নাসিমুল বাতেন ডিবিএইচ ফাইন্যান্স পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দায়িত্বে রয়েছেন। আবাসন শিল্পে তার রয়েছে দুই দশকের বেশি অভিজ্ঞতা। দেশের এনবিএফআই খাতের অবস্থা ও বাজেটে এ খাতের প্রত্যাশা নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে

আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যাশা কী? 

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বাজেটে প্রথমেই প্রত্যাশা থাকবে সরকার সাধারণ মানুষের করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি করবে, যাতে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তি পায়।

আমাদের দেশে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করের হার সমান। ব্যাংকের তুলনায় যেহেতু আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আকার, আয় ও মুনাফার পরিমাণ অনেক কম, সেই জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সাড়ে ৩৭ শতাংশ হারে কর প্রদান করা কঠিন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশেও হাউজিং ফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক প্রত্যেকের জন্য আলাদা করহার নির্ধারণ করা আছে। আমাদের এখানে এটি বিবেচনা করা যেতে পারে।

আমাদের এখানে সম্পত্তি/ফ্ল্যাটের নিবন্ধন হার অন্যান্য পার্শ্ববর্তী দেশের চেয়ে অনেক বেশি, যা একটি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা দরকার। 

সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারের কাছ থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন? 

সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত, গ্রাহক পর্যায়ে ছোট অংকের গৃহ ঋণের সুদের ওপর কর সুবিধা প্রদান, যার মাধ্যমে গ্রাহক সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠবে। দ্বিতীয়ত, সাশ্রয়ী আবাসনের ওপর রিফাইন্যান্স স্কিম একটি উল্লেখযোগ্য সমাধান হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাশ্রয়ী ও সবুজ আবাসনের যে রিফাইন্যান্স স্কিম আছে তার সহজীকরণ দরকার। এ স্কিমের জন্য গ্রিন সার্টিফিকেশন পাওয়াটা সবচেয়ে বড় একটি বাধা, এটি গ্রাহক পর্যায়ে কীভাবে নিশ্চিত করা যায় এবং সহজে এ স্কিমের আওতায় লোন পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য সাশ্রয়ী আবাসন ও সবুজ আবাসনের জন্য পৃথক পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা চালু করলে সাশ্রয়ী আবাসনের গতি বৃদ্ধি পাবে।

সম্প্রতি সুদের হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এতে সুদের হার আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। গ্রাহকদের ওপর সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব কী?

সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার ফলে যে সুদের হার বেড়ে গেছে, ব্যাপারটি তা নয়। আসলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত কিছু পদক্ষেপের জন্য সুদহার বেড়েছে। কারণ এ মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে ডিপোজিট ও ঋণ উভয় ক্ষেত্রেই সুদহার বেড়েছে। ঋণগ্রহীতাদের জন্য উচ্চ সুদহার অবশ্যই অসুবিধাজনক। শুধু তাই নয়, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্যেও এটা সুবিধাজনক নয়, কারণ এ সুদ বৃদ্ধি ডিপোজিট ও ঋণ উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, ফলে স্প্রেড বা মুনাফা বৃদ্ধি পায় না, বরং নতুন ঋণের প্রবাহ কমে যায়, চলমান ঋণের খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সবাইকে এ সাময়িক অসুবিধার মধ্যে যাওয়া ছাড়া ভালো কোনো বিকল্প কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে নেই।

সুদের হারের ঊর্ধ্বগতি থাকা গ্রাহকদের জন্য অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। গ্রাহকের ওপর সুদহার বৃদ্ধি অবশ্যই ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে কিছুটা বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর কথা চিন্তা করলে বাজারভিত্তিক সুদ ব্যবস্থা অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক। বাজার ভিত্তিতে সুদহার শুধু বৃদ্ধিই পায় না, তা সময়ে সময়ে কমেও। আরোপিত যেকোনো হারের চেয়ে বাজারভিত্তিক সুদহার টেকসই। সুদহার বৃদ্ধির কারণে ঋণের প্রবৃদ্ধি কিছুটা মন্থর হতে পারে। 

বর্তমানে আবাসন খাতের ব্যবসা কেমন যাচ্ছে?

ডলারের বিপরীতে টাকার অব্যাহত অবমূল্যায়ন অন্যান্য অনেক সেক্টরের মতো আবাসন খাতকেও সমস্যার মুখে ফেলেছে। যেহেতু এ সেক্টরের বহু নির্মাণসামগ্রী বা নির্মাণসামগ্রী তৈরির উপকরণ আমদানি করতে হয়, তাই আবাসন খাতের ভবন নির্মাণ খরচ অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় ক্রেতাদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়েনি। তাই তাদের হয় নিজস্ব বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে হবে অথবা ঋণের পরিমাণ বাড়াতে হবে, কিন্তু বাস্তবিক অর্থে মধ্যবিত্ত, এমনকি উচ্চ মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের জন্যও তা কঠিন। আবার ঋণের সুদহারও বেড়েছে। ফ্ল্যাটের মূল্য বা বাড়ি বানানোর খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঋণের সুদহার বৃদ্ধি—এসব কারণে কেনাবেচা কমে গেছে এবং আবাসন খাতে মন্থরতা বিরাজ করছে।

ডিবিএইচ ফাইন্যান্সের ব্যবসায়িক ও আর্থিক পারফরম্যান্স সম্পর্কে জানতে চাই।

গৃহ ঋণ খাতে স্পেশালিস্ট ডিবিএইচ ২৬ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে গৃহ ঋণ দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া আবাসন খাতে গ্রাহকের শরিয়াহভিত্তিক ফাইন্যান্সিং সেবার চাহিদার কথা বিবেচনা করে গত বছরের মে মাসে ডিবিএইচ ইসলামিক ফাইন্যান্সিং সেবা চালু করে।

অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেও ডিবিএইচ তার আয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। এছাড়া ডিবিএইচ ১৮ বছর ধরে সর্বোচ্চ ক্রেডিট রেটিং ‘এএএ’ প্রাপ্ত একমাত্র আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ২০২৩-এ ডিবিএইচের ডিপোজিট পোর্টফোলিও ১৫ শতাংশ বেড়েছে, যা গ্রাহকদের আস্থার প্রতিফলন। বেশির ভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ২০২৩-এ মুনাফা অনেক কমলেও ডিবিএইচ ব্যবসা ও মুনাফা উভয় ক্ষেত্রেই আগের বছরের ফলাফল ধরে রাখতে পেরেছে।

এ বছরটি এনবিএফআইয়ের জন্য কেমন যাবে বলে মনে করছেন?

সার্বিকভাবে ২০২৪ বছরটা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। এ বছরের বাকি সময়টা উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ক্রমবর্ধমান সুদহারের কারণে ব্যবসা ও মুনাফার প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা বেশ কঠিন হবে। তাছাড়া অর্থনীতি ঘুরে না দাঁড়ালে সার্বিকভাবে খেলাপি ঋণের অবস্থার উন্নতি হবে না, বরং খেলাপি ঋণ বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে নীতি তৈরি করছে ও সুশাসনের ওপর আরো গুরুত্ব আরোপ করছে। আমরা আশা করছি, গৃহীত পদক্ষেপ ও নীতি সিদ্ধান্তের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ বছরের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং আগামী বছরগুলো ব্যবসাবান্ধব হবে।