বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রা রির্জাভের চাপ তো আছেই। পাশাপাশি ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ায় বাংলাদেশ যে নতুন বাস্তবতার সম্মুখীন হবে, তা সামনের দিনে আমাদের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলোকে স্পষ্ট করছে। 

আমাদের বাজেটের তিনটি মূল চ্যালেঞ্জ হবে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ধরে রাখা, রাজস্ব ব্যয় সংকোচন করে উন্নয়নমুখী বিনিয়োগের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর চাপ না ফেলে বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন করা। আমরা মনে করি বিদ্যমান অর্থনীতির এ রূপান্তরের সময়ে যে বিষয়গুলোকে বিবেচনা করা উচিত সেগুলো হলো রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাপনার সংস্কার, করজাল বৃদ্ধি, স্থানীয় শিল্পায়ন ও শিল্প খাতের উন্নয়ন, অটোমেশন, সহজ ও ব্যবসাবান্ধব আয়কর ব্যবস্থা, রফতানি বহুমুখীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ।

কয়েক বছর ধরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গৃহীত কার্যক্রমের ফলে বর্তমানে টিআইএনধারীর সংখ্যা ১ কেটি ৪০ লাখ ৮৯ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে আয়কর রিটার্নের পরিমাণ অনেক খানি বেড়েছে। তবে এখান থেকে যেটা স্পষ্টত প্রতীয়মান হচ্ছে যে যদিও টিনধারীর সংখ্যা বাড়ছে, তবে রিটার্ন দাখিলকারীর প্রকৃত সংখ্যা এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। ঢাকা চেম্বার মনে করে, এক্ষেত্রে কাজ করার প্রচুর সুযোগ রয়েছে। পিএসআর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা একটি ভালো উদ্যোগ। তবে বিশেষ করে ভ্যাট ও BIN-এর সংখ্যা বৃদ্ধির ওপর আরো জোরারোপ করা প্রয়োজন। ভ্যাটের সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এটি কিন্তু এখনো আশানুরূপ নয় এবং মোট এন্টারপ্রাইজের তুলনায় ভ্যাট প্রদানকারীর সংখ্যা আরো কম। এ জায়গায় এনবিআরকে আরো প্রাধান্য দিতে হবে। যদিও জনবলসহ বেশকিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে বাজেটে এ বিষয়ের বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ আশা করছি।

ঢাকা চেম্বার মনে করে, রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটি করনীতি ইউনিট গঠন করা প্রয়োজন। এ ইউনিটের কর আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ও কর আহরণের পদ্ধতি, অথবা কোন খাত থেকে কী পরিমাণ করা আহরণ করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে আমাদের শিল্পনীতি ও বাণিজ্যনীতির সঙ্গে মিলিয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে পারে। আমরা মনে করি, এ ধরনের কর ইউনিটি ঢাকা চেম্বারসহ বাণিজ্য সংগঠনের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি জরুরি। এ করনীতি ইউনিটের প্রধান লক্ষ্য হবে, কীভাবে নতুন ধরনের শিল্প ও সেবা খাত তৈরি করা যায়, যেগুলো থেকে ভবিষ্যতে বিপুল পরিমাণে রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, সেমিকন্ডাক্টর একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত, যেটিকে এখনই প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা দেয়া না হলে খাতটি আশানুরূপভাবে সম্প্রসারণ হবে না। কিন্তু আমরা যদি খাতটির বিকাশে প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা দিতে সক্ষম হই, তবে সামনের দিনগুলোয় এটি রাজস্ব আহরণের একটি বৃহৎ উৎস হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। 

আয়কর আইন, ২০১৩ বাস্তবায়ন আমাদের একটি যুগান্তকারী সফলতা। কিন্তু ব্যবসা সহজীকরণের স্বার্থে এ আইনের কিছু বিষয় সংস্কার করা প্রয়োজন। যেমন আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৩ (২)(খ) থেকে ধারা ৯০-কে অব্যাহতি দেয়া। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিল ও অনুমোদিত বার্ধক্য তহবিল থেকে উদ্ভূত আয়কে সরকারি কর্মচারীদের অনুরূপ করমুক্ত ঘোষণা। উপযুক্ত প্রমাণাদি উপস্থাপন সাপেক্ষে সব ব্যবসায়িক খরচের সম্পূর্ণ অংশ বিয়োজনযোগ্য হিসেবে বিবেচনা। ১৬২(১) ধারায় কর দিবসের আগে রিটার্ন দাখিল করা না হলে ৫০ শতাংশ অধিক হারে সুদ গ্রহণের বিধান বাতিল। একইভাবে মূসক আইনের ধারা ৪৬ (২) (ক)কে এ ধারা থেকে প্রত্যাহার করে সব উপরকণ ব্যয়ের জন্য রেয়াত প্রদান। ধারা ৬৮, ৬৯, ৭০ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা ফেরত প্রদানের পরিবর্তে প্রকৃত প্রাপ্য ফেরত প্রদান। আপিল দায়েরকালে তর্কিত আদেশে উল্লিখিত দাবীকৃত করের ২০ থেকে ১০ শতাংশ কমানো প্রয়োজন। 

ব্যবসা সহজীকরণের জন্য আরেকটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে অটোমেশন। এনবিআর যখন অটোমেশন চালু করেছিল শুরুর দিকে সেটি বেশ জটিল ছিল যা দিনে দিনে সহজ হচ্ছে। তবে এটি আরো সহজীকরণ করা প্রয়োজন। খেয়াল রাখতে হবে যাতে অটোমেটেড প্রসেসের মধ্যে ম্যানুয়াল কোনো বিষয় না থাকে। অটোমেশনকে শতভাগ কার্যকর করা জরুরি। মূসকের ক্ষেত্রে রিফান্ড ও আপিল প্রক্রিয়া এখনো অটোমেশনের আওতায় আসেনি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটা বাস্তবায়ন করতে হবে। কাস্টমস ব্যবস্থাপনা সহজীকরণের লক্ষ্যে অতি দ্রুত Bangladesh Single Window পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে।

সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ, সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি, কার্যকর করহার, অটোমেশন, করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি, Prospective rate of Taxation ইত্যাদি বিষয় দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করে। ঢাকা চেম্বার মনে করে, এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে এবং সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন হবে। 

২০২৪ সালের বাজেটে আমরা দেখতে চাই ঘাটতি বাজেটের অর্থায়নে কী উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ব্যাংকগুলো এমনতেই তারল্য ঘাটতিতে রয়েছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারি ঋণ যদি অনেকাংশে বেড়ে যায়, তখন এ ঘাটতি আরো বড় আকার ধারণ করবে, যা বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিতে চাপ ফেলতে পারে বলে আমরা মনে করি। এ কারণেই এ বছরের ঘাটতি বাজেট মেটাতে দুটো জায়গায় গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, পুঁজিবাজার, দ্বিতীয়ত, সরকারি প্রকল্পের ক্ষেত্রে পিপিপি মডেলের আওতায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো। এতে বিশেষ করে অবকাঠামো খাতের বৃহৎ প্রকল্পগুলোয় বাজেট বরাদ্দের বাইরে অর্থায়ন সম্ভব হবে।