বিদ্যুৎ, তরঙ্গ ও তথ্য পরিবহনে যে কেবল বা পরিবাহক তার ব্যবহার হয় তা মূলত বিভিন্ন ধাতুর সংকর থেকে তৈরি। এ ধাতব তার তৈরিতে আগে ব্যবহার করা হতো সিসা বা লেড। লেড খুব ভালো পরিবাহক হলেও এটি পরিবেশ ও মানুষ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। তাই অধুনা প্রযুক্তিতে দ্রুতই পরিবেশবান্ধব কেবলসের প্রচলন শুরু হয়, যা তৈরি হয় সিসা ছাড়াই। বাংলাদেশেও নিজস্ব কারখানায় কেবলস উৎপাদন শুরুর পর তাই দেশী কোম্পানিগুলো বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখতে শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় লেড ফ্রি এনভায়রনমেন্ট ফ্রেন্ডলি কেবলস হিসেবে সার্টিফিকেট অর্জন করেছে এলকো কেবলস। প্রতিষ্ঠাতাদের মাঝে মো. শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী (চেয়ারম্যান) রিনিউয়েবল এনার্জি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন জার্মানি থেকে। শাহরিয়ার আহমেদ এবং তার চার সহযোগী মো. তারেক মাহমুদ মতিন (ব্যবস্থাপনা পরিচালক), মো. গোলাম মোর্শেদ রাসেল (পরিচালক), মো. কামাল হোসেন মজুমদার ডলার (পরিচালক) ও নেয়না রহমান জোয়ারদার (পরিচালক) মিলে শুরু করেন পরিবেশবান্ধব এলকো কেবলসের।
প্রায় ৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এলকো ওয়্যারস অ্যান্ড কেবলস ইন্ডাস্ট্রিজের কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালে গাজীপুরের শ্রীপুরে। দেশে কেবলস শিল্পের যাত্রা অত পুরনো নয় মোটেও, বরং বলা যায় একবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই বাংলাদেশ এ শিল্পে প্রবেশ করেছে। এ যাত্রার শুরুর সদস্যদের একটি এলকো। কারখানা স্থাপনের পর শুরুতেই বড়সড় কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন উদ্যোক্তারা। তাদের ভাষায় যদি শুনি সে গল্প,
‘২০১৩ সালে আমরা যখন কারখানা স্থাপন করে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করি তখন আমাদের পরিচালনা পর্ষদের গড় বয়স ছিল ৩২ বছর। শুরুতে আমরা নিজেদের জমানো টাকা ও ধারদেনা করে খুবই ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করি। পরিচালকদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েট থেকে পড়াশোনা করা হলেও উৎপাদন কার্য পরিচালনায় পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় শুরুতেই হোঁচট খাই। হোঁচট খেয়ে না দমে গিয়ে আমরা নিজেরাই জ্ঞান অর্জন করে বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে রুপালি ব্যাংকের অর্থায়ন নিয়ে আজকের অবস্থায় আসি।
শুরুতেই কারখানা নির্মাণে প্রয়োজনীয় মূলধন সংগ্রহ অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা ব্যাংক ঋণ, ধার, বেসরকারি বিনিয়োগ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন ইত্যাদির সাহায্যে অর্থ সংগ্রহ করি। এছাড়া ব্যক্তিগত সঞ্চয় ও পারিবারিক সহায়তাও অনেক সময় ব্যবহার করতে হয়েছিল। নতুন ব্যবসায়ী হিসেবে ব্যাংক ঋণ পাওয়া বাংলাদেশে অনেক দুরূহ, তাই ঋণ পেতে সমস্যা হয়েছিল আমাদের।
অর্থায়নের পর কারখানার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ অপরিহার্য। সংযোগ পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি বা বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় নথি ও ফি জমা দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে অনুমোদন লাভের চেষ্টা করা হয়েছিল।
প্রশিক্ষিত শ্রমিক পাওয়া আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। স্থানীয় শ্রমিকদের নিয়োগ দেয়া, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং কারখানার কার্যক্রমে দক্ষ করে তোলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয় তখন। এছাড়া শ্রমিকদের ভালো কাজের পরিবেশ ও সুবিধা নিশ্চিত করা হয়, যাতে তারা স্থায়ীভাবে কাজ করতে আগ্রহী হন।
