১২ মে বণিক বার্তার সম্মেলন কক্ষে বণিক বার্তা ও স্বপ্নের যৌথ আয়োজনে ‘আরবান ইকোনমি, সুপারমার্কেটস/সুপারশপ অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবল রিটেইল বিজনেস’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকের সারসংক্ষেপ

হানিফ মাহমুদ&dquote;&dquote;
সম্পাদক, বণিক বার্তা
আমরা একটি পরিবর্তনের  মধ্যে রয়েছি। আমাদের অর্থনীতি বড় হচ্ছে, জনসংখ্যা বাড়ছে।  আমাদের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপর রয়েছে। আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান দুটি স্তম্ভ কৃষি ও গার্মেন্টস। তবে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার জন্য সরকার চেষ্টা করছে। ইলেকট্রনিকস, ফ্রোজেন ফুড, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি খাতে আমরা এগিয়ে যেতে শুরু করেছি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুসারে, দেশের জনসংখ্যা এখন প্রায় ১৬ কোটি ৬০ লাখ, যা ২০২০ সালের মধ্যে দাঁড়াবে ১৭ কোটিতে। অন্যদিকে খুব দ্রুততার সঙ্গে নগরায়ণ বাড়ছে। মোট জনসংখ্যার ৩৫ শতাংশ নগরে বাস করে। একটি হিসাব অনুযায়ী, ২০৫৭ সালের মধ্যে মোট জনংখ্যার অর্ধেক থাকবে নগর এলাকায়। আমাদের কর্মসংস্থান বেশির ভাগই শহরকেন্দ্রিক, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামভিত্তিক। আমাদের জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ তরুণ। প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের বয়স ৫৪ বছরের নিচে। আমাদের গ্রাহক আচরণের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, আমাদের সর্বাধিক কেনা পণ্যের মধ্যে রয়েছে চাল, সবজি, মুরগি, মাংস, ডিম, মাছ, দুধ প্রভৃতি। এসব কিনতে সাধারণ মানুষের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয়। এখানে একটি উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণী রয়েছে। ২০০০ সালের পর আগোরা, মীনা বাজার, স্বপ্ন প্রভৃতির মতো ঢাকা-চট্টগ্রামকে ঘিরে প্রচুর সুপারস্টোর তৈরি হয়। যারা উচ্চবিত্ত, তারা যেসব পণ্যের গ্রান্ড কোয়ালিটি অনেক ভালো, সেসব পণ্য বেশি কিনছে। একসময় মানুষ খোলা পণ্য কিনত, এখন ধীরে ধীরে প্যাকেটজাত পণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বাংলাদেশ সুপারমার্কেটস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসওএ) তথ্যানুসারে, দেশের খুচরা বাজারের আকার প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা। এখন ৩০টির মতো কোম্পানি ২০০টির মতো সুপারমার্কেট পরিচালনা করছে। দুই বছর আগের তথ্য অনুসারে, এ বাজারের আকার ছিল প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এখন প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা হবে। অনুমান অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যে ৩ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছে যাবে। খুচরা বাজারে আমাদের ১২ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়। তবে এ হিসাব করা খুব কঠিন, কারণ রিটেইলের একটা অংশ আন-অ্যাকাউন্টেড। আমাদের এখানে প্রায় ৭০ শতাংশ খুচরা দোকান, খোলা দোকান ও রাস্তার পাশের দোকান। বাকিগুলো মিউনিসিপল করপোরেশন মার্কেট, কনভিনিয়েন্স স্টোর ও সুপারমার্কেট। এই ৩০ শতাংশ মোটামুটিভাবে অ্যাকাউন্টেড আকারে রয়েছে। বাকি ৭০ শতাংশ সেভাবে অ্যাকাউন্টেড নয়। বহু লোকের ট্রেড লাইসেন্স নেই। অনেক ক্ষেত্রে অবকাঠামো নেই। অর্থনীতি যখন বড় হয়, তখন রিটেইল মার্কেটকে অ্যাকাউন্টেবল করা, ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী আকারের মধ্যে নিয়ে আসা একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। খুচরা বাজার থেকে সরকারের রাজস্ব আহরণ হয় খুবই কম। অথচ একটু সতর্কতার সঙ্গে খুচরা ব্যবসাকে নজরদারির মধ্যে এনে অধিক রাজস্ব আদায় সম্ভব। সেক্ষেত্রে সুপারশপের সংখ্যা বাড়লে রাজস্ব আহরণ সহজ হবে।

 

জাকির হোসেইন&dquote;&dquote;
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সুপারমার্কেটস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসওএ)
মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখ নিয়ে এখন যে সচেতনতা দেখা যায়, তা কিন্তু সুপারমার্কেটেরই তৈরি। প্রথম দিন থেকেই সুপারমার্কেট কালচারে এ বিষয়টি প্রাধান্য দেয়া হয়। খুচরা বাজার নিয়ে আইন থাকলেও প্রয়োগ তেমন ছিল না। এক্ষেত্রে আমরা যেখানে পথ দেখাতে শুরু করি, সেখানে দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, প্রথম ধাক্কা আমাদের ওপরই আসতে লাগল। জরিমানা শুরু হলো আমাদের দিয়ে। সুপারমার্কেটে এখন ৪ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। গ্রাহক হিসেবে যদি বলি, আমি কেন ২ টাকা বেশি দিয়ে সুপারমার্কেট থেকে পণ্য কিনব? বাইরে থেকে কিনলে এ ৪ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয় না। আমরা এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি। বিভিন্ন দেশের তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছি, কোন দেশের সুপারমার্কেটের কী অবস্থা, আমাদের এখানে সরকার কীভাবে রাজস্ব হারাচ্ছে এবং পাচ্ছে; পথ দেখিয়েছি কীভাবে কাজ করলে রিটেইল বাজার থেকে দু-তিন গুণ রাজস্ব আদায় সম্ভব। আমাদের সঙ্গে যখন বসা হয়, তখন তারা চমত্কারভাবে বোঝেন এবং আশ্বাসও দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, আমরা যখন সেখান থেকে বেরিয়ে আসি, তখন কাজের চাপে হোক আর সময়ের চাপে হোক, তারা সেটা ভুলেও যান। তারা একেবারে যে বসে আছেন তা নয়, তবে অতি ধীর। মোবাইল কোর্ট নিয়ে যত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় রয়েছে, তাদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলা হয়েছে। মোবাইল কোর্ট যখন অভিযান চালান, সে সময় ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে কথা বলা যায় না। কথা বললেই জরিমানা দ্বিগুণ হয়ে যায়। একবার সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের ফরমালিন শনাক্তকরণ মেশিন কেনার নির্দেশ দেয়া হয়। বলা হয়, এ মেশিন না থাকলে সুপারমার্কেট বন্ধ করে দেয়া হবে। কিছুদিন আগে মামলা করে হাইকোর্ট থেকে ওই মেশিনের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে। সুপারমার্কেট হওয়ার কারণে যে শুধু কালচার চেঞ্জ হচ্ছে তা নয়, কিছু ছোট ছোট ব্যবসায়ী তৈরি হচ্ছে। অথচ আমাদের ছোটখাