বাংলাদেশের পেইন্ট ইন্ডাস্ট্রিতে সুপরিচিত নাম বার্জার পেইন্টসের স্বত্তাধিকারী প্রতিষ্ঠান জেনসন অ্যান্ড নিকোলসন। ১৯৯৫ সালে যাত্রা শুরু করে বর্তমানে মেটাল কনটেইনার ব্যবসায় শীর্ষ ও সফল প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিণত। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ব্যবসা সম্প্রসারণ হয়েছে পেইন্ট, লুব্রিকেন্ট অয়েল, ইঞ্জিন অয়েল, হেয়ার অয়েল, ফুড গ্রেড কনটেইনারে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি ফ্যান্সি কনটেইনার তৈরিতে বিনিয়োগ করেছে; যা দেশে প্রথম। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম কারখানা স্থাপিত হয়েছিল চট্টগ্রামে। তবে সম্প্রতি ঢাকার সাভারে স্থাপন করা হয়েছে দ্বিতীয় কারখানা।
ঢাকায় কারখানা স্থাপনের জন্য প্রাথমিকভাবে কিছু প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে। জমির দলিল যাচাই করার প্রক্রিয়া ছিল জটিল ও সময়সাপেক্ষ। তাই সময়মতো সব কাজ শেষ করাটা ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর থেকে অনুমোদন পেতে অনেক সময় লাগছিল। রাজউক, সিটি কvরপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সংস্থার থেকে অনুমোদন পেতে দেরি হচ্ছিল। ইউটিলিটি যেমন বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ পাওয়া এবং তাদের অনুমোদন করাও ছিল বেশ কঠিন। পাশাপাশি দক্ষ কর্মীর অভাব ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ সীমিত এবং দক্ষ কর্মীর সংখ্যা কম ছিল। এছাড়া যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়েছে, ফলে এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার প্রক্রিয়ায়ও সীমাবদ্ধতা ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবে অভিজ্ঞ একটি দল, কঠোর পরিশ্রমী ও নিরলস কর্মী, উচ্চ পর্যায়ের সঠিক কৌশলগত পরিকল্পনা এবং সব কর্মীর একতাবদ্ধ প্রচেষ্টা ও সংকল্পের কারণে এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা সম্ভব হয়েছে। বাজারে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়ার মাধ্যমে জেনসন অ্যান্ড নিকোলসন প্রমাণ করে চলছে তার সাফল্য।
যে বছর ঢাকায় কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ছিল ১০ হাজার বর্গফুটের একটি প্রি-ইঞ্জিনিয়ারড বিল্ডিং এবং ১ লাখ ৮ হাজার বর্গফুটের একটি বহুতল আরসিসি ভবন। কর্মীসংখ্যা ছিল ২০০; বর্তমানে কারখানায় কর্মী সংখ্যা ৩০০। কর্মীদের জন্য সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করায় বদ্ধপরিকর জেনসন অ্যান্ড নিকোলসন। প্রতিষ্ঠানটির প্রদেয় সুবিধার মধ্যে রয়েছে আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো, স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা সুবিধা, সুরক্ষা সরঞ্জাম, হালকা নাশতা এবং চায়ের বিরতি, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা, ইউনিফর্ম, নিরাপত্তা জুতা, সরকারি ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং অসুস্থতার ছুটি।
কারখানায় বিভিন্ন ইউনিট রয়েছে, যেমন প্রিন্টিং ইউনিট, কম্পোনেন্ট উৎপাদনে প্রেস ইউনিট, কনটেইনার অ্যাসেম্বলিং এবং মান নিয়ন্ত্রণ ইউনিট। সব যন্ত্রই উচ্চ প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নত করা হয়েছে, যা কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। জেনসন অ্যান্ড নিকোলসন প্রযুক্তিকে অভিযোজিত করে নেয়ার ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়। উদাহরণস্বরূপ ম্যাটেরিয়াল হ্যান্ডলিং, প্রিন্টিং প্রেস এবং অ্যাসেম্বলিং প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা (অটোমেশন) ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বিশ্বমানের যন্ত্রপাতির মোট ব্যয় প্রায় ৫০ কোটি টাকা। এগুলো আমদানি করা হয়েছে চীন, তাইওয়ান ও ভারত থেকে।
জেনসন অ্যান্ড নিকোলসনের কারখানায় বর্তমানে কোনো বিদেশী কর্মী বা বিশেষজ্ঞ নেই। সেক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের দাবি, কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথমেই বাংলাদেশের মেধাবী ও দক্ষ মানুষদের কাজে লাগাতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য নিজস্ব জনশক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। অভ্যন্তরীণভাবে দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে সার্বিকভাবে জাতীয় অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখা। ঢাকার সাভারে কারখানাটি খুব সম্প্রতি উদ্বোধন করা হয়েছে। বর্তমানে প্রধান অগ্রাধিকার কারখানাটি থেকে সর্বোত্তম উৎপাদন নিশ্চিত করা। সেটা নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে কিছু সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও বিবেচনা করা হবে।
জেনসন ও নিকোলসনের বর্তমানে ব্যবসার আকার ১৮৫ কোটি টাকা। মেটাল কনটেইনারের বাজারে অংশীদারত্ব ৪৭ শতাংশের; অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকটাই দখল করে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। ভোক্তাদের জন্য প্রডাক্টের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিতের মাধ্যমে এই অংশীদারত্বের হার বৃদ্ধি করতে বদ্ধপরিকর। আপাতত দেশের চাহিদা নিয়েই কাজ করছে। যদিও মাতৃপ্রতিষ্ঠান বার্জার রফতানি বাজারে সুপরিচিত; জেনসন অ্যান্ড নিকোলসন থেকে কোনো পণ্য রফতানি করা হচ্ছে না। তবে রফতানির জন্য টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। সেই অনুযায়ী সব কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন। সবকিছু ঠিকঠাক এগিয়ে নিতে পারলে শিগগিরই রফতানি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হয়ে ওঠা সম্ভব হবে।





