ব্রিটিশ ভারতের অধীনে ১৯৪১ সালে সিলেটে প্রথম সিমেন্ট কারখানা এবং ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে দ্বিতীয় সিমেন্ট কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে এ দুই কারখানায় উৎপাদিত সিমেন্ট দেশের পুরো চাহিদা মেটাতে সক্ষম ছিল না। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আমদানির মাধ্যমেই দেশের সিমেন্টের চাহিদা মেটাতে হয়েছে। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে নব্বই ও এর পরের দশকগুলোয়। এ সময়ে একে একে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা সিমেন্ট খাতে বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। বাড়তে শুরু করে উৎপাদন সক্ষমতা। একসময়ের আমদানিনির্ভরতা থেকে রূপান্তর ঘটে সিমেন্টে স্বনির্ভর বাংলাদেশের। পরিমাণে কম হলেও সিমেন্ট রফতানিকারকের খাতায় নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ। দেশের বেশকিছু নদী-তীরবর্তী স্থানকে কেন্দ্র করে সিমেন্ট শিল্প গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে মুন্সিগঞ্জে ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী মুক্তারপুর, নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর, মেঘনা নদী-তীরবর্তী মেঘনাঘাট, ঘোড়াশাল, মোংলা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি সিমেন্ট কারখানা অবস্থিত। এর বাইরে সিলেটসহ দেশের আরো বেশকিছু অঞ্চলে কিছু সিমেন্ট কারখানা রয়েছে। বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) তথ্যানুসারে, দেশে বর্তমানে চালু থাকা সিমেন্ট কারখানার সংখ্যা ৪০। এ কারখানাগুলোর মোট স্থাপিত সক্ষমতা ৯ কোটি ২০ লাখ টন আর কার্যকর সক্ষমতা ৭ কোটি ৮১ লাখ ৭০ হাজার টন। টাকার অংকে দেশে বর্তমানে সিমেন্টের বাজারের আকার ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ২০২৪ সাল শেষে দেশের সিমেন্ট খাতে আরো ৫৩ লাখ ২০ হাজার টন সিমেন্ট উৎপাদন সক্ষমতা যোগ হবে।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব অবকাঠামো নির্মাণেই ব্যবহার হয়ে আসছে প্রিমিয়ার সিমেন্ট। সিমেন্ট শিল্পের অবস্থা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক
সিমেন্টের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা ও ব্যবহার নিয়ে বলুন।
সক্ষমতা থাকলেও এমনিতে কারখানায় শতভাগ কাজ করা সম্ভব হয় না। একটি মেশিনারিজ ইকুইপমেন্ট ২৪ ঘণ্টা ব্যবহার করা যায় না। আবার সক্ষমতা থাকলেও কিন্তু আমার লজিস্টিক সাপোর্ট যেমন গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির শতভাগ প্রাপ্যতাও আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। সিমেন্টের আবার নির্মাণ মৌসুমও আছে। এখন তো মূল্যস্ফীতির কারণে গ্রাহকের চাহিদাও অনেক কমেছে।
ডলারের উচ্চমূল্য নিয়ে উদ্যোক্তারা অস্বস্তির কথা তুলে ধরছেন।
ডলারের বিনিময় মূল্য বেড়ে বেশি ভোগাচ্ছে এখন। ডলারের বিনিময় মূল্য যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায় তাহলে শুধু সিমেন্টই নয়, দেশের সব খাতে অস্বস্তি আরো বাড়বে।
স্থানীয় উৎপাদনে উপযুক্ত নীতি কতটা বিদ্যমান আছে?
