দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কিছু ক্ষেত্রে কর অবকাশ দেয়া হয়েছে আগামী তিন বছরের জন্য। তবে তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবার বিভিন্ন খাতে কর, সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে চলতি অর্থবছরের বাজেটে। এ বাজেটে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের বড় অংশীজন সেলফোন অপারেটরদের ওপরও সিম ট্যাক্স ৫০ শতাংশ, সম্পূরক শুল্ক ৩৩ শতাংশ আরোপ করা হয়েছে।

অপারেটররা বলছেন, বাজেট প্রস্তাবের আগে থেকেই অপারেটররা শুল্ক কমানোর দাবি করলে তাতে কর্ণপাত করেনি সদ্য বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকার। তাছাড়া অপারেটরদের ওপর কর বৃদ্ধি করলেও তা গ্রাহকদেরই পরিশোধ করতে হয়। ফলে দিনশেষে গ্রাহকই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এর আগে গত ৬ জুন তিন অর্থবছরের জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সেবার সাত খাতের জন্য কর মওকুফের প্রস্তাব করে সংসদে বাজেট উত্থাপন করেন সদ্য সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। এতে আগামী ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত এ সুবিধা পাবেন প্রযুক্তি সেবাদাতারা। এর মধ্যে রয়েছে এআই বেজড সলিউশন ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ব্লকচেইন বেজড সলিউশন ডেভেলপমেন্ট, রোবোটিকস প্রসেস আউটসোর্সিং, সফটওয়্যার অ্যাজ আ সার্ভিস, সাইবার সিকিউরিটি সার্ভিস, ডিজিটাল ডেটা অ্যানালাইটিকস ও ডেটা সায়েন্স, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট সার্ভিস ইত্যাদি। এ প্রস্তাবও পাস হয় সংসদে।

অন্যদিকে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার ও মুঠোফোনে কথা বলায় এবার খরচ বেড়েছে। এর মধ্যে সিম ট্যাক্স ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা, সম্পূরক শুল্ক ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়। এ শুল্ক বাড়ানোর ফলে বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ গ্রাহকরা মোবাইলে কথা বলা ও ইন্টারনেট ব্যবহারে আর্থিক চাপে পড়েছে। ফলে মোবাইলের ব্যবহার সংকুচিত হয়ে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ও সরকারের রাজস্ব আহরণ হ্রাস পাবে বলে জানায় মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব।

অপারেটররা বলছেন, চলতি বছরের বাজেটের প্রভাবে বর্তমানে গ্রাহকের কাছ থেকে কর আদায় করা হচ্ছে ৪১ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। ফলে গ্রাহকরা কম পরিমাণ সেবা ভোগ করবেন, যেখানে অপারেটররা মূল্যবৃদ্ধি না করলেও দিনশেষে খরচ বেড়েছে।

মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব জানায়, এ শুল্ক বৃদ্ধির ফলে বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ গ্রাহকরা মোবাইলে কথা বলা ও ইন্টারনেট ব্যবহারে আর্থিক চাপে পড়বে। ফলে মোবাইলের ব্যবহার সংকুচিত হয়ে ব্যবসায় এরই মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এতে সরকারের রাজস্ব আহরণ হ্রাস পাবে। মোবাইল সিমের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বৃদ্ধি নতুন গ্রাহক প্রবৃদ্ধির হারকেও মন্থর করবে, যেখানে দেশে এখনো প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ সংযোগের বাইরে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুরুর দিকে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কারণে টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এসব বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্ন আসতে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের করহার বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। এসব করের ভার গ্রাহকদের বহন করতে হয়। অপারেটরদের ওপর কর চাপিয়ে দেয়ায় অপারেটররা তখন আর স্বল্প দামে প্যাকেজ বিক্রি করতে পারেন না। ফলে ইন্টারনেট গ্রাহক বৃদ্ধি পাচ্ছে না। গ্রাহকদের কথা চিন্তা করেই সরকারকে কর হ্রাস করতে হবে।

জানতে চাইলে মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসার পর থেকে প্রশাসন থেকে শুরু করে সব জায়গায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বাজেটেও পরিবর্তন আনা হবে কিনা, বা নতুন করে বাজেট দেয়ার সক্ষমতা আছে কিনা সেটি এখন বড় প্রশ্ন। সরকারকে অবশ্যই গ্রাহকদের কষ্ট লাঘবে উদ্যোগ নিতে হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে ইন্টারনেটের মূল্য নির্ধারণ করা হচ্ছে না। অপারেটররা নিজেদের ইচ্ছেমতো মূল্য নির্ধারণ করছেন এবং সে অনুযায়ী বিক্রি করছেন। এরও লাগাম টানা প্রয়োজন। অতিরিক্ত কর ব্যবস্থা, অপারেটরদের বেশি মূল্যে ইন্টারনেট প্যাকেজ বিক্রি, নতুন ডিভাইসের ওপর কর আরোপের মতো ঘটনা গ্রাহককে ডিজিটাল ডিভাইসবিমুখ করবে।