প্রাচীনকাল থেকেই গৃহসজ্জার অন্যতম অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে সিরামিক পণ্য। মধ্যযুগে বিত্তশালী পরিবারগুলোর অন্দরমহলে দেখা যেত সিরামিক শিল্পের নানা রকম বাহার। কালের বিবর্তনে চাহিদা অনুযায়ী এ শিল্পে যোগ হয়েছে নানা ধরনের পণ্য। নির্দিষ্ট গণ্ডি ছাড়িয়ে সিরামিক পণ্য এখন পৌঁছেছে প্রান্তিক মানুষের হাতেও। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আমলে বগুড়ায় তাজমা সিরামিক ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ দেশে আধুনিক সিরামিক শিল্পের যাত্রা হয়। তারপর অভ্যন্তরীণ চাহিদার জোগান দিতে ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, যা ১৯৬৬ সাল থেকে উৎপাদনে আসে। স্বাধীনতার পর কোম্পানিটির নাম পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়ায় পিপলস সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বেঙ্গল ফাইন সিরামিক লিমিটেড। তারপর একে একে প্রতিষ্ঠিত হয় আরো বেশ কয়েকটি সিরামিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মুন্নু সিরামিক, ১৯৯৭ সালে শাইনপুকুর সিরামিক ও ১৯৯৮ সালে আরএকে সিরামিক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশীয় সিরামিক শিল্প গতি লাভ করে।

বাংলাদেশ সিরামিক উৎপাদক ও রফতানিকারক সমিতির (বিসিএমইএ) দেশে এখন ৭০টি সিরামিক কারখানা (টেবিলওয়্যার, টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার) আছে। এসব কোম্পানিতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আছে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। দেশে বর্তমানে সিরামিক পণ্যের বাজার ৭ হাজার ২৪৮ কোটি টাকার। 

দেশে এখন ৭০টি সিরামিক কারখানা (টেবিলওয়্যার, টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার) আছে। এ খাতের চ্যালেঞ্জ ও বাজেট প্রত্যাশা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান 

এম এ রহিম

সিরামিক খাতে আন্তর্জাতিক বাজার ক্রমেই বড় হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য হিস্যা নেই। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

আমাদের দেশে উৎপাদিত প্রতিটি পণ্যই আন্তর্জাতিক মানের। প্রতি বছর প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করা হয়। এর মধ্যে টেবিলওয়্যার ও স্যানিটারিওয়্যার রফতানি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের দেশের পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। তবে কভিডের কারণে দুই বছর আমরা খুব বেশি বিপণন করতে পারিনি। এমনকি কোনো মেলাও করতে পারিনি। কভিড-১৯ শেষ হতে না হতেই এখন ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে অনেক দেশ অর্থনৈতিকভাবে চাপে আছে। আমাদের রফতানির প্রধান গন্তব্য ইউরোপ-আমেরিকা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও জ্বালানি সংকটের কারণে এসব বাজারে আমাদের পণ্য রফতানির চ্যালেঞ্জ অনেকাংশেই বেড়েছে। সে কারণে বাংলাদেশের প্রতি বহির্বিশ্বের ক্রেতাদের আগ্রহ অনেক বেশি। রফতানিতে একটি দেশ তখনই ভালো করে, যখন পণ্যের গুণগত মান ও মূল্য দুটোই ঠিক থাকে।

সিরামিকে দেশীয় কাঁচামাল কতটুকু এবং আমদানি করতে হয় কতটুকু? এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কোনো জটিলতার মধ্যে পড়তে হয় কি?

গোটা সিরামিক শিল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ কাঁচামালই আমদানিনির্ভর। চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ কিছু ইউরোপিয়ান দেশ থেকে মূলত কাঁচামালগুলো আমদানি করা হয়। বর্তমানে ডলার সংকটে কোম্পানিগুলো কাঁচামাল আমদানিতে প্রচণ্ড রকমের বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

সিরামিক পণ্য বর্তমানে বিলাস পণ্যের গণ্ডি পার করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে রূপান্তর হচ্ছে। এর দাম ক্রেতা সাধারণের নাগালে রাখতে গেলে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?

