দেশে আধুনিক সিরামিক শিল্প যাত্রা করে পঞ্চাশের দশকের শেষে। বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে সিরামিক পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প-কারখানা আছে ৬৮টি। সে তালিকার মধ্যে আকিজ সিরামিকের নাম বিশেষভাবে অগ্রগণ্য। গতানুগতিক ধারণার বাইরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সিরামিক শিল্পে নতুন ধারা ও প্রবণতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। 

বাংলাদেশের সিরামিক শিল্প খাতে আকিজ সিরামিক প্রবেশ করে ২০১২ সালে। তখন দেশে খুব বড় সিরামিক কোম্পানি ছিল না। কারখানা বিবেচনায় দেশের চতুর্থ বৃহৎ সিরামিক শিল্প-কারখানা আকিজ সিরামিকসের। শুরুর দিকে একদিনে উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২০ হাজার বর্গমিটার, এখন সে সংখ্যা উন্নীত হয়েছে এক লাখ বর্গমিটারে। কারখানাটি অবস্থিত ময়মনসিংহের ত্রিশালের মোক্ষপুরে।

দেশে স্থাপিত সিরামিক শিল্প-কারখানাগুলোয় উৎপাদিত পণ্য মূলত তিন ভাগে বিভক্ত—স্যানিটারিওয়্যার, টেবিলওয়্যার ও টাইলস। তিনটি বিভাগেই ঈর্ষণীয় ভূমিকা রেখে চলছে আকিজ সিরামিকস। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির স্যানিটারিওয়্যার ইউরোপে রফতানি হচ্ছে। স্যানিটারিওয়্যারের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি রোবোটিকস প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যা খুবই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অগ্রাধিকার দেয় আকিজ সিরামিকস। তার অন্যতম প্রমাণ নবায়নযোগ্য এনার্জি অর্থাৎ সোলার এনার্জির ব্যবহার। আকিজ সিরামিকের জন্য সরবরাহ করা বিদ্যুতের উৎপাদন প্রায় ৩১ মেগাওয়াট পার আওয়ার, যেটা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সোলার সিস্টেম। টেবিলওয়্যারেও বিনিয়োগে ঈর্ষণীয় সফলতা দেখিয়েছে আকিজ সিরামিকস। পেয়েছে এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় টেবিলওয়্যার ফ্যাক্টরির তকমা। কেবল দেশে নয়; রফতানির ক্ষেত্রেও এগিয়ে রয়েছে আকিজ সিরামিকস। প্রতিষ্ঠানটি বছরে ১ লাখ ৩৫ হাজার পিস টেবিলওয়্যার রফতানি করে। গত দুই বছরে আকিজ সিরামিকস দেশের সর্ববৃহৎ টেবিলওয়্যার এক্সপোর্টার ছিল। 

আকিজ সিরামিকসের কমপ্লেক্স আকারে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কমপ্লেক্স। এখানে একই সঙ্গে তিন ধরনের সিরামিক পণ্য তৈরি করা হয়। প্রযুক্তিগত দিক বিবেচনায় আকিজ তাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে খুবই সংবেদনশীল। বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয় পরিবেশের নিরাপত্তার জন্য। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করাও হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দফায় দফায় বেশকিছু উদ্যোগও নেয়া হয়েছে পরিবেশের কথা মাথায় রেখে। এটি একটি জিরো গ্রাউন্ড ওয়াটার কোম্পানি। সিরামিক বানাতে গেলে প্রচুর গ্রাউন্ড ওয়াটার ব্যবহার করা লাগে। আকিজ সিরামিকস সেটা কমিয়ে আনতে বদ্ধপরিকর। এর মধ্যেই পানির ব্যবহার ৬০-৬৫ শতাংশ কমিয়ে ফেলেছে প্রতিষ্ঠানটি। বাকি ৪০ শতাংশ পানি সারফেস থেকে নেয়ার চেষ্টা করে চলছে। আকিজ সিরামিকস ৭০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জিরো গ্রাউন্ড ওয়াটার ও একই সময় মোস্ট অ্যাডভান্সড সিরামিক কোম্পানি; যারা টাইলস, স্যানিটারি ও টেবিলওয়্যার তৈরি করে। নানা ধরনের প্রজেক্টের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখনো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে চলছে নিজেদের। 

টাইলস বানানোর ক্ষেত্রে আকিজ সিরামিকসের কাজ বিচিত্র ও বহুমুখী। স্যানিটারিওয়্যারের ক্ষেত্রে ডিজাইনে, নান্দনিকতায় সবার থেকে আলাদা। প্রতিষ্ঠানটি ৫০০-৫৫০ বিঘা জায়গার ওপর। যখন শুরু হয়েছিল তখন বিনিয়োগ ছিল ২০০ কোটি টাকার মতো, যেটা বাড়তে বাড়তে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা হয়েছে। এখানে ব্যাংক ফাইন্যান্সেরও কম্বিনেশন রয়েছে। আকিজ সিরামিকসের এ মহাকাব্যিক উত্থান দেশের সিরামিক শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অর্থনীতির জন্য নতুন প্রাপ্তি।