমিকের অনেক অভাব রয়েছে। 

এ খাতে কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে অবদান কতটুকু?

ফসেট উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয় ও সরবরাহ প্রক্রিয়ায় সারা দেশে প্রায় ৫০ লক্ষাধিক মানুষ জড়িত। সারা দেশে আনাচে-কানাচে ও বাজারগুলোয় অসংখ্য স্যানিটারি শপে বিভিন্ন বয়সী মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাই এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব অনেক বেশি।