এমআই সিমেন্ট ফ্যাক্টরি লিমিটেড ১৯৯৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে। মেঘনা নদীর তীরে মুন্সিগঞ্জে নিজেদের কারখানা স্থাপন করে সেখানে ‘ক্রাউন সিমেন্ট’ ব্র্যান্ড নামে সিমেন্ট উৎপাদন ও বিপণন করে আসছে তারা। ব্যবসায়িক কৌশল ও পণ্যের গুণগত মানের কারণে ক্রাউন সিমেন্ট দেশীয় বাজারে সুপরিচিত একটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশের বাজারেও একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। কোম্পানির ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে সিমেন্ট রফতানির সিংহভাগ মার্কেট শেয়ার ক্রাউন সিমেন্টের দখলে।
১৯৯৪ সালের শেষ নাগাদ কোম্পানি চালু হলেও ২০০০ সালে সিমেন্ট বাজারজাত করার মাধ্যমে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে এমআই সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। একমাত্র কারখানা থেকে তখন দৈনিক ৬০০ টন সিমেন্ট উৎপাদন করত তারা। ২০০২ সালে নিজেদের ব্যবসা বাড়ানোর লক্ষ্যে ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দৈনিক ৮০০ টন উৎপাদন ক্ষমতাবিশিষ্ট এমআই সিমেন্ট কারখানার দ্বিতীয় ইউনিটের অপারেশন চালু করা হয়। পরের বছরই দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশে রফতানি করা শুরু হয় ক্রাউন সিমেন্ট ব্র্যান্ডের। ২০০৮ সালে নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে দৈনিক ১৪০০ টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন তৃতীয় ইউনিটের অপারেশন চালু করে এমআই সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। ২০১১ সালে দৈনিক তিন হাজার উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন চতুর্থ ইউনিট চালু করা হয়। সেই বছরই এমআই সিমেন্ট ফ্যাক্টরি লিমিটেড ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। ২০০৮ তৃতীয় ইউনিট চালুর পর থেকে ক্রমাগত প্রতি বছর মানসম্পন্ন সিমেন্ট রফতানি করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৮-০৯ অর্থবছর এবং ২০০৯-১০ অর্থবছরে পরপর দুবার গোল্ড ক্যাটাগরিতে জাতীয় রফতানি ট্রফি অর্জন করে ক্রাউন সিমেন্ট ব্র্যান্ড।
সিমেন্ট তৈরির বেশির ভাগ কাঁচামাল সমুদ্রপথে বাংলাদেশে আমদানি করা হয় প্রতি বছর। নিজেদের বিশাল উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল পরিবহন করে নিয়ে আসা এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ বলা যায়। চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করার জন্য ২০১২ সালে বড় একটি পদক্ষেপ নেয় এমআই সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। সাগরপথে কাঁচামাল নিয়ে আসার জন্য ক্রাউন ভয়েজার নামে প্রায় ৪৬ হাজার ৬০০ টন পরিবহন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কার্গো জাহাজ কেনে তারা। এ জাহাজ ও কাঁচামাল পরিবহন ব্যবস্থাপনার জন্য ক্রাউন মেরিনার্স লিমিটেড নামে একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান চালু করে এমআই সিমেন্ট কোম্পানি।
গৃহস্থালি কাজের জন্য স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে গ্রাহকদের মাঝে সিমেন্ট বিতরণ করা হলেও একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই দেশে বড় বড় অসংখ্য বাণিজ্যিক স্থাপনা, অবকাঠামোগত প্রকল্প ও আবাসন প্রকল্প চালু হয় যাদের নির্মাণকাজের প্রয়োজনে বিপুল পরিমাণ সিমেন্ট ও কংক্রিট প্রয়োজন হতে থাকে। এসব প্রকল্পে সিমেন্ট নিয়ে আসার চেয়ে একেবারে সিমেন্ট, বালু ও ইটের মিশ্রণ বা কংক্রিট সরবরাহ করা বেশি প্রয়োজন হতো। এ লক্ষ্যেই ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করে ক্রাউন সিমেন্ট কংক্রিট অ্যান্ড বিল্ডিং প্রডাক্টস লিমিটেড। নিজেদের কারখানায় রেডিমিক্সার মেশিনের মাধ্যমে কংক্রিট প্রস্তুত করে বড় বড় লরি বা ক্যারিয়ারের মাধ্যমে কংক্রিট সরবরাহ শুরু করে কোম্পানিটি। শুরুতে রেডিমিক্সারের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৪২ হাজার কিউবিক ফুট কংক্রিট প্রস্তুত করতে শুরু করে এমআই সিমেন্ট। মানসম্পন্ন নির্মাণের শীর্ষে পৌঁছানোর লক্ষ্যে গ্রাহকদের সর্বোত্তম কংক্রিট প্রদানের লক্ষ্যে কংক্রিট গবেষণা ও টেস্টিং ল্যাব চালু করা হয় একই সময়ে। পাশাপাশি নিজেদের সিমেন্ট নিজেরাই প্যাকেজিংয়ের জন্য নিজস্ব ক্রাউন পলিমার ব্যাগিং লিমিটেড কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালে, যেখানে সিমেন্টের ব্যাগ তৈরি করা শুরু করে এমআই সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। নিজেদের প্রফেশনাল পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ ICMAB Best Corporate Award অর্জন করে ক্রাউন সিমেন্ট ২০১৪ সালে। পরবর্তী সময়েও ২০১৬ সালে একবার এবং ২০১৮ থেকে ২০২১ পর্যন্ত পরপর চারবার এ পুরস্কার অর্জন করে ক্রাউন সিমেন্ট।
২০১৫ সালে নিজেদের দ্বিতীয় সমুদ্রগামী পরিবহন জাহাজ এমভি ক্রাউন ভিক্টরি কেনে এমআই সিমেন্ট লিমিটেড। এ জাহাজের কাঁচামাল পরিবহনক্ষমতা ছিল ৪৩ হাজার ৯৮০ টন। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পুনরায় জাতীয় রফতানি ট্রফি (এবার ব্রোঞ্জ ক্যাটাগরিতে) অর্জন করে ক্রাউন সিমেন্ট। ২০১৭ সালে ৫ হাজার ২০০ টন দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন পঞ্চম ইউনিট চালু করার মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে বেশি সিমেন্ট রফতানিকারকের তালিকায় প্রবেশ করে এমআই সিমেন্ট লিমিটেড। এ বছরই কাঁচামাল পরিবহনের জন্য নিজেদের তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় সমুদ্রগামী পরিবহন জাহাজ এমভি ক্রাউন ভিশন ক্রয় করা হয়। এ জাহাজের পরিবহনক্ষমতা ৫০ হাজার ৯১৩ টন। ব্যবসার আকার ও রফতানির পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পাওয়ায় সহজে ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ২০১৭ সাল থেকেই SAP সফটওয়ার ব্যবহার করে আসছে কোম্পানিটি।
২০২১ সালে পাবনার বেড়া উপজেলার আমিনপুর থানার কাজীরহাটে বাংলাদেশের প্রথম সিমেন্ট টার্মিনাল চালু করে ক্রাউন সিমেন্ট। যেই স্থাপনায় সিমেন্ট গুদামজাত করার পাশাপাশি একই সঙ্গে প্যাকেজিং করে বিপণন ও বিতরণের ব্যবস্থা করা হয় তাকেই সিমেন্ট টার্মিনাল বলা হয়। ক্রাউন সিমেন্টের হাত ধরে দেশে প্রথম এত বড় বিপণন ব্যবস্থা শুরু হয়েছে সিমেন্ট খাতের।
ক্রমবর্ধমান বাজার চাহিদা ও রফতানিতে শীর্ষস্থান ধরে রাখার লক্ষ্যে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মুন্সিগঞ্জে নিজেদের ফ্যাক্টরিতে সিমেন্ট উৎপাদনের সবচেয়ে বড় ষষ্ঠ ইউনিটটি চালু করেছে ক্রাউন সিমেন্ট চলতি বছরের শুরুতে। এ ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা দৈনিক ৮ হাজার টন, যা ক্রাউন সিমেন্টের বর্তমান মোট উৎপাদনক্ষমতা পরিণত করেছে দৈনিক প্রায় ২০ হাজার টনে।





