অর্থনীতিতে এ মুহূর্তে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করণীয় হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের যে অনিয়ম রয়েছে, সেগুলো শনাক্ত করে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থ পাচার নিয়ে আমাদের একটা নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়ে আছে। জনগণের মধ্যে এ ধারণা তৈরি হয়ে আছে যে অর্থ পাচারের জন্য ব্যবসায়ীরাই অনেকাংশে দায়ী। জনসাধারণের মাঝে স্বস্তি আনার বিষয়ে আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পাচারকৃত অর্থ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উদ্ধার করে তাদের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে হবে। তাদের আস্থা ও বিশ্বস্ততা অর্জন করতে হবে।
নতুন গভর্নর এসেছেন। তিনি নিশ্চয়ই বাংলাদেশ ব্যাংকে কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসবেন। বিশেষ করে অনেক বড় বড় কোম্পানি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা ক্ষতি করেছে। টাকাগুলো যদি পুরোপুরি হিসাব ও স্বচ্ছতার মধ্যে নিয়ে আসা যায়, তাহলে এমনিই দেশে অনেক পরিবর্তন চলে আসবে। এক্ষেত্রে আইনের শাসনটা যেন ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠানের জন্যই একই রকম ও সমতাভিত্তিক হয়। ওই স্বচ্ছতাটা আমরা দেখতে চাই।
আমাদের মধ্যে একটা প্রচলিত ধারণা আছে যে যাদের অবাধ টাকা আছে, অনিয়মের জন্য সরকার তাদেরকে আইনের আওতায় আনে না। শুধু ছোট প্রতিষ্ঠান, তুলনামূলক কম প্রভাবশালী বা প্রতিপত্তিহীন ব্যক্তিদের হয়রানি করে। এ ধারণাটার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। জনসাধারণের মধ্যে এ চিন্তা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যে ছোট-বড় যে-ই হোক, অপরাধ করলে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না। আইন সবার জন্যই একই নীতিতে চলবে।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আগে অনেক কোম্পানির অদাবীকৃত বা অবণ্টিত লভ্যাংশ কোম্পানিতেই পড়ে থাকত। তাদের কাছে প্রতিটি পয়সার হিসাব থাকত। তবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড বলে একটা তহবিল গঠন করে গত তিন বছর ধরে এ টাকাটা নিয়ে যাচ্ছে। তারা বলছে, এ টাকা বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ করে শেয়ারধারীদের জন্য তহবিল বৃদ্ধি করা হবে। বস্তুত এ টাকাগুলোর কোনো হিসাব-নিকাশ নেই। এগুলো আত্মসাৎ করা হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশে কিন্তু বিষয়টি ভিন্ন রকম। অদাবীকৃত বা অবণ্টিত টাকা কোম্পানির কাছেই পড়ে থাকে। সাত বছর পর এ টাকাটা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিয়ে দিতে হয়। এখানে পুঁজিবাজারের কোনো সংশ্লিষ্টতাই নেই। পুঁজিবাজার তো হচ্ছে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাজ। এজন্য এ হিসাবটা পুরোপুরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আরো স্বচ্ছভাবে থাকে। কিন্তু আমাদের এখানে এ টাকাটা পুঁজিবাজারের হাতে গিয়ে পুরোপুরিই শেষ করে ফেলা হচ্ছে এবং এটার কোনো রকম কোনো হিসাব-নিকাশ নেই।
শ্রমিকদের জন্য কোম্পানির নিজস্ব তহবিল (ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড) থেকে ১০ শতাংশ নিয়ে ২০০৬ সালেই সরকার শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন করেছে। এখানে কোটি কোটি টাকা জমা পড়ে আছে। কিন্তু এ টাকাটা কীভাবে পরিচালিত হবে, এর কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি এখন পর্যন্ত তৈরি করা হয়নি। সরকার ২০১৫ সাল থেকেই এ টাকাটা নিচ্ছে। অথচ শ্রমিকরা যখন এ তহবিলে আবেদন করেছে, তারা কেউ টাকা পাচ্ছে না। এ টাকাটার কোনো রকম হিসাব-নিকাশ নেই এবং এখানে বিন্দুমাত্র স্বচ্ছতা নেই। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিক কল্যাণ তহবিল পুরোপুরি করমুক্ত। কিন্তু সরকার আগে থেকেই কর আইন প্রয়োগ করছে সেখানে। আবার বাংলাদেশী কোম্পানিগুলোর বিদেশে বিনিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। এ বিষয়গুলো নিরূপণ করে অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
(তপন চৌধুরী স্কয়ার গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার)