কারখানার কার্যক্রমে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি সংগ্রহের প্রক্রিয়াও সহজ ছিল না। আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়। অনেক সময় যন্ত্রপাতির মান, ডেলিভারি সময় ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়েছিল। তবে আমরা এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য বিশ্বস্ত সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি করি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আগে থেকেই অর্ডার করে রাখি।
কারখানা নির্মাণে বিভিন্ন আইনি ও প্রশাসনিক অনুমোদন নিতে হয়েছিল। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। আমরা এ প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে দক্ষ আইনজীবী ও কনসালট্যান্ট নিয়োগ করেছিলাম।
নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে পণ্য বাজারজাত করা চ্যালেঞ্জিং ছিল। ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা এবং প্রতিযোগীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা অনেক কঠিন ছিল। তবে সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য ও কার্যকর বিপণন কৌশলের মাধ্যমে এটি সহজ হয়ে যায়।’
সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পর কারখানা যখন শুরু হয়, তখন কারখানার আকার ছিল মাত্র ৩ হাজার ৫০০ বর্গফুট এবং শ্রমিক সংখ্যা ছিল মাত্র ১৮। তবে বর্তমানে ফ্যাক্টরির শেড ও অফিস বিল্ডিং মিলে কারখানার আকার প্রায় ১ লাখ বর্গফুট, যেখানে ২১০ জন কর্মী কাজ করছেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের মোট কর্মচারীর সংখ্যা ৫১৫। এ কর্মচারী ও শ্রমিকদের জন্য এলকোর পক্ষ থেকে কিছু বিশেষ সুবিধাও রাখা হয়েছে, যেন শ্রমিকরা কাজে আগ্রহ পান এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ থাকেন। প্রধান কিছু সুবিধাদি হলো:
শ্রমিকদের কাজের মান ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী যথাযথ বেতন দেয়া হয়। ঈদুল ফিতরে ৬০ শতাংশ ও ঈদুল আজহায় ৮০ শতাংশ বোনাস দেয়া হয়। এছাড়া ভালো কাজের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেয়া হয়।
শ্রমিকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নির্ধারিত থাকে এবং ওভারটাইমের জন্য অতিরিক্ত বেতন দেয়া হয়। তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেয়া হয়। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা সুবিধাও দেয়া হয়। কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, যা তাদের আত্মোন্নয়নে সহায়তা করে।
কারখানার অভ্যন্তরে শ্রমিকদের বিশ্রামে নির্দিষ্ট স্থান ও খাবারের জন্য ক্যান্টিনের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের নির্দিষ্ট বার্ষিক ছুটি ও উৎসবের ছুটি দেয়া হয়, যাতে তারা পরিবার ও ব্যক্তিগত কাজে সময় দিতে পারেন।
এছাড়া কর্মীদের চিকিৎসা ও ঘরবাড়ি নির্মাণে বিনা সুদে কিস্তি আকারে ঋণও দেয়া হয় এলকো কর্তৃপক্ষ থেকে। এলকোর আরেকটি চমকপ্রদ বিষয় হলো এখানে কোনো বিদেশী কর্মী/প্রকৌশলী কাজ করেন না, অর্থাৎ সম্পূর্ণ বাংলাদেশীদের হাতে তৈরি হচ্ছে নিজেদের কেবলস এলকোর কারখানায়। তবে প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বিদেশী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া হয়।
কারখানার বিভিন্ন অংশ বা ইউনিট নির্দিষ্ট কার্যক্রমের জন্য আলাদা আলাদা ভাগে বিভক্ত। প্রতিটি ইউনিট নির্দিষ্ট যন্ত্রপাতির কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে। কারখানার প্রধান ইউনিটগুলো হলো—
উৎপাদন ইউনিট (Production Unit): কেবল ইন্ডাস্ট্রিতে কেবল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণে বেশকিছু মেশিনের প্রয়োজন হয়। এ মেশিনগুলো নির্দিষ্ট ধাপ অনুসারে কেবল তৈরির বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। প্রধান মেশিনগুলো হলো:
ওয়্যার ড্রয়িং মেশিন: এ মেশিন কাঁচামাল, যেমন কপার বা অ্যালুমিনিয়ামকে সরু তারে রূপান্তর করে, যা পরে কেবল তৈরিতে ব্যবহার হয়।
স্ট্র্যান্ডিং মেশিন: একাধিক তারকে একসঙ্গে পেঁচিয়ে কন্ডাক্টর তৈরি করা হয়।
এক্সট্রুডার মেশিন: কেবলের ওপর পিভিসি বা এক্সএলপি ইনসুলেশন প্রলেপ দেয়ার জন্য ব্যবহার হয়।
কোর লেয়িং মেশিন: কেবলের বিভিন্ন কোর বা তারকে পেঁচিয়ে একত্রিত করে।
আর্মোরিং মেশিন: কেবলকে বাহ্যিক প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য স্টিল অথবা অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে আচ্ছাদন করা হয়।
কেবল মেজারিং ও কাটিং মেশিন: কেবল তৈরির পর নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যে কেটে প্যাকেজিং করার জন্য প্রস্তুত করা হয়।
বিভিন্ন দামের এ যন্ত্রপাতিগুলো জার্মানি, চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছে।
মান নিয়ন্ত্রণ ইউনিট (Quality Control Unit): এ ইউনিটে পণ্যের গুণগত মান যাচাইয়ে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়। যেমন মাইক্রোমিটার ও ক্যালিপার, হাই ভোল্টেজ টেস্টার, টেনসাইল টেস্টিং মেশিন, ইনসুলেশন রেজিস্ট্যান্স টেস্টার, কন্টিনিউটি টেস্টার, স্পার্ক টেস্টার, ফ্লেমিবিলিটি টেস্টিং মেশিন, Torsion Testing Machine, Aging Oven, স্মোক ডেনসিটি টেস্টার ইত্যাদি। যন্ত্রপাতিগুলো চীন, জাপান ও ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্ভিসিং ইউনিট (Maintenance and Servicing Unit):
কারখানার যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক রাখতে প্রয়োজনীয় টুল ও মেশিন এই ইউনিটে থাকে, যেমন ওয়ার্কশপ টুলস, যা মেশিনের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে ব্যবহার হয়।
সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ইউনিট (Storage and Warehouse Unit): এই ইউনিটে পণ্য ও কাঁচামাল সংরক্ষণে বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়, যেমন প্যালেটাইজিং মেশিন, যা পণ্য গুছিয়ে রাখায় ব্যবহার হয়, কনভেয়ার বেল্ট ব্যবহার হয় পণ্য বা কাঁচামাল স্থানান্তরে।
প্যাকেজিং ইউনিট (Packaging Unit): এখানে পণ্য প্যাকেজিং করায় ব্যবহার হয় বিভিন্ন মেশিন, যেমন অটোমেটেড প্যাকেজিং মেশিন পণ্য দ্রুত ও নির্ভুলভাবে প্যাকেজিং করে, লেবেলিং মেশিন পণ্যের ওপর লেবেল লাগাতে ব্যবহার হয়।
ডিস্ট্রিবিউশন ইউনিট (Distribution Unit): পণ্যগুলোকে গ্রাহকদের কাছে কয়েল ও ড্রাম আকারে বাজারজাত করার জন্য একটি সরবরাহ চেইনের মাধ্যমে বিতরণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করে।
বাজারের চাহিদা পূরণে নতুন নতুন মেশিন সংযোজনের মাধ্যমে কারখানারউৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করছে এলকো। এ ধরনের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ ভবিষ্যতে আরো উন্নতি ও নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করবে এলকোর বিশ্বাস। তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আরো উন্নত প্রযুক্তি, উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বয়ংক্রিয়করণ এবং নতুন পণ্য তৈরির দিকে মনোযোগ দিয়ে ক্রমাগত নতুন পণ্য নিয়ে আসার জন্য কাজ করছেন এলকো কর্তৃপক্ষ। নতুন পণ্যের মধ্যে ইলেকট্রিক ফ্যান, BBT, সুপার এনামেল ওয়্যার, কপার রড, পিভিসি পাইপ, অপটিক্যাল ফাইবার প্লান্ট স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে রফতানি না করলেও ভবিষ্যতে নিজেদের পণ্য বিদেশে রফতানির লক্ষ্যেও কাজ করছেন তারা।
বর্তমানে ব্যবসার আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার ফলে এলকো বাজারে বৃহৎ শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কারখানা সম্প্রসারণের ফলে উৎপাদন ক্ষমতা অনেক গুণ বেড়েছে, যা বাজারের চাহিদা পূরণে সহায়ক হচ্ছে। প্রবৃদ্ধি রক্ষায় ক্রমাগত বিনিয়োগও করে যাচ্ছে এলকো।
পণ্যের মান, সময়মতো সরবরাহ ও গ্রাহক সন্তুষ্টি রক্ষা করার মাধ্যমে কেবলস বাজারে উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব রেখেছে এলকো। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এলকোর পরিবেশবান্ধব পণ্যের রয়েছে ব্যাপক চাহিদা, পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে উচ্চ মানের পণ্য সরবরাহ গ্রাহকের কাছে অর্জন করেছে আস্থা। নিজেদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা ও বাজারে শক্ত অবস্থান ভবিষ্যতে এলকোর ব্যবসা আরো বিস্তারে সহায়ক হবে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা।





