বেলা ৩টা, এনপলি হাউজের সবচেয়ে ওপরের তলায় বসে মার্কেটিং ও ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে জরুরি মিটিং করছেন প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা এবং বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ। কোম্পানির ছোট থেকে বড় সব সিদ্ধান্তই আসে তার হাত ধরে। আর তাই প্রতিষ্ঠানের আর সব কর্মচারীর মতো নিজেও অফিসে সময় দিচ্ছেন নিয়ম অনুসরণ করেই। শৃঙ্খলা, সততা ও সময়ানুবর্তিতা বজায় রেখে একসময় প্লাস্টিকের কাঁচামাল আমদানি করার ছোট ব্যবসাকে আজ পরিণত করেছেন দেশের সবচেয়ে বড় পাইপ-ফিটিংস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিতে। ময়মনসিংহের ভালুকায় প্রায় ৬২ একরের বিশাল জায়গাজুড়ে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে গড়ে উঠেছে ন্যাশনাল পলিমারের নিজস্ব শিল্প এলাকা। কীভাবে সম্ভব হলো এ যাত্রা?

১৯৮৭ সালে ন্যাশনাল পলিমারের প্রতিষ্ঠা হলেও প্লাস্টিক পলিমার পণ্য উৎপাদন শুরু হয়েছিল ১৯৯০ থেকে। শুরুর দিকে রিয়াদ মাহমুদের পিতা পাইপ বানানোর কাঁচামাল আমদানি করতেন, প্লাস্টিকের কাঁচামাল তখন দানাদার আকারে আমদানি করা হতো, যা তাদের থেকে প্লাস্টিক উৎপাদনকারী ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান কিনে নিয়ে যেত। প্রথমদিকে তারা ভাবলেন এ দানাদার কাঁচামালই বাংলাদেশে উৎপাদন করা যেতে পারে এবং প্লাস্টিক পাইপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা যেতে পারে। ১৯৯৪ সালে সক্রিয়ভাবে ব্যবসায় যোগ দেন রিয়াদ মাহমুদ। পড়াশোনার প্রয়োজনে দেশের বাইরে অবস্থান করার সময় রিয়াদ মাহমুদ দেখেছিলেন দেশে পাইপ হিসেবে যেই কোয়ালিটির প্লাস্টিক ব্যবহার করা হচ্ছে তার চেয়ে অনেক উন্নত প্রযুক্তির পলিমার পিভিসি পাইপ উন্নত দেশগুলোয় ব্যবহৃত হয়। সেই সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থাপনায় লোহার তৈরি পাইপ ও ফিটিংস ব্যবহার করা হতো। কিন্তু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রজেক্ট ও বিল্ডিংয়ে পিভিসি পাইপ ও ফিটিংসের ব্যবহার বাড়তে থাকে। পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কাজেও পিভিসি পাইপ এবং ফিটিংসের ব্যবহার শুরু হয়। ন্যাশনাল পলিমারের (এনপলি) জন্য এটা একটা সুবর্ণ সুযোগ ছিল। রিয়াদ মাহমুদ ঠিক করলেন দানাদার কাঁচামালের জায়গায় সরাসরি বাইরের দেশের প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেরাই পিভিসি পাইপ উৎপাদন শুরু করা যেতে পারে। তখন থেকেই শুরু হলো ন্যাশনাল পলিমারের পাইপ-ফিটিংস তৈরির যাত্রা।

পাইপ-ফিটিংস ছাড়াও ইউপিভিসি ডোর, ডব্লিউ পিসি ডোর ও ট্যাংক তৈরি করে বর্তমান বাজারে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে এনপলি গ্রুপ। ১৯৯১ সালে কোম্পানিটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এবং ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়। বর্তমানে কোম্পানিটি ৩০০ কোটি টাকার অনুমোদিত মূলধনের বিপরীতে প্রায় ৭২ কোটি ৯৮ লক্ষ টাকার পরিশোধিত মূলধনে পরিচালিত হচ্ছে। এনপলি ২০২১ সালে ন্যাশনাল প্রডাক্টিভিটি অ্যাওয়ার্ড ও জাতীয় রফতানিতে ট্রফি অর্জন করেছে ২০২০-২১ অর্থবছরে।

কিন্তু শুরুতে সবকিছু এত সহজ ছিল না

রিয়াদ মাহমুদের ভাষায়, ‘শুরুর দিকে আমরা জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে কিছুটা বাধার সম্মুখীন হয়েছিলাম। নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বিদ্যুৎ চুরি হতো, অনেক রিসোর্সের অভাব ছিল, তাই আমাদের কস্টিং মিলত না। এছাড়া ভালুকা এলাকায় কারখানা স্থাপনের শুরুর দিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট দেখা দিয়েছিল। আরো বড় সমস্যা ছিল দক্ষ জনবল সংগ্রহ করা। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারও কঠোর হতে লাগল, বিদ্যুতের মিটার বসানো হলো সব জায়গায়, গ্যাস সাপ্লাই নিশ্চিত হলো। এখন দেশে নিজের কাজের মূল্যায়ন হলে শিক্ষিত প্রকৌশলী ও দক্ষ কর্মীরা দেশেই থাকছেন। আমাদের উৎপাদনও তাই বাড়ছে চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে।” ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও শিল্পায়নের চাহিদায় গ্যাস ও বিদ্যুৎস্বল্পতার প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ভালুকার শিল্প এলাকায় সোলার প্যানেলসহ ফসিল ফুয়েলের বিকল্প হিসেবে অন্যান্য অপশন ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিনিয়ত পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বজায় রেখেছে এনপলি।’

পাইপ উৎপাদন হলেও শুরুর দিকে পাইপের সঙ্গে ধাতব জিআই ফিটিংস ব্যবহার হচ্ছিল বাংলাদেশে বেশির ভাগ জায়গায়। এক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো বেশি খরচ, ধাতুতে মরিচা পড়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। এক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে নতুন প্রযুক্তিতে পিভিসি ফিটিংস তৈরিতে মনোযোগ দেয় ন্যাশনাল পলিমার। আর শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক মান (শুরুতে BS3505 স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করা হতো, আর এখন অনুসরণ করা হয় ISO স্ট্যান্ডার্ড) রক্ষা করে পাইপ তৈরি করায় গ্রাহকদের কাছে এনপলি ভরসার স্থান গ্রহণ করে নিয়েছিল। ফলে মেটাল ফিটিংসের পরিবর্তে পিভিসি ফিটিংস যখন তারা গ্রাহকদের কাছে পরিচিত করায় তা সবাই সাদরে গ্রহণ করে। আর তাই ফিটিংসের জন্য ১০৮টা মেশিন এনে দেশেই পাইপ ও ফিটিংস তৈরি শুরু করে পুরোদমে এনপলি। কারখানার অত্যাধুনিক মেশিনসমূহ ইতালি, চায়না এবং ভারত থেকে আমদানিকৃত।

বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরুর পর বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দেশজুড়ে পণ্যের বিপণন। নব্বই দশকে প্লাস্টিকের ব্যবসা ছিল পুরান ঢাকার আলুবাজারকেন্দ্রিক, সারা দেশ থেকে ক্রেতারা এখানে আসতেন। এনপলি এক্ষেত্রে মোটামুটি বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলে ১৯৯৬ সালে ২২ জন সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ নিয়োগ করে, যাদের কাজ ছিল ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় পাইপের ডিলারদের কাছে এনপলির পণ্য পৌঁছানো নিশ্চিত করা। তখনকার বাজার পরিস্থিতিতে সাহস করে নেয়া এ উদ্যোগের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে বর্তমানে দেশের প্রতিটি উপজেলা ও থানা পর্যায়েও এনপলির হাজারের বেশি সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজ করছেন। এ রিপ্রেজেন্টেটিভরা ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে ডিলারদের সঙ্গে লেনদেন করেন। ফলে নিজেদের এলাকায় বসেই পণ্য অর্ডার ও গ্রহণ করতে পারেন ডিলাররা।

কর্মীদের প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক এনপলি কর্তৃপক্ষ। যার কারণে ভালুকার ফ্যাক্টরিতে কর্মরত ৩ হাজার ২০০ কর্মীর জন্য তারা রেখেছেন ১৭ জন বাবুর্চিসহ দৈনিক লাঞ্চ, ডিনার ও নাশতার সুব্যবস্থা। প্রতি বেলার খাবার সাবসিডাইজ হওয়ায় অল্প খরচেই কর্মীরা খেতে পারছেন নিজেদের ক্যান্টিনে। ফ্যাক্টরি এরিয়া পরিবেশবান্ধবভাবে তৈরিও করা হয়েছে মূলত যারা কাজ করছেন তাদের কথা মাথায় রেখেই। এছাড়া শুরুতে টঙ্গীতে ফ্যাক্টরি থাকলেও দিন দিন এনপলির পণ্য ও উৎপাদনের পরিমাণ এবং বাজারে চাহিদা বাড়ার ফলে আরো বেশি জায়গা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। যেহেতু টঙ্গী এখন শহরাঞ্চলের অংশ হয়ে গেছে ফলে এনপলির ভবিষ্যৎ প্রসারণশীল ব্যবসার সুবিধার্থে এমন একটি জায়গার প্রয়োজন হয় যেখানে কারখানা সম্প্রসারণের পাশাপাশি কারখানার পরিবেশ রক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়া যাবে। স্বাভাবিকভাবেই প্লাস্টিক ফ্যাক্টরির বর্জ্য পরিবেশ, মানুষ ও পশুপাখির জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য যথেষ্ট জায়গা প্রয়োজন ছিল। তখনই তারা ময়মনসিংহে নতুন একটি শিল্প এলাকায় সম্প্রসারিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ময়মনসিংহের গ্রিন ফ্যাক্টরি   

এমডি রিয়াদ মাহমুদ বলেন, ‘এনপলি পণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আরো বড় ফ্যাক্টরির প্রয়োজন দেখা দেয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালে ভালুকায় জমি কিনে উৎপাদন শুরু করা হয়। বর্তমানে সেখানে ট্যাংক, পাইপ-ফিটিংস প্রস্তুত হচ্ছে। এছাড়া ২০১৭ সালে ভালুকায় আমাদের রফতানিভিত্তিক জুতা ফ্যাক্টরি (সুনিভার্স ফুটওয়্যার লি.) চালু হয় যা গ্রিন ফ্যাক্টরির জন্য লিড সার্টিফিকেট অর্জন করেছে। আমাদের প্রতিটি ফ্যাক্টরি ইটিপি প্রকল্পের আওতায়, ফায়ার সেফটি ও পরিবেশবান্ধব, যা অত্র এলাকার মানুষের কাছে আমাদের সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। ফ্যাক্টরি পরিবেশবান্ধব রাখার এ প্রচেষ্টা মূলত শ্রমিকদের জন্যই। কোনো রেগুলেটরি এজেন্সি বলুক বা না বলুক আমরা চেয়েছি আমাদের কর্মীরা যেন সুন্দর পরিবেশ পান, কেননা এছাড়া কর্মীরা কিছুদিন পরেই অসুস্থ হয়ে যাবেন। আর এমন পরিবেশে কেউই থাকতে চাইবে না পরবর্তী সময়ে যা আমাদের উৎপাদন ও ব্যবসা উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। তাই পরিবেশের প্রতি সুনজর রাখা মূলত আমাদের নিজেদের জন্যই দরকার। পরিবেশ ও পৃথিবী ভালো না থাকলে আমরাও সুস্থ থাকতে পারব না।’ পরিবেশ ও কর্মীদের সুস্থতা রক্ষায় কারখানা ও তার আশপাশের এলাকায় ধূমপানকেও নিরুৎসাহিত করেছেন তারা। 

এনপলির বর্তমান কর্মযজ্ঞ ও প্রচেষ্টায় শুরুর দিকে বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেয়া হলেও এখন সম্পূর্ণই প্রতিষ্ঠানটি দেশী প্রকৌশলী ও কর্মীনির্ভর। দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি তাদের কিছু পণ্য বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। পাইপ ও দরজা রফতানি হচ্ছে ভারতের সেভেন সিস্টার্স অঞ্চলে ও সু ফ্যাক্টরির জুতা ১০০ ভাগ রফতানি হচ্ছে আমেরিকায়।

টেক্সাস ইউনিভার্সিটি থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি এবং অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ সম্পন্ন করার পর প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে পরিশ্রম করে ন্যাশনাল পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজকে রিয়াদ মাহমুদ তুলে এনেছেন আজকের উচ্চতায়। শিক্ষকতাও করেছেন তিনি ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময়। 

এক্ষেত্রে উৎসাহ বা সাপোর্ট হিসেবে কী সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা আমি ছাত্র থাকা অবস্থায়ই মারা যান। এরপর বলতে গেলে একলাই ব্যবসা নিয়ে এগিয়েছি। আমার পাশে সাপোর্ট হিসেবে সেভাবে কেউ ছিল না। তবে শিল্প খাতে যারা প্রতিষ্ঠিত, যারা আমার চেয়ে অগ্রজ তাদের সঙ্গে আমি দেখা হলে সাজেশন নিতাম। তাদের জিজ্ঞাসা করে নিশ্চিত হতাম কীভাবে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা তারা সমাধান করেছেন। এছাড়া আমি নিজে শিক্ষকতা করেছি, কারণ আমি জানি শিক্ষার্থীদের ঠিকভাবে পড়াতে হলে আগে নিজে পড়তে হয়। আর নিজে পড়ার অভ্যাস থাকলে সবসময় অনেক কিছু শেখা যায়। আমি এখনো নিজেকে একজন শিক্ষার্থী ভাবি, তাই প্রতিদিনই নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করছি।’

উদ্যোক্তা ও শিক্ষক রিয়াদ মাহমুদ বাংলাদেশে জর্জিয়ার অনারারি কনসাল হিসেবেও নিযুক্ত রয়েছেন। ফলে বাংলাদেশ ও জর্জিয়ার মাঝে সম্পর্ক রক্ষায় কাজ করার পাশাপাশি উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের প্লাস্টিক ও পিভিসি শিল্পের গুণগত মানোন্নয়ন নিয়েও কাজ করতে পারছেন তিনি। 

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পাইপ-ফিটিংস জাতীয় নির্মাণসামগ্রীর ভবিষ্যৎ যথেষ্ট উজ্জ্বল তা ন্যাশনাল পলিমারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও ব্যবসার সম্প্রসারণ থেকেই আন্দাজ করা যায়। এ বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করার পাশাপাশি সরকার এ শিল্পের অগ্রগণ্যতার লক্ষ্যে যথাযথ পরিকল্পনা ও মনোযোগ বজায় রাখবে এমন দাবি জানান রিয়াদ মাহমুদ।