২০০১ সালে প্রতিষ্ঠার পর ‘আমরা প্রমাণে বিশ্বাসী’ স্লোগান নিয়ে ২০০৪ সালে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আসে প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি। ছোট পরিসরে শুরু করলেও সিমেন্ট উৎপাদনে প্রতিষ্ঠানটি আজ দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতার কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর কারখানায় গড়ে তুলেছে দৈনিক ১৯ হাজার ৪০ মেট্রিক টন সক্ষমতা।

এগিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহারে

পণ্যের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে প্রিমিয়ার ভার্টিক্যাল রোলার মিল বা ভিআরএম প্রযুক্তির নতুন ইউনিট স্থাপনে বড় বিনিয়োগ করেছে। ডেনমার্কের এফএল স্মিথের প্রযুক্তির সর্বাধুনিক সংস্করণ এটি। এর সুবিধা হলো বিদ্যুৎসাশ্রয়ী, কম কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশবান্ধব। এ প্রযুক্তিতে সিমেন্টের কাঁচামালসহ সব উপকরণ এমনভাবে প্রক্রিয়াজাত হয় অপ্রয়োজনীয় পদার্থ নির্মূল করে সিমেন্টের স্ট্রেংথ বাড়িয়ে তোলে। প্রিমিয়ার সিমেন্টের নতুন এ ভিআরএম স্থাপনে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিয়েছে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত ডেনমার্কের এফএলস্মিথ। সক্ষমতা বাড়ানোর এ পদক্ষেপে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারে ঢাকায় অবস্থিত কারখানায় প্রতি ঘণ্টায় ৪৬০ টন সিমেন্ট উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণে বিনিয়োগ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। অত্যাধুনিক এ প্রযুক্তি ব্যক্তিগত ও দেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পের জন্য নিশ্চিত করেছে সুনির্দিষ্ট কম্পোজিশনের সিমেন্ট সরবরাহ।

গুণগত মান ধরে রাখার কৌশল

প্রথমটি হলো ক্লিংকারসহ সিমেন্টের পাঁচটি কাঁচামালের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করা। প্রিমিয়ার সিমেন্টের কারখানার কাঁচামাল বিশ্বের যেসব দেশ থেকে সংগ্রহ করা হয়, সেখানে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হতে মান নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তারা পরীক্ষা করে দেখেন। মান নিশ্চিত হলে তার পরই জাহাজে ওঠানো হয়। উৎপাদন বিশ্ব মানের হওয়ায় দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রফতানিতেও এগিয়ে প্রিমিয়ার সিমেন্ট। ত্রিপুরার সঙ্গে নৌবাণিজ্যেও প্রথম চালানটি ছিল তাদের।

প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি’র সিএফও মো. সেলিম রেজা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌কী পরিমাণ বিক্রি করব তার চেয়ে বরং আমরা সিমেন্টের গুণগত মানকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিই। মানের ক্ষেত্রে কখনই আপস করি না। উৎপাদনের প্রতিটি স্তরে নির্দেশনা এমনভাবেই দেয়া আছে যেন গুণগত মানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এ কারণেই সিমেন্ট খাতে গুণগত মানে প্রিমিয়ার সিমেন্ট শীর্ষে। এজন্য আমরা ‘ন্যাশনাল প্রডাক্টিভিটি অ্যান্ড কোয়ালিটি এক্সিলেন্স’সহ বহু পুরস্কার পেয়ে আসছি।


প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিরুল হকের সাক্ষাৎকার


সিমেন্ট খাত নিয়ে বলুন

যেকোনো কাজের জন্য পলিসি থাকতে হবে। কিন্তু পলিসিগুলোর স্থায়িত্ব থাকছে না। একজনের নীতিগত সিদ্ধান্ত অন্যজন মেনে নিচ্ছেন না। তাছাড়া পলিসি প্রণয়ন করলে সেগুলো আবার সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। যার কারণে এর চাপ গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর।

সিমেন্টের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা বসে থাকার পরও নতুনভাবে বিনিয়োগে গেছেন উদ্যোক্তারা...

সক্ষমতা থাকলেও শতভাগ কাজ করা সম্ভব হয় না। একটি মেশিনারিজ ইকুইপমেন্ট কি ২৪ ঘণ্টা ব্যবহার করা যায়? এছাড়া আমার সক্ষমতা আছে ফ্যাক্টরির। কিন্তু আমার লজিস্টিক সাপোর্ট যেমন গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির শতভাগ প্রাপ্যতাও আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। সিমেন্টের আবার নির্মাণ মৌসুমও আছে। এক সিজনে ৭০ শতাংশ বিক্রি হবে, আবার আরেক সিজনে ৪০ শতাংশ বিক্রি হবে। এভাবেই ব্যবসা চলে। অবশ্য এ নির্মাণ উপকরণ ভোগের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে।

টেকসই সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে আরসিসি ব্যবহারের পরামর্শ অনেকের...

