বাংলাদেশে যেসব সিমেন্ট কারখানা রয়েছে, তার মধ্যে আমান সিমেন্টের দ্বিতীয় ইউনিটে সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। ২০১৭ সালে চালু হওয়া দ্বিতীয় ইউনিটটির সক্ষমতা বার্ষিক ৩৬ লাখ টন। প্রথম ইউনিট কারখানাটিও সচল। এটি এ সহস্রাব্দের শুরুর দিকে স্থাপন করা হয়েছিল। আমান সিমেন্ট মিলসে শ্রমিক-কর্মচারী মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক মানুষ কাজ করে।
উদ্যোক্তাদের কথায় তাদের লক্ষ্য হচ্ছে সর্বোচ্চ গুণগত মানের সিমেন্ট সহনীয় মূল্যে ভোক্তার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়া। সর্বোচ্চ গুণগত মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে তারা সফল হয়েছেন বলে মনে করেন। তাদের কথায়, আমরা এখনো হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগোচ্ছি। আশা করছি এ চ্যালেঞ্জিং সময় অতিক্রম করে ভালো অবস্থানে যেতে পারব। আমরা একটা সময় সিমেন্ট খাতের শীর্ষ ১০ কোম্পানির তালিকার বাইরে ছিলাম। সেখান থেকে বর্তমানে আমরা নবম স্থানে উঠে এসেছি। আশা করছি, শিগগিরই আমান সিমেন্ট শীর্ষ পাঁচ কোম্পানির তালিকায় স্থান করে নেবে।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আমান ইকোনমিক জোনে স্থাপিত কারখানাটিকে একক ইউনিট হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ উৎপাদনক্ষম কারখানা বলে দাবি করছে আমান গ্রুপ। আমান ইকোনমিক জোনে জার্মানির আলট্রা মডার্ন ভিআরএম উৎপাদন প্রযুক্তিতে নির্মিত এ কারখানায় রয়েছে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। বিশ্বের সবচেয়ে বিশ্বস্ত উৎস থেকে এ কারখানার কাঁচামাল সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ কারখানায় আমান সিমেন্ট দেশেই উৎপাদন করছে জার্মানির বিখ্যাত ভিআরএম প্রযুক্তির পোর্টল্যান্ড কম্পোসিট সিমেন্ট। গুণগত মানের জন্য BDS EN 197-1: 2003; CEM -II/B-M (V-S-L), 42.5 N সনদপ্রাপ্ত। কর্তৃপক্ষের দাবি অধিক কার্যক্ষমতার আমানসিম অ্যাডভান্স যেকোনো নির্মাণকে দেয় মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো।
আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন দ্বিতীয় ইউনিটটি প্রতিষ্ঠায় আমান গ্রুপকে বেশ বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়েছে। তবে তারা জানিয়েছেন যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়েছে তার তুলনায় খুব বেশি রিটার্ন আসেনি। তাদের লক্ষ্য ক্রেতাদের কাছে সুলভে মানসম্পন্ন সিমেন্ট সরবরাহের মাধ্যমে বাজারে নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করা।
নিজেদের উন্নত প্রযুক্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সিমেন্ট তৈরির মূল কাঁচামাল ক্লিংকার, জিপসাম, লাইমস্টোন, স্ল্যাগ ও ফ্লাই অ্যাশ। পরিবেশের ওপর কার্বন নিঃসরণের ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে ক্লিংকারের অনুপাত ঠিক রেখে আমান সিমেন্ট লাইমস্টোন ও ফ্লাই অ্যাশের ব্যবহার কমিয়ে তার পরিবর্তে স্ল্যাগের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে তারা পরিবেশ সংরক্ষণেও অবদান রাখছে।
আমান সিমেন্ট পাঁচ ধরনের পণ্য তৈরি করে। টাইপ ওয়ান ক্যাটাগরির ৫২ দশমিক ৫ এন স্ট্রেন্থ ক্লাসের ওপিসি (অর্ডিনারি পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট), টাইপ টু ক্যাটাগরির পিসিসি (পোর্টল্যান্ড কম্পোজিট সিমেন্ট) বিএম ৪২ দশমিক ৫ স্ট্রেন্থ ক্লাসের সিমেন্ট, পিসিসি এএম ৪২ দশমিক ৫ স্ট্রেন্থ ক্লাসের সিমেন্ট, পিসিসি বিএস সিমেন্ট ও সি থ্রি এ ক্যাটাগরির গ্রিন সিমেন্ট। এর মধ্যে গ্রিন সিমেন্ট ৩২ দশমিক ৫ স্ট্রেন্থ ক্লাসের। লবণাক্ত ও সালফারের উপস্থিতি রয়েছে এমন এলাকা যেমন সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে অবকাঠামো নির্মাণে এ সিমেন্ট সবচেয়ে উপযোগী এবং এর স্থায়িত্বও অনেক বেশি।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবকাঠামো নির্মাণে আমানের তৈরি বিশেষ ধরনের সিমেন্ট ব্যবহার হয়েছে। সেখানকার মাটি শক্ত করার জন্য বিশেষ ধরনের সিমেন্টের প্রয়োজন ছিল। বাংলাদেশের কোনো কোম্পানির কাছ থেকে রাশিয়ার প্রকৌশলীরা বিশেষ ধরনের এ সিমেন্ট খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সে সময় আমান সিমেন্ট সবেমাত্র কার্যক্রম শুরু করেছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা হঠাৎ করেই আমান সিমেন্টের কারখানায় এসে উপস্থিত হন। তারা মূলত কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিদর্শনে এসেছিলেন। এরপর একদিন মস্কো থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবকাঠামো নির্মাণে পরীক্ষামূলকভাবে আমান সিমেন্ট ব্যবহারের বিষয়টি জানানো হয়। পরীক্ষামূলক ব্যবহার শেষে এটি ব্যবহারের বিষয়টি চূড়ান্ত করেন কর্মকর্তারা। এ প্রকল্পের মাটি শক্ত করার কাজে তিন লাখ টনের বেশি সিমেন্ট সরবরাহ করেছিল আমান সিমেন্ট। একইভাবে রূপপুর প্রকল্পে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর নির্মাণে স্থানীয় কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে উপযুক্ত ক্যাটাগরির সিমেন্ট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন রুশ কর্মকর্তারা আমান সিমেন্টের কাছ থেকে সিমেন্ট নিয়ে সেটি পরীক্ষার পর সন্তুষ্ট হলেন। এজন্য বেশ কয়েকবার তারা আমান সিমেন্টের কারখানা পরিদর্শন করে পণ্যের গুণগতমানের বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছেন। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় রিঅ্যাক্টর নির্মাণে আমান সিমেন্ট ২ লাখ ৭৫ হাজার টন সিমেন্ট সরবরাহ করেছে। দেশের একমাত্র কোম্পানি হিসেবে আমান সিমেন্ট রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার হয়েছে। এছাড়া মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের ক্ষেত্রেও স্থানীয় অন্যান্য কোম্পানির পাশাপাশি আমান সিমেন্ট ব্যবহার হয়েছে।





