বাংলাদেশের পেইন্ট শিল্প দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম শিল্প হিসেবে পাঁচ বছর ধরেই প্রবৃদ্ধি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৪০টি কোম্পানি বাংলাদেশ পেইন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনে নিবন্ধিত রয়েছে, যার মধ্যে একাধিক বহুজাতিক কোম্পানিও রয়েছে। গৃহস্থালি ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বসম্পন্ন উন্নত রঙ, উচ্চ তাপমাত্রা, রাসায়নিক বা পরিবেশগত ক্ষয় সহনশীলতা বিশিষ্ট উন্নত মানের কোটিং প্রভৃতি এখন দেশের কারখানায়ই তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন অবকাঠামোগত মেগা প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পেইন্ট ও কোটিংয়ের সিংহভাগই দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। রঙ ও কোটিংস শিল্পের তথ্য নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা Coatings World-এর তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে এ শিল্পের বাজারের আকার ছিল ২০২০ সালে প্রায় ৪৭১ মিলিয়ন ডলার। গত দশকের বেশির ভাগ সময় এ খাতের প্রবৃদ্ধির হার ছিল স্থিতিশীল।
সুলভ মূল্যে মানসম্পন্ন শিল্প ও গৃহস্থালি প্রয়োজনে ব্যবহৃত পেইন্ট দেশেই উৎপাদনের লক্ষ্য থেকে এ যাত্রার অংশ হয়েছিল রেইনবো পেইন্টস। উচ্চ প্রবৃদ্ধির এ উদীয়মান বাজারে নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বব্যাপী শীর্ষ কোটিং কোম্পানিগুলোর একটি হয়ে ওঠার উদ্দেশ্যে ২০১৬ সালে নরসিংদীর পলাশে মাল্টিলাইন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের পেইন্ট ইউনিট স্থাপন করেন প্রতিষ্ঠাতা আহসান খান চৌধুরী। এ কারখানার উৎপাদিত পেইন্ট ও কোটিংই রেইনবো পেইন্টস ব্র্যান্ড নামে বাজারজাত হয়ে থাকে। বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে শিল্পে ব্যবহারযোগ্য কোটিংসংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েও কাজ করছে রেইনবো পেইন্টস। নৈতিক মূল্যবোধ বজায় রেখে ভোক্তাদের সাশ্রয়ী মূল্যে সর্বোচ্চ মানের পণ্য সরবরাহ করে নেতৃস্থানীয় পেইন্ট কোম্পানির একজন হওয়াকে নিজেদের মিশন হিসেবে উল্লেখ করেছে রেইনবো কর্তৃপক্ষ।
যদিও যাত্রার শুরুটা এত সহজ ছিল না। কারখানা স্থাপন ও চালুর সময় অতিক্রম করতে হয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। নরসিংদীর পাঁচদোনা থেকে কাজিরচরের কারখানা পর্যন্ত রাস্তা খুব খারাপ ছিল শুরুর দিকে, যার কারণে মালামাল নিয়ে আসতে খুব সমস্যা হতো। সমস্যা নিরসনে তখন কোম্পানিকে নিজস্ব অর্থায়নে জমি কিনে রাস্তা বানাতে হয়। এছাড়া কারখানা চালুর সময় বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও গ্যাস সরবরাহ ছিল না। গ্রামাঞ্চলে কারখানা স্থাপন করাতে শ্রমিক ছিল না পর্যাপ্ত। কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি কিছু দেশে পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ যন্ত্রপাতি দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। তখন কারখানার আয়তন ছিল দুই হাজার বর্গফুট ও শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৬০।
বর্তমানে কারখানায় ১৪৫ জন শ্রমিক কর্মরত। শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। যেমন ফ্রি আবাসন ব্যবস্থা, ডিউটিরত অবস্থায় নামমাত্র মূল্যে (৮ টাকা প্রতিজন) এক বেলা খাবার, ফ্রি বিকালের নাশতা, যাতায়াত ভাড়া, কর্মীদের জন্য চিকিৎসাসেবা, বছরে দুবার ঈদ বোনাস, সাপ্তাহিক একদিন ছুটি ও বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি ইত্যাদি। অর্থাৎ শুধু গ্রাহকদের জন্য রঙ উৎপাদনের ক্ষেত্রে নয়, শ্রমিকদের প্রতিও রেইনবো নিজেদের দায়বদ্ধতা বজায় রাখছে।
পেইন্ট উৎপাদনের জন্য মানসম্পন্ন ও আধুনিক যত যন্ত্রপাতি দরকার প্রায় সবই আছে কারখানায়। যেমন টিএসডি, অ্যাট্রটির, সেন্টমিল, ব্রিডমিল, বলমিল, মিক্সচার, এক্সট্রুডার, প্রিন্টার, ফিলিং মেশিন ইত্যাদি। এখানকার বেশির ভাগ মেশিনই আমদানি করা হয়েছে চীন ও ভারত থেকে। এছাড়া কিছু যন্ত্রপাতি আমেরিকা থেকেও আনা হয়েছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মেলানোর লক্ষ্যে কারখানার আকার সম্প্রসারণ হচ্ছে দিন দিন। নিজস্ব জমিতে তৈরি এক লাখ বর্গফুট রাস্তা বাদে কারখানা ভবিষ্যতে আরো সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উদ্যোক্তারা কাজ করছেন।
বর্তমানে কারখানায় ডেকোরেটিভ, ফ্লোর কোটিং, সামুদ্রিক আবহাওয়ায় ব্যবহারযোগ্য কোটিং, রেইনবো স্প্রে পেইন্ট, যানবাহনে ব্যবহারযোগ্য কোটিং, পাউডার কোটিং, শিল্পে ব্যবহারযোগ্য কোটিং ও কাঠের আসবাবে ব্যবহারযোগ্য উড কোটিং তৈরি হচ্ছে। গ্রাহকরা বর্তমানে সারা দেশের প্রায় ২৮০টি আউটলেট এবং অনুমোদিত ডিলারের মাধ্যমে রেইনবো পেইন্ট ক্রয় করছেন। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক ব্যাপার হলো দেশের চাহিদা মেটানোর জন্য উৎপাদনের পাশাপাশি বর্তমানে রফতানিও শুরু হয়েছে রঙ ও কোটিং। এরই মধ্যে আফ্রিকার দেশ কিরিবাতিতে রফতানি হচ্ছে রেইনবো পেইন্টসের রঙ, যা ভবিষ্যতে আরো একাধিক দেশে সম্প্রসারণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন ধরনের পেইন্ট ও কোটিং পণ্য বাজারে আনার মাধ্যমে গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদানের জন্য আরএফএলের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন দেশে নিজেদের রঙ ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যেও রেইনবো বদ্ধপরিকর। শিগগিরই রেইনবো পেইন্টস ব্র্যান্ড বাংলাদেশের রঙ ও কোটিং শিল্পে নেতৃস্থানীয় পেইন্ট ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এমনটাই আশা করে আরএফএল।





