তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রযুক্তির উৎকর্ষ দেশের প্রতিটি খাতে এনেছে বহুমাত্রিক পরিবর্তন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে চিকিৎসা, অর্থনীতি, রাজনীতি, নিরাপত্তা, সংস্কৃতিসহ প্রতিটি মৌলিক ক্ষেত্রে যুগান্তকারী বিপ্লব এনে দিয়েছে। প্রযুক্তিভিত্তিক সেবার কারণে কমেছে সময় ও ভোগান্তি। জীবনযাত্রার মান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে কর্মসংস্থানও। 

শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে বছরে স্থানীয় বাজারের আকার প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। আর রফতানির পরিমাণ ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ৭২ মিলিয়ন ডলার নতুন বিনিয়োগ এসেছে।

প্রযুক্তিগত দক্ষতায়, অনলাইন লার্নিং প্লাটফর্ম কোরসেরার বৈশ্বিক দক্ষতা সূচকে ‘গ্লোবাল স্কিলস ইনডেক্স ২০১৯’ অনুযায়ী অপারেটিং সিস্টেম ও সফটওয়্যার প্রকৌশলের মতো ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হারে ভালো করছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি আইটিইউ অ্যাওয়ার্ড, সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড, গার্টনার এবং এ টি কারনিসহ বেশ কয়েকটি সম্মানজনক স্বীকৃতি পেয়েছে দেশ। এতে স্পষ্ট হচ্ছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব মোকাবেলায় বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের চিত্র। তবে ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্টে আরো জোর দেয়ার পাশাপাশি দেশে স্থায়ী বাজার প্রসারে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পকে সঙ্গে নিয়ে ই-গভর্ন্যান্সসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

আইটি ও আইটিইএস খাতের কর অব্যাহতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন স্মার্ট টেকনোলজিস বিডি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম


১৯৯৮ সাল থেকে স্মার্ট টেকনোলজিস কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এরই মধ্যে ১০০টিরও বেশি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছে। স্মার্টের এ যাত্রাপথের গল্প শুনতে চাই।

আমরা ১৯৯৮ সালে খুব সীমিত পরিসরে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে ছোট একটা অফিস নিয়ে অল্প কয়েকজন সহকর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। তখন আমরা দু-একটি ব্র্যান্ডের জেনুইন অ্যাকসেসরিজ পণ্য পরিবেশন শুরু করি। আমাদের পরিবেশিত প্রথম ব্র্যান্ড ছিল টুইনমোস। ছোট পরিসরে শুরু করলেও আমাদের পণ্য ও সেবার মানের কারণে মার্কেটে আমাদের একটা সুনাম প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। এরপর ক্রমান্বয়ে আমাদের সঙ্গে গিগাবাইট, স্যামসাং ও হিউলেট প্যাকার্ডের মতো বিশ্বনন্দিত ব্র্যান্ডগুলো যুক্ত হয়। ২০১০ সালের পর থেকে নতুন ব্র্যান্ড যুক্ত হওয়ার সংখ্যাটা খুব দ্রুত বাড়তে থাকে।

এআইয়ের কথা আমরা শুনেছি, এর বিপজ্জনক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলছে। সম্প্রতি স্মার্ট টেকনোলজিস বাজারে এআই বিল্ডআপ পিসি নিয়ে এসেছে। সে হিসেবে বলতে গেলে হার্ডওয়্যারের সঙ্গে আপনারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এসেছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে স্মার্ট টেকনোলজিস কী ভাবছে? প্রযুক্তি খাতের অংশীদার হিসেবে নতুন এ প্রযুক্তির জন্য কী কী করবে?