সিরামিক পণ্যকে সবার নাগালের মধ্যে রাখতে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। ১. উৎপাদন ও কাঁচামালের খরচ যতটা সম্ভব কমানো। ২. উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নতি ও স্বয়ংক্রিয় মেশিনারিজের ব্যবহার খরচ কমাতে সাহায্য করবে। ৩. যতটা সম্ভব স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার বাড়াতে হবে, যা পণ্যের উৎপাদন খরচ কমাবে, ৪. গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়ার উন্নতি সাধন, সহজীকরণ, যা সময় ও খরচ দুইটাই কমাতে সহায়তা করবে। ৫. বিকল্প ও সাশ্রয়ী কাঁচামাল খুঁজে বের করার লক্ষ্যে কাজ করা। ৬. উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো। ৭. সরকার থেকে কর ও শুল্ক সহনীয় পর্যায়ে রাখা ইত্যাদি পদক্ষেপের মাধ্যমে সিরামিক পণ্য ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে রাখা সম্ভব। 

সিরামিক খাতের কোন ধরনের পণ্যগুলো রফতানির সুযোগ আমাদের জন্য বেশি এবং রফতানি গন্তব্য কোন দেশগুলো হতে পারে?

সৌখিনতা ছাড়িয়ে সিরামিকস এখন জীবনযাপনের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। বাংলাদেশে মূলত এখন তিন ধরনের সিরামিক পণ্য উৎপাদন হচ্ছে। টেবিলওয়্যার, স্যানিটারি ওয়্যার ও টাইলস। বর্তমানে ৬৬টি ব্র্যান্ড ছাড়াও ছোট-মাঝারি শতাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে সিরামিকস খাতে। বছরে প্রায় ২৫ কোটি পিস টেবিলওয়্যার, ১৫ কোটি স্কয়ার ফিট টাইলস ও ৫০ লাখ পিস স্যানিটারি ওয়্যার উৎপাদন করছে স্থানীয় কোম্পানিগুলো। তবে টেবিলওয়্যারের বড় অংশই রফতানি হচ্ছে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়। পাশাপাশি স্যানিটারি ওয়্যার ও টাইলস রফতানিরও বিশাল সুযোগ রয়েছে।

দেশের অর্থনীতিতে কী কী উপায়ে এ খাতের অবদান বাড়ানো যাবে?

দেশের অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। 

 সরকার ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন করা যেতে পারে, এতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে।

 নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ও কার্যক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, অটোমেশন ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার।

 দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে প্রাসঙ্গিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করা প্রয়োজন। এতে কর্মীদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে।

 কর ও শুল্কের বোঝা কমিয়ে এবং অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করা যেতে পারে, এছাড়া সহজ ঋণ প্রাপ্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

 দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য ও সেবার প্রবেশাধিকার বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। রফতানি বৃদ্ধি ও নতুন বাজার খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ।

 গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে নতুন পণ্য, সেবা ও প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করা যেতে পারে।

দেশের বাজারে আপনারা কয় ধরনের সিরামিক পণ্য সরবরাহ করেন? আপনাদের পণ্যের গুণগত মান নিয়ে ভোক্তাদের উদ্দেশে কী বার্তা দেবেন?

আমরা দেশের বাজারে বিভিন্ন ধরনের সিরামিক টাইলস সরবরাহ করি। আমাদের প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ফ্লোর টাইলস, ওয়াল টাইলস, পোরসেলিন টাইলস, ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাইলস ও সুগার ইফেক্ট টাইলস।

সিরামিক খাতে দেশে কর্মসংস্থান কেমন হচ্ছে? আগামীতে এটি কীভাবে বাড়বে?

বর্তমানে ৬৬টি ব্র্যান্ড ছাড়াও ছোট-মাঝারি শতাধিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে সিরামিকস খাতে। সরাসরি প্রায় ৫৫ হাজার কর্মীর পাশাপাশি সংযুক্ত শিল্প মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এ খাতে, যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

সিরামিক খাতে জ্বালানি সংকট ছিল কিছুদিন আগেও, সেটি কতটা সমাধান হয়েছে?

সিরামিক শিল্প ন্যাচারাল গ্যাসের ওপর প্রায় শতভাগ নির্ভরশীল। কিন্তু কয়েক বছরে গ্যাসের সরবরাহ না থাকায়, নির্দিষ্ট চাপ না থাকা, সিরামিক শিল্প ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। গ্যাসের অভাবে সিরামিক শিল্প-কারখানাগুলো প্রায় বন্ধের উপক্রম। গ্যাসের সঠিক সরবরাহ উচ্চ মান বজায় রাখার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। কম্প্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) ও লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) একটি অন্যতম কার্যকর বিকল্প হতে পারে, কিন্তু তা সাশ্রয়ী নয়। গ্যাস সরবরাহের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো সরবরাহ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছেনি।