প্রাচীনকাল থেকেই গৃহসজ্জার অন্যতম অংশ হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে সিরামিক পণ্য। মধ্যযুগে বিত্তশালী পরিবারগুলোর অন্দরমহলে দেখা যেত সিরামিক শিল্পের নানা রকম বাহার। কালের বিবর্তনে চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট গণ্ডি ছাড়িয়ে সিরামিক পণ্য এখন পৌঁছেছে প্রান্তিক মানুষের হাতেও। বাংলাদেশ সিরামিক উৎপাদক ও রফতানিকারক সমিতির (বিসিএমইএ) তথ্যমতে, দেশে এখন ৭০টি সিরামিক কারখানা (টেবিলওয়্যার, টাইলস ও স্যানিটারিওয়্যার) আছে। এসব কোম্পানিতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আছে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। দেশে বর্তমানে সিরামিক পণ্যের বাজার ৭ হাজার ২৪৮ কোটি টাকার। বিসিএমইএর তথ্যানুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের সিরামিক টাইলস পণ্যের শতকরা ৮৬ ভাগ চাহিদা দেশীয় কোম্পানিগুলো পূরণ করেছে। ২০১৫-১৬ সালে টাইলসের বাজার ছিল ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যার ৭৫ শতাংশ ছিল দেশীয় কোম্পানির দখলে, যা বেড়ে ২০২১ সালে ৮৩ শতাংশ অতিক্রম করে। বিশাল এ চাহিদার জোগান দিতে বড় ভূমিকা রেখেছে এ খাতের সর্বশেষ সংযোজন মেঘনা গ্রুপের ব্র্যান্ড ফ্রেশ সিরামিকস। ২০২১ সালে মেঘনা সিরামিক ‘‌নান্দনিক জীবনের ফ্রেশ সূচনা’ স্লোগানে ‘ফ্রেশ সিরামিকস’ ব্র্যান্ড নামে নিজেদের উৎপাদিত টাইলস বাজারজাত করা শুরু করে।

মেঘনা গ্রুপের বেশির ভাগ কারখানাই নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে। কয়েক দশক আগে মেঘনা নদীর তীরে যেসব উদ্যোক্তা শিল্পায়ন শুরু করেন, তাদের একজন ছিলেন মেঘনা গ্রুপের মোস্তফা কামাল। তিনি মেঘনা নদীর সঙ্গে মিলিয়ে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাম রেখেছিলেন মেঘনা। সোনারগাঁওয়ের মেঘনা ঘাটের আষাঢ়িয়ার চরে স্থাপিত আধুনিক কারখানায় টাইলস উৎপাদন করছে মেঘনা গ্রুপ। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে কারখানাটির কাজ শুরু হয়েছিল। প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে এ আধুনিক কারখানা। বিশাল এ কারখানায় বর্তমানে বিশ্বমানের দেয়াল ও মেঝের টাইলস উৎপাদন হচ্ছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যমতে, কারখানাটির দৈনিক টাইলস উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে ৫১ হাজার বর্গমিটারের বেশি। এক শেডের নিচে বর্তমানে দেশে সর্বোচ্চ সিরামিক উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে মেঘনা গ্রুপের এ কারখানায়। কারখানায় সিরামিকস উৎপাদনে ব্যবহার হচ্ছে ২৬১ মিটার দীর্ঘ ওভেন বেড (Kiln) বিশিষ্ট দেশের সবচেয়ে বড় চুল্লি। চুল্লিসহ কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি ও চীন থেকে আমদানি করা হয়েছে। ফ্যাক্টরির শেডের ছাদে রয়েছে সুবিশাল সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট যা মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ এর নিজস্ব পাওয়ার প্ল্যান্ট এ বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা রাখছে । 

দেশের টাইলসের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি প্রায় ১৩০০ কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে এ কারখানার মাধ্যমে। কারখানা চত্বরে কর্মীদের বাসস্থানের পাশাপাশি চিকিৎসারও ব্যবস্থা রয়েছে। বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এ স্থাপনাকে তাই ছোটখাটো Industrial Village বলা যেতেই পারে।