স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেড সবসময়ই লেটেস্ট প্রযুক্তি পণ্য দেশের মানুষের হাতে পৌঁছে দিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি আমরা গিগাবাইটের এআই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিল্ডআপ ল্যাপটপ বাজারে নিয়ে এসেছি। যেন বিশ্বের সঙ্গে তাল রেখে আমরাও প্রযুক্তি ব্যবহারে আপডেটেড থাকতে পারি। ডিভাইসগুলো আমরা দেশের মানুষের হাতে তুলে দিতে চাই। যেকোনো প্রযুক্তিরই ভালো ও মন্দ দিক রয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা লেটেস্ট প্রযুক্তি যেন সবাই ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করে নিজেদের কাজের গতিকে ত্বরান্বিত করতে পারে, সে বিষয়ে নানা রকমের সচেতনতা সৃষ্টি করব।

সরকার এআই পলিসি তৈরি করছে, এ নিয়ে আলোচনা চলছে। কিছুদিন আগে অংশীজন সভাও করেছে। সরকারের এ খাতের জন্য কী করা উচিত? কীভাবে এআইকে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

 

পৃথিবীতে যেকোনো প্রযুক্তিই উদ্ভাবিত হয় মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজতর করার জন্য। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকি তো থাকবেই। কিন্তু ঝুঁকির কথা চিন্তা করে তার ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না। মনে করুন, একটা ছুরি দিয়ে কেউ ফল, শাকসবজি কেটে খান। আবার একজন ছিনতাইকারী সেই ছুরি ঠেকিয়ে অপরাধ করে। বিষয়টা হচ্ছে আপনি কীভাবে এটা ব্যবহার করছেন। নতুন প্রযুক্তি যখন আসবে, তখন অবশ্যই তা ব্যবহারে সরকারের কিছু নীতি ঠিক করতে হবে। আর সেই নীতিমালায় এআইয়ের ক্ষতিকর ব্যবহারের বিষয়ে কঠিন শাস্তির বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। যেন কেউ নতুন প্রযুক্তির অপব্যবহার করতে না পারে।

 

দাহুয়া টেকনোলজিসের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে আপনারা কাজ করছেন। এ পর্যন্ত আপনারা কতটি ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেছেন?

 

দাহুয়া টেকনোলজিসের মতো ১০০টিরও বেশি ব্র্যান্ড নিয়ে এখন আমরা কাজ করছি। এর মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তির বিভিন্ন ক্যাটাগরির শীর্ষ অধিকাংশ ব্র্যান্ড রয়েছে। যেমন ল্যাপটপ ও ব্র্যান্ড পিসি ক্যাটাগরিতে রয়েছে অ্যাপল, এইচপি, ডেল, এসার, গিগাবাইট, লেনোভো। সিকিউরিটি পণ্যের ক্ষেত্রে রয়েছে দাহুয়া, হিকভিশন, ইউনিভিউ। সফটওয়্যারের মধ্যে রয়েছে মাইক্রোসফট, ক্যাসপারস্কি, এডোব, অটোডেস্ক, টিমভিউয়ার, ট্রেন্ড মাইক্রো, জোহো, রেডহার্ট। আর দুই বছর আগে সনির মতো জায়ান্ট ইলেকট্রনিক ব্র্যান্ডও আমাদের স্মার্ট পরিবারে যুক্ত হয়েছে, যা আমাদের পদযাত্রাকে পৌঁছে দিয়েছে আরো বেশি তৃণমূল মানুষ পর্যন্ত।

 

চট্টগ্রামে আপনারা হাইটেক পার্কে বিনিয়োগ করেছেন। বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কেও অবকাঠামো নির্মাণ কার্যক্রম চলমান। আপনারা পরিবেশক থেকে উৎপাদকে পরিণত হচ্ছেন। পরিবর্তনের এ সময়ে কী কী বিষয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন এবং সুবিধা হিসেবে কী কী থাকছে আপনাদের জন্য?

