২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যক্তি খাতের ভোগ ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের হার ছিল জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়েও বেশি। অন্যান্য অর্থবছরেও বেসরকারি ভোগ ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে মোটামুটি এ ধারাই দেখা গেছে। যদিও ৩০ জুন সমাপ্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। এ অর্থবছরে ব্যক্তি খাতের ভোগ ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির চূড়ান্ত হার এখনো প্রকাশ না হলেও জিডিপি প্রবৃদ্ধির তুলনায় ব্যক্তি খাতের ভোগ ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির হার অনেকটাই নিচে নেমেছে বলে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে উঠে এসেছে।
জিডিপিতে বেসরকারি ভোগ ও বিনিয়োগ কমে আসার বিষয়টিকে অর্থনীতির জন্য ভীতিকর হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও ব্যক্তি খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, জাতীয় ও অর্থনীতির পালাবদলের এ সময়ে কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যক্তি খাতকে চাঙ্গা করতে হবে। কারণ দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের সিংহভাগই ব্যক্তি খাতের ভোগ ও বিনিয়োগ।
বিবিএসের হিসাবে, স্থিরমূল্যে দেশের জিডিপির আকার (২০১৫-১৬ অর্থবছরকে ভিত্তি বছর ধরে) ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ৩০ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ওই অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ হার হয়েছে ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের চূড়ান্ত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ব্যক্তি খাতের ভোগের প্রবৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়ে ব্যক্তি খাতের ভোগ ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির তুলনায় এতটা কমে যাওয়াকে অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন ব্যাংকার ও বেসরকারি খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্যমতে, ভোগ কমার প্রধান কারণ হলো পণ্য বিক্রি কমে যাওয়া। ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাকে চাপে ফেলেছে মূল্যস্ফীতি। এর ধারাবাহিকতায় কমেছে খুচরায় পণ্য বিক্রি তথা ভোগ। আবার বিনিয়োগকারীর হাতেও নতুন বিনিয়োগ করার মতো পর্যাপ্ত তারল্য নেই। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাত এখন নাজুক অবস্থানে রয়েছে। অথচ শিল্প, বাণিজ্য, সেবাসহ সবকিছু বিবেচনায় মূলত ব্যক্তি খাতই দেশের অর্থনীতিতে নেতৃস্থানীয় ভূমিকায় রয়েছে। বেসরকারি খাতের এ নাজুক পরিস্থিতি সার্বিক অর্থনীতির জন্য ভালো কিছুর ইঙ্গিতবাহী নয়।
বিষয়টি স্বীকার করছেন নীতিনির্ধারকরাও। সাবেক দুই নীতিনির্ধারক নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বলেছেন, প্রবৃদ্ধির বড় একটা চালিকাশক্তি হলো ব্যক্তি খাতের ভোগ ও ব্যয়। এগুলো কমেছে বলেই প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশে পৌঁছেনি। কারণ আমাদের মূল্যস্ফীতি মোকাবেলা করতে হয়েছে। মূল্যস্ফীতিতে সবাইকেই ব্যয় সংকোচন করতে হয়েছে। কারণ মানুষ আগে যে দামে পণ্য কিনত, তা বহুলাংশে বেড়েছে। এ প্রবণতা খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে কৃষিজ-অকৃষিজ বা আমদানীকৃত সব পণ্যেই দেখা গেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ে একটা অস্থির সময় আমরা কাটাচ্ছি। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষ ভোগ ব্যয় করতে যেহেতু পারেনি, তাই এমনটাই হওয়ার কথা।
