মেঘনা নদীতীরে প্রায় ৫০ বছর আগে যে স্বপ্নের বীজ বোনা হয়েছিল তারই বর্তমান রূপ মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)। আধুনিক জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় উন্নতমানের পণ্যসামগ্রী বর্তমানে এমজিআই-এর হাত ধরে দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। যার মধ্যে অন্যতম একটি হলো পেপার ইন্ডাস্ট্রি যেখানে উৎপাদিত হয় ফ্রেশ ব্র্যান্ডের হোয়াইট রাইটিং অ্যান্ড প্রিন্টিং পেপার, কালার পেপার, লেজার পেপার, এনসিআর পেপার, A4, Legal, A3 পেপার, আর্ট পেপার, এক্সারসাইজ বুক (খাতা), মিডিয়াম পেপার, লাইনার পেপার ( গ্রেড -১ ,গ্রেড-2) ক্রাফট পেপার , হোয়াইট লাইনার পেপার ও  সিমপ্লেক্স বোর্ড  ইত্যাদি

নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে ২০১৬ সালে এমজিআই-এর নিজস্ব শিল্প এলাকায় যাত্রা শুরু করে মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস্ লিমিটেড-এর বিশাল কারখানা। তবে ভূমি ব্যবস্থাপনা, বিপুল অর্থ সংস্থান, গ্যাস সংযোগ, অভিজ্ঞ ও দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ দিয়ে কারখানা চালু করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উদ্যোক্তারা যদিও নিজেদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং সুদক্ষ ও চৌকস নেতৃত্বের মাধ্যমে এসব সমাধান করেছিলেন। 

প্রতিষ্ঠাকালে মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস্ লিমিটেড-এর কারখানায় জনবল ছিল প্রায় ৩০০ জন। ক্রমবর্ধমান উৎপাদনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। দেশের শ্রম আইন অনুযায়ী তাদের দেওয়া হয় বেতন, আবাসন ভাতা ও অন্য সুযোগ-সুবিধা। ভবিষ্যতে দেশের চাহিদা ও রপ্তানির সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে কারখানাটিকে আরো সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। তখন কারখানার আকার ও কর্মচারীর সংখ্যা দুই-ই বাড়বে। 

মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস্ লিমিটেড-এর কারখানায় শুরু থেকেই ব্যবহার করা হচ্ছে জার্মানির বিশ্বখ্যাত ‘ভোয়েথ’ কোম্পানি থেকে আমদানি করা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মেশিন। এতে মানসম্পন্ন ও রপ্তানিযোগ্য করে তৈরি হচ্ছে ফ্রেশ পেপার, যার প্রতি জিএসএম কাগজের সব প্যারামিটার শতভাগ নিশ্চিত করে গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয় বিশ্বসেরা কোম্পানির স্ক্যানার। সেই সঙ্গে ক্রমাগত মানোন্নয়ন নিয়ে করা হয় গবেষণা এবং এজন্য রয়েছে অত্যাধনিক একটি গবেষণাগার। এছাড়াও অন্যান্য অনেক মেশিন রয়েছে কারখানাটিতে, যা বিশ্বের উন্নত দেশগুলো থেকে আমদানি করা হয়েছে। অটোমেটেড এসব যন্ত্রে পণ্যের মান রক্ষায় কোনো ধরনের ঘাটতি থাকছে না। মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস্ লিমিটেডের উৎপাদিত পণ্য ISO, (BSTI) 150-এর সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত। 

বাজারে ব্যাপক চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস্ লিমিটেড বিভিন্ন ধরনের কাগজ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্রেশ ব্র্যান্ডের হোয়াইট রাইটিং অ্যান্ড প্রিন্টিং পেপার, কালার পেপার, লেজার পেপার, এনসিআর (কার্বনলেস) পেপার, A4, Legal, A3 পেপার, আর্ট (কোটেড) পেপার, এক্সারসাইজ বুক (খাতা) ইত্যাদি। দেশে আমদানি নির্ভরতা কমানোর লক্ষে নতুন করে থার্মাল পেপার, সাব্লিমেশন পেপার ও ডি আই পি পেপারও উৎপাদন করা হচ্ছে। 

তানভীর পেপার মিলস্ লিমিটেড, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)-এর পেপার প্রস্তুতকারক আরেকটি প্রতিষ্ঠান যার উৎপাদিত পণ্য দেশের ছোট-বড় শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত হয় এবং বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। এখানে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদন করা হয় যার রয়েছে FSC, ISO এবং BVCH সার্টিফিকেট। মূলত পাঁচ ধরনের কাগজ উৎপাদিত হয় এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে- মিডিয়াম পেপার, লাইনার পেপার, ক্র্যাফট পেপার, হোয়াইট টপ পেপার ও সিমপ্লেক্স বোর্ড। মিডিয়াম কাগজের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য এর সেরা গুণগত মান, যার উৎপাদন ও বিতরণের প্রতিটি ধাপে শক্তিশালী মান নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়। এমজিআই-এর এই কারখানায় ৭০ জিএসএম থেকে ৩৫০ জিএসএম পর্যন্ত পুরুত্বের উপরোক্ত সকল কাগজ উৎপাদিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের বাজারে বর্তমানে ৩০ শতাংশের বেশি মিডিয়াম কাগজের শেয়ারের অংশীদার এমজিআই-এর তানভীর পেপার মিলস্ লিমিটেড এর। 

লাইনার কাগজ মজবুত-গঠন ও জি এস এম নিশ্চিত করে। এটি প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কাগজ আমদানি করা কমাতে অনেকাংশে সহায়তা করেছে। দেশের লাইনার পেপার বাজারের ২৫ শতাংশের বেশি অংশ দখল করে আছে বর্তমানে তানভীর পেপার মিলস্ লিমিটেড । দেশের ছোট-বড় প্যাকেজিং কারখানা এবং ব্যবসায়ীরা মিডিয়াম কাগজ ও লাইনার কাগজের মূল গ্রাহক।

ক্র্যাফট পেপার মূলত কাগজের ব্যাগ উৎপাদনে ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়। উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে এ কাগজের উপাদানগুলোর শক্ত মান নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়। বাংলাদেশের ক্র্যাফট পেপার বাজারের ৪০ শতাংশের বেশি অংশ বর্তমানে তানভীর পেপার মিলস্ লিমিটেড এর দখলে। দেশের বেশির ভাগ বড় কাগজের ব্যাগ কারখানা ও ব্যাগ উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীরা এ কাগজের মূল ক্রেতা। 

বাংলাদেশ পেপার মিলস্ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের কাগজ বাজারের আকার বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার, সাম্প্রতিক সময়ে যা বার্ষিক ৫ শতাংশের বেশি হারে বাড়ছে। বার্ষিক ১৫ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কাগজ পণ্যের স্থানীয় চাহিদা (মাত্র ৬ লাখ টন) মেটাতে ৩ লাখ টন কাগজই আমদানি করা হচ্ছে, যা সুলভ মূল্যে গ্রাহকের কাগজ পাওয়ার পথে অন্তরায়।

বর্তমানে শুধু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী পেপার মিলস্ সীমিত পরিসরে কাগজ তৈরি করছে। ফলে বেসরকারি কোম্পানি ও উদ্যোক্তাদের জন্য এ খাতে বড় জায়গা রয়েছে, দেশের চাহিদা মিটাতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বিদেশেও কাগজ রফতানি করার। আর সে সম্ভাবনা কাজে লাগিয়েই নিজেদের অবস্থান আরো বেশি মজবুত করতে কাজ করে যাচ্ছে মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস্ লিমিটেড কর্তৃপক্ষ।