 

আমরা আসলে পরিবেশক থেকে উৎপাদকে পরিণত হচ্ছি না। আমরা পরিবেশকের পাশাপাশি উৎপাদক হওয়ার চেষ্টা করছি। আমাদের দেশে প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে এখনো বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, উৎপাদনের কাঁচামাল আমাদের প্রায় সিংহভাগই আনতে হচ্ছে বিদেশ থেকে। দ্বিতীয়ত, যেহেতু আমাদের দেশে প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া মাত্রই শুরুর দিকে, সেহেতু দেশে দক্ষ জনবল পাওয়াটাও কিছুটা চ্যালেঞ্জ হয় পড়ছে। সুবিধা যদি বলতে হয়, তাহলে একটা বিষয়ই বলতে হবে, তা হচ্ছে দেশে প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনে বর্তমান সরকারের আগ্রহ ও সদিচ্ছা।

 

আমাদের হাইটেক পার্কগুলোয় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ আসছে না। বিনিয়োগ না আসার পেছনে আপনি কী কারণ দেখছেন?

আমাদের হাইটেক পার্কগুলোয় এখন পর্যন্ত বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় দেশী প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে। বিদেশী একাধিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের বিষয়ে পর্যবেক্ষণে রয়েছে। যেহেতু প্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনের বিষয়টিই আমাদের দেশে নতুন, সেহেতু শুরুর দিকে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই। যেমন প্রযুক্তি জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, অভিজ্ঞ জনশক্তির অভাব, কাঁচামালের বিদেশনির্ভরতা। এখন অবধি পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না এলেও আমি আশা করছি সরকার আরো কিছু সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করলে শিগগিরই এখানে অনেকেই আসতে চাইবেন।

 

আমাদের মোবাইল ফোন উৎপাদকরা বলছে মোবাইল ফোনের অবৈধ আমদানির কারণে মার্কেটে টিকতে পারছে না। আমদানিকারক হিসেবে আপনারা কী চ্যালেঞ্জ দেখছেন?

 

অবৈধ আমদানি উৎপাদক এবং বৈধ আমদানিকারক উভয়ের জন্যই সমান ক্ষতিকারক। আমরা কয়েক বছর ধরেই অবৈধ আমদানি এবং ই-বর্জ্য আমদানির কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি এবং এখনো হচ্ছি। এটা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ প্রয়োজন।

 

দেশে আইটি ও আইটিইএস খাতে কর অব্যাহতির জন্য সংশ্লিষ্ট সবাই সরকারের প্রতি আহ্বান করছে। এমনকি প্রতিমন্ত্রীও কিছু প্রোগ্রামে কর অব্যাহতির জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। আপনি কী মনে করছেন? প্রযুক্তি খাতের কর ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত?

 

কম্পিউটার প্রযুক্তি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে যে কয়েকটি কারণ রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রযুক্তি পণ্যের আমদানিতে ট্যাক্স আরোপ। সরকার যদি এ ট্যাক্স মওকুফ করে দেয় তাহলে প্রযুক্তি পণ্যের দাম অনেকটাই কমে আসবে। একই সঙ্গে এসব পণ্যের দাম কিছুটা হলেও প্রান্তিক মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেমে আসবে। এতে অবৈধ আমদানিকারকদের দৌরাত্ম্য কিছুটা হলেও হ্রাস পেতে পারে।

 

সরকার স্মার্ট বাংলাদেশের ঘোষণা দিয়েছে। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নানা কার্যক্রমের কথাও বলছে। সরকারের বিগত এক বছরের কার্যক্রমকে স্মার্ট বাংলাদেশ তৈরির জন্য কতটুকু মানসম্পন্ন বলে মনে করেন?

 

স্মার্ট বাংলাদেশ মানে স্মার্ট প্রশাসন, স্মার্ট হেলথকেয়ার, স্মার্ট লার্নিং, স্মার্ট ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, স্মার্ট কৃষি, স্মার্ট বিচারিক কার্যক্রম, স্মার্ট সোশ্যাল সেফটি নেট, স্মার্ট পেমেন্ট সিস্টেমসহ মানুষের জীবনযাত্রার সর্বস্তরে স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার। এর মধ্যে সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে এটা সত্য। কিন্তু এখন পর্যন্ত এসব উদ্যোগ আর বাস্তবে তার প্রয়োগের মধ্যে বেশকিছুটা দূরত্ব রয়ে গেছে বলেই আমার মনে হয়।