টাইলস তৈরির বেশির ভাগ কাঁচামাল এখনো আমদানি করা হয়। ফ্রেশ সিরামিকের টাইলস তৈরির কাঁচামালগুলো আমদানি করা হয় মূলত ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, চীন, স্পেন ও ভারত থেকে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মানের কাঁচামাল নিশ্চিত করতেই বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি করে মেঘনা। বর্তমানে ফ্রেশ সিরামিকস এর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মান এবং সাইজের উৎপাদিত টাইলস ব্যবহার হচ্ছে ফ্ল্যাট-বাড়ি, রান্নাঘর, গোসলখানা, টয়লেট, বারান্দা ইত্যাদির মেঝে ও দেয়াল এবং অফিস, শপিং মল ইত্যাদি জায়গায় বাণিজ্যিক প্রয়োজনে। বাংলাদেশে ফ্রেশ সিরামিকস ই একমাত্র ব্র্যান্ড যেটি তিনটি আন্তর্জাতিক সাইজ ৬০X৬০ সেমি, ৮০X৮০ সেমি এবং ৬০X১২০ সেমি এর Double Charge টাইলস উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছে ।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের তথ্যমতে, দেশের ক্রমবর্ধমান সিরামিকস পণ্যের চাহিদা মেটাতে এবং আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে বাজারে আসার এক বছরের মধ্যেই ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করে নিয়েছে ফ্রেশ সিরামিকস। নিজেদের বাজার সম্প্রসারণ করে বিতরণ ও বিপণনের কাজ সহজে দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে দেয়ার জন্য ফ্রেশ সিরামিকস এর রয়েছে ১৫০ এর মত ডিলার, ৩০ টির মত এক্সক্লুসিভ ডিলার শোরুম এবং ৩০০০ এর উপর রিটেইলার নেটওয়ার্ক । এছাড়াও বর্তমানে ঢাকায় কোম্পানির নিজস্ব শোরুম স্থাপন করার কাজ চলছে । শুধু শহর অঞ্চল বা বিভাগীয় শহরভিত্তিক টাইলস মার্কেটকে প্রাধান্য না দিয়ে, সমগ্র বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে টাইলস পৌঁছে দেয়ার জন্য কাজ করছে ফ্রেশ সিরামিকস। এমন উদ্দমী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, দক্ষ কর্মীদের নিরলস পরিশ্রম এবং ব্যবসায়িক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে ফ্রেশ সিরামিকস ব্যবসায় পরিচালনার ২য় বছরেই দেশের সর্বোচ্চ পরিমাণের টাইলস বিক্রি করে সুনাম অর্জন করে “বিক্রয়ে দেশসেরা টাইলস ব্র্যান্ড” হবার। ব্যবসা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবেই কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে দ্বিতীয় প্ল্যান্ট স্থাপন করে দৈনিক ৫১ হাজার বর্গমিটারে পৌঁছানোর জন্য ২০২২ সালে প্রায় ৪৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিল মেঘনা গ্রুপ। ফলে ২০২৩-এর জুলাই থেকে উল্লিখিত উৎপাদন ক্ষমতায় দেশের বাজারে টাইলস সরবরাহ করে চলেছে মেঘনা। বিশাল এ বিনিয়োগের মাঝে ১৯ মিলিয়ন ডলার ছিল মেঘনার নিজস্ব। আট বছরের মাঝে কিস্তিতে শোধ করে দেয়ার শর্তে ঋণ হিসেবে বাকি অর্থের মাঝে ৪ মিলিয়ন ডলার প্রদান করেছে প্রাইম ব্যাংক ও ২২ মিলিয়ন ডলার প্রদান করেছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক । দেশের চাহিদা পূরণ করে বিশ্বমানের টাইলস উৎপাদন অব্যাহত রেখে আগামীতে ফ্রেশ সিরামিকস এর লক্ষ্য হলো টাইলস রপ্তানি করে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার।