আধুনিক পৃথিবীতে মানবসভ্যতা টিকে আছে যে কয়েকটি শক্তির হাত ধরে তার মাঝে প্রধান বিদ্যুৎ। এ শক্তি ব্যবহারযোগ্য উপায়ে সব জায়গায় পৌঁছে দেয়ার প্রয়োজনে বর্তমানে নির্মাণসামগ্রীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে কেবলস। শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য, মানুষের জীবনমান বৃদ্ধি, বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ নানা কারণে কেবলসের চাহিদা বেড়েছে বাংলাদেশে। বর্তমানে দেশে বৈদ্যুতিক কেবলসের মোট বাজার প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। ১০ বছর আগে এ বাজারের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ২ হাজার কোটি টাকা। বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১০ ভাগ।
বাজারে নানা ধরনের কেবলস পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রিক কেবল, সুপার এনামেল ওয়্যার, ফাইবার অপটিক কেবল, কমিউনিকেশন কেবল ইত্যাদি। এর মাঝে পাওয়ার কেবলের (ইলেকট্রিক কেবলের আওতাধীন) চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বাজার চাহিদার প্রায় ৯০ ভাগই পাওয়ার কেবল। পাশাপাশি ইন্টারনেট সংযোগ নেয়ার ক্ষেত্রে ফাইবার অপটিকের ব্যবহারও বাড়ছে বর্তমানে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ খাতে দেশে আনুমানিক ১০ হাজার কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ হয়েছে এবং কর্মসংস্থানের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার। বর্তমানে ছোট-বড় প্রায় ১২০টি কোম্পানি কেবল উৎপাদনে জড়িত। দেশে ব্যবহৃত কেবলের প্রায় ৪০ ভাগ গৃহস্থালি কার্যক্রমে ব্যবহার করা হয়, বাকি ৬০ ভাগ প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপনায়।
ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে দেশে কেবল উৎপাদনের মাধ্যমে আরএফএল কেবল ব্যবসা শুরু করে। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে প্রাণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে প্রতিষ্ঠাতা আহসান খান চৌধুরীর হাত ধরে নিজস্ব অর্থায়ন ও ব্যাংক লোনের মাধ্যমে প্রায় ২২০ কোটি টাকা বিনিয়োগে যাত্রা শুরু করে রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। কারখানা চালু করার সময় দক্ষ শ্রমিকের যথেষ্ট ঘাটতি ছিল, তবে ধীরে ধীরে তা পুষিয়ে নিতে শুরু করে আরএফএল। শুরুতে কারখানার শ্রমিক ছিল ৫০-৬০ জন। বর্তমানে সেখানে প্রায় ২৫০ জন কর্মী কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি অনুসরণ করে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বেশকিছু সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে কারখানায়। এখানে শ্রমিকদের জন্য রয়েছে ভর্তুকিমূল্যে খাবার, শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা ও স্কুল। তাছাড়া কর্মীদের কমপ্লায়েন্স ও দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় নিয়মিত। উল্লেখ করা যেতে পারে এখানে কর্মরত সব শ্রমিকই বাংলাদেশী, অর্থাৎ দেশের মানুষের কর্মসংস্থানে ভূমিকা রাখছে আরএফএলের এ কারখানা।
কারখানার নাম রংপুর মেটাল হলেও এর উৎপাদিত কেবলস ‘বিজলী ক্যাবলস্’ নামে বাজারজাত হয়। মূলত কেবলস পণ্যগুলোর আলাদা ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠিত করার আগ্রহ থেকে এ নামকরণ। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ভোক্তাদের সুলভ মূল্যে ভালো মানের পণ্য দেয়াই মূল লক্ষ্য বিজলী কেবলসের। বর্তমানে বিজলীর পাওয়ার কেবল, কমিউনিকেশন কেবল, এনামেল ওয়্যার, কপার স্ট্রিপ, অপটিক্যাল ফাইবার ও ফায়ার রেজিস্ট্যান্স কেবলসহ দশ শ্রেণীর কেবলস বাজারজাত হচ্ছে। এর মধ্যে পাওয়ার কেবলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ডমেস্টিক কেবল কয়েলপ্রতি (১০০ মিটার) দাম ১ হাজার ২৯৫ থেকে ৪২ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে প্রতি ১০০ মিটার ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেবলের দাম ৬ হাজার ৭৬৫ থেকে ২ লাখ ৮১ হাজার ৬০০ টাকা। বিজলী কেবলসের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১০ ভাগ।
বর্তমানে বিজলীর কারখানায় হাউজ ওয়ারিং কেবল, পাওয়ার কেবল (LT & HT), সুপার এনামেল ওয়্যার, পিভিসি কম্পাউন্ডিং, ওভার হেড কন্ডাক্টর, ফাইবার অপটিক কেবল ও কমিউনিকেশন কেবল, উড প্লান্ট, কপার অ্যান্ড অ্যালুমিনিয়াম ফার্নেস ইউনিট রয়েছে।
বিজলী কেবলস নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে পরিবেশবান্ধব কেবলস উৎপাদন করে। অত্যাধুনিক ইউরোপীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ বিশুদ্ধ কপার দিয়ে উৎপাদন করা হয় বিজলী কেবলস। এর কপারের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা হয় স্পেক্ট্রোমিটার যন্ত্রের মাধ্যমে। তাছাড়া নিরাপত্তার জন্য ‘এটিও’ সমৃদ্ধ অগ্নিপ্রতিবন্ধক পিভিসি ইনসুলেশন ব্যবহার করা হয়। অত্যাধুনিক সিসিভি লাইনে উৎপাদন হয় বিজলী এইচটি কেবলস। বিজলীর তার তৈরিতে ব্যবহৃত কপারের কন্ডাক্টিভিটি ১০১ ভাগ, ফলে সঠিক মাত্রায় বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। ফলে বিদ্যুৎ বিল কম হয়। তাছাড়া উৎপাদিত পণ্যের মান ও আনুষঙ্গিক নিরাপত্তা পরীক্ষার জন্য রয়েছে আধুনিক ল্যাবরেটরি। জাপান, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের অত্যাধুনিক মেশিনের সাহায্যে মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদন করায় বিজলী কেবল অর্জন করেছে BSTI, BUET, RUET, KUET, DUET সহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সনদ, যেগুলোর মধ্যে আছে ISO, CPRI (Central Power Research Institute) ও BV (Bureau Veritas)।
প্রাথমিক অবস্থায় রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ছিল মাসিক ৪৫০ টন, যেখানে শুধু ডোমেস্টিক ও এলটি কেবল উৎপাদন হতো। বর্তমানে কারখানার সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে মাসে প্রায় ১ হাজার ৭৫০ টন, যেখানে সব ধরনের কেবল উৎপাদন হচ্ছে। এছাড়া অত্যাধুনিক সিসিভি লাইনে উৎপাদন হয় বিজলী এইচটি কেবলস। বর্তমানে উৎপাদিত পণ্যগুলোর পাশাপাশি কিছু নতুন পণ্যের লাইন যেমন অতিরিক্ত উচ্চ ভোল্টেজ তারের তামার টিউব পাসওয়ার্ড তৈরির লক্ষ্যে কারখানাটি সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে আরএফএল কর্তৃপক্ষ।
দেশের বিভিন্ন স্থানে বিজলী কেবলসের ১৫৯টি শোরুম হয়েছে। পাশাপাশি অনুমোদিত ডিলারদের কাছেও দেশের যেকোনো প্রান্তে পাওয়া যায় বিজলীর পণ্য। দেশের সাধারণ ভোক্তার পাশাপাশি পিডিবি, আরইবি, ডেসকো, নেসকো, ডিপিডিসি, ইইডি, পিডব্লিউডিসহ বাংলাদেশ সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও বিজলী কেবলস সরবরাহ করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ২০২১ সালে হাউজ ওয়ারিং কেবলের কিছু আইটেম রফতানির মাধ্যমে আরএফএলের বিজলী কেবলস রফতানির খাতায়ও নাম লিখিয়েছে।
বাংলাদেশে কেবলস শিল্পের রয়েছে বিরাট সম্ভাবনা। আরএফএল কর্তৃপক্ষের মতে, এখন কেবলস উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রয়োজনীয় সব ধরনের কেবলস জোগান দিতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোই যথেষ্ট। শুধু দক্ষ জনশক্তির ব্যবহার ও উৎপাদন সহায়ক অর্থনীতি বিদ্যমান থাকলে এ খাত হয়ে উঠতে পারে রফতানিমুখী আয়ের বড় উৎস।