যেকোনো কাজের জন্যই আগে সময়োপযোগী পলিসি ঠিক করা জরুরি। আমাদের দেশে তো পলিসি একবার ঠিক করে পরে আর স্থায়িত্ব থাকে না। এটা করে যারা উদ্যোগ নিচ্ছেন তাদের আরো বেকায়দায় ফেলে দেয়া হয়। এর সবকিছুর চাপ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ঠিকই ভোক্তাকে নিতে চচ্ছে। বাংলাদেশে যারা সিমেন্ট খাত নিয়ে পলিসি তৈরি করেন তারা যেন এ খাতকে ট্যোবাকো খাত মনে না করেন। ট্যোবাকো খাত থেকে যেমন ভ্যাট-ট্যাক্স বেশি নেবে, এমন একটা বিষয় আছে। আমাদের জন্য একটি আইন তৈরি করা হয়েছে। এ আইন আমাদের কাছে অসহনীয় মনে হয়। সরকার চায় সিমেন্ট খাতকে পাবলিক লিস্টেড কোম্পানি করার জন্য। কিন্তু রাজস্ব বোর্ড একটি ট্যাক্স পলিসি গঠন করল। সেটাও সংসদে পাস হলো। রাজস্ব বোর্ড এআইটি বছরের শেষে যেটা নেবেন সেটা যখন আমার সঙ্গে ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্ট করা হয় তখন ধরেন আমি ৭০ কোটি টাকা ট্যাক্স দিলাম কিন্তু আমার ট্যাক্স এল ৩০ কোটি টাকা। তখন আমার ওই ৪০ কোটি টাকা কিন্তু ফেরত দেবে না। এটা আগে ফেরত দিত। কিন্তু এখন সেটা ফেরত দিচ্ছে না। মানে যা তারা নিয়ে নিচ্ছে সেটা আর ফেরত দিচ্ছে না। কিন্তু অ্যাসেসমেন্ট করার পর যদি আমার ট্যাক্স ৮০ কোটি টাকা হয় তাহলে আমাকে ১০ কোটি টাকা তাদের দিতে হবে। আমার কম এলে তারা সে টাকা ফেরত দেবে না। এটা আমাদের ওপর অবিচারই বলব। আমার অধিকার আর থাকছে না। এ ট্যাক্সের বিষয়গুলো সমাধান করা উচিত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যই বলছে, রিজার্ভ পরিস্থিতি আরো নেতিবাচক হওয়ার। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কী বলবেন?
দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সবার আগে রাজনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক সুশাসন যদি নিশ্চিত করা যায় তাহলে দেশের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি আরো সমৃদ্ধ হবে। আমরা হরহামেশা বিদেশী বিনিয়োগের কথা বলি। আমি বলব অন্য দেশের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে এসে যখন দেখবে আইনের শাসন আছে, সুশাসন আছে কিংবা মানুষের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হয় তখন তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থারও পরিবর্তন আসবে। ব্যাংক, বন্দর সেবা, কাস্টমসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারে সুশাসন এনে অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
রাজস্ব বাড়ানোর চাপ আছে। বাজেট নিয়ে কোনো সুপারিশ আছে কি?
রেভিনিউর জন্য যেটা দরকার সেটা হলো পরিধি বাড়াতে হবে। পরিধি না বাড়িয়ে শুধু নির্দিষ্ট লোকের কাছ থেকে ট্যাক্স-ভ্যাট নেবেন এটা তো জুতসই সিদ্ধান্ত হলো না। যারা নিয়মিত সুদ, ভ্যাট, ট্যাক্স পরিশোধ করে তাদের ওপর আরো চেপে ধরার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। উৎপাদন খাতকে উন্নত করতে হলে স্টেকহোল্ডারদের যুক্ত করতে হবে। যারা এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদের সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হবে। কারণ সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ না করলে এ ব্যবসার উন্নতি সম্ভব না। সিমেন্ট খাতে ট্যাক্স নিয়ে একটু সরকারকে বিবেচক হতে হবে। সামনে বাজেট সেজন্য আমরা বলব এ খাতের অবস্থা বিবেচনা করে টেকসই বাজেট নির্ধারণ করলে খাতটি আরো বৃহৎ পরিসরে কাজ করতে পারবে। আমরা সিমেন্ট খাতকে ইকো ফ্রেন্ডলি হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এটা শতভাগ করতে হবে। নয়তো ব্যবসায় টিকে থাকা যাবে না।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাশেদ এইচ চৌধুরী