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আব্দুল আওয়াল মিন্টু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যক্তি খাতকে চাঙ্গা করতে প্রথমেই ব্যাংক খাতে সংস্কার ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক থেকে কোনো সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না এমন অনেক অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বহু ব্যাংকে নগদ অর্থের ঘাটতি রয়েছে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ব্যাংককে নগদ সহায়তা করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ব্যবসা-বাণিজ্যে সংশ্লিষ্টরা বিপাকে পড়ে গেছেন। মূলধনি যন্ত্রের আমদানি কমে গেছে। কাঁচামাল আমদানি কমেছে। ব্যাংকগুলোয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা নিশ্চিত করে পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে যে তারা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। কিন্তু বাস্তবে এ সংকোচন ব্যক্তি খাতের জন্য থাকলেও সরকারি খাতের জন্য সম্প্রসারণমূলকই ছিল। এ দ্বিমুখী নীতি বন্ধ করতে হবে। রাতারাতি না হলেও ব্যক্তি খাতকে চাঙ্গা করতে পর্যায়ক্রমে এদিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন ও ন্যায্যমূল্যে জ্বালানি সরবরাহও প্রয়োজন।’
ভোগ ব্যয় কমে যাওয়ায় বেশ কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের শিল্প খাত। স্থানীয় বাজারে সব পণ্যেরই বিক্রি কমেছে বলে উদ্যোক্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, দেশের বাজারে পণ্যভেদে বিক্রি ব্যাপক হারে কমেছে। ক্ষেত্রবিশেষে অনেক পণ্যের বিক্রি কমেছে আরো বেশি মাত্রায়। বিশেষ করে নির্মাণ ও আবাসন খাত মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পতিত হয়েছে। গৃহায়ন খাতের বিক্রির পরিমাণ কমেছে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের নতুন প্রকল্প গ্রহণও কমেছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে এ খাতে প্রচণ্ড তারল্য সংকটসহ মূলধনি ব্যয় জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রায় সব পণ্যের বিক্রি কমেছে। কারণ অভ্যন্তরীণ ভোগ কমেছে। আবার এর কারণ হলো মূল্যস্ফীতি, যার প্রভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। যেহেতু ক্রয়ক্ষমতা কমেছে সেজন্য মানুষ পণ্যও কিনছে কম। যে কারো কাছে প্রথমে খাওয়া-থাকা, তারপর অন্যান্য বিষয়। এগুলো সামলাতে মানুষের হিমশিম খেতে হচ্ছে। খুচরা সব খাতেরই বিক্রি কমে গেছে। দেখা যাচ্ছে ক্ষুদ্র-মাঝারি-কুটির শিল্পের উদ্যোক্তারা এখন নিজেদের সঞ্চয় ভেঙে চলছেন। ক্ষেত্রবিশেষে ব্যবসা থেকেও বেরিয়ে গেছেন। এমনকি আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বিক্রিও কমে গেছে। গোটা বিষয়টিই মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না বাড়লে এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব না। স্থানীয় শিল্পে কনফেকশনারি, পোলট্রি থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্যেরই বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
ব্যক্তি খাত নাজুক অবস্থায় চলে যাওয়ার বিষয়টি টের পাচ্ছেন ব্যাংকাররাও। তাদের ভাষ্যমতে, একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে ভোক্তার ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে উদ্যোক্তাদের হাতে বিনিয়োগের মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। এ কারণেই শিল্প খাতের পণ্য ও যন্ত্রপাতি আমদানি কমে এসেছে। মূল্যস্ফীতির প্রভাবে ভোক্তাদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে ভোগ ব্যয়ে রক্ষণশীল প্রবণতা। এ প্রেক্ষাপটে ব্যক্তি খাতকে চাঙ্গা করতে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হাতে নিতে হবে। ব্যাংক থেকে শুরু করে এসব কর্মযজ্ঞের মধ্যে আছে বিচার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে নীতি, রাজস্বসহ আরো বেশকিছু বিষয়।
জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যক্তি খাতনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি রূপান্তরের এখনই সময়। অন্তর্বতীকালীন সরকারের মাধ্যমে এরই মধ্যে অর্থনীতি রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছে। অর্থনীতির অনেক ক্ষেত্র আছে যেগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। ব্যাংক খাত নিয়ে সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে যেমন এ খাতে নন-পারফর্মিং লোন কমিয়ে আনতে হবে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও আহরণের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের দায়িত্ব এমন একজনকে দিতে হবে যিনি ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বোঝেন।’