বিশ্বের কোনো উন্নত শহরে বিটুমিন দিয়ে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ করা হয় না। এ বিটুমিন স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। বিটুমিন দিয়ে তৈরি করা রাস্তাগুলোয় খেয়াল করলে দেখা যাবে এক বছরের মধ্যে সে বিটুমিন উঠে গেছে। এটা তামাকজাতীয় জিনিস বা সিগারেট থেকে অনেক খারাপ। এ বিটুমিন মানবদেহে প্রবেশ করছে। আমার খুবই খারাপ লাগে যখন দেখি ফ্লাইওভার বা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পর সেখানে বিটুমিন দিয়ে সড়ক নির্মাণ করে। এটা আমার কাছে আশ্চর্যজনক লাগে। আমাদের দেশে যেটা করা দরকার সেটা হলো সড়কগুলোয় আরসিসি ব্যবহার করতে হবে। আরসিসি ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণ করা হলে অন্তত ২০-২৫ বছর কোনো চিন্তাই করতে হবে না এ সড়কগুলো নিয়ে। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের রাস্তা একসময় আরসিসি দিয়ে করা হয়েছিল। আমি অনেকের কাছে শুনেছি সেগুলো নাকি সে সময়ের ৪০ বছরের আগে করা। নতুন রাস্তা নির্মাণ করার আগে সড়কটি অনেক দিন টেকসই ছিল। আরসিসি না দিয়ে বিটুমিন দিয়ে সড়ক নির্মাণের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে সড়কগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেজন্য বিটুমিনের ব্যবহার সড়ক নির্মাণে কমিয়ে আনতে হবে। এতে বারবার রিপেয়ার করার ঝামেলা কমে যাবে। ঠিকাদারকেও অতিরিক্ত টাকা দেয়া বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারি খরচ কমে আসবে। কারো ব্যক্তি স্বার্থে এ ধরনের কাজ চলে আসছে। আরসিসিতে ২০-৩০ শতাংশ খরচ বেশি হলেও এর স্থায়িত্ব তো অনেক বেশি। কিন্তু ২০-৩০ শতাংশের জন্য কাজ না করে পরে দ্বিগুণ বা তিন গুণ খরচ করা হচ্ছে। এসব কেউ দেখছে না।

এ গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটির জন্য পলিসি কতটা উপযুক্ত

বাংলাদেশে যারা সিমেন্ট খাত কিন্তু টোব্যাকো খাতের মতো নয়। টোব্যাকো খাত থেকে যেমন ভ্যাট-ট্যাক্স বেশি নেবে, এমন একটা বিষয় আছে। বিদ্যমান আইনগুলো আমাদের কাছে অসহনীয় মনে হয়। এ ট্যাক্সের বিষয়গুলো সমাধান করা উচিত। সবার জন্য সহনশীল করতে হবে। অনেক বড় কোম্পানির স্টক মার্কেটে আগ্রহ আছে কিন্তু তারা যাচ্ছে না। কিছু কোম্পানি হয়তো গেছে। কিন্তু বড় অনেক কোম্পানিকে এখনো নিতে পারেনি। পাবলিক লিস্টেড কোম্পানি হওয়ার পর ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্টের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে হয়তো বড় কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। রেভিনিউর জন্য যেটা দরকার সেটা হলো পরিধি বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশে সিমেন্ট শিল্পের সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?

আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে যে কার্যক্ষমতা আছে এবং সেখানে নতুন বিনিয়োগের কতটা প্রয়োজন সেটার অ্যাসেসমেন্ট দরকার। আমরা অনেক সময় অনেকের কথা বলি, যারা ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেছে। কেন গেছে? প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ছিল বলেই তারা বাজার থেকে চলে গেছে। আসলে কোন সেক্টরে বিনিয়োগ প্রয়োজন সেটা নির্ধারণ না করার কারণে অনেক ব্যবসায়ী দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা চালাতে পারেন না। ইনভেস্টমেন্ট করতে হলে গবেষণা করা দরকার। আমরা সিমেন্ট খাতকে ইকো ফ্রেন্ডলি হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এটা শতভাগ করতে হবে। নয়তো ব্যবসায় টিকে থাকা যাবে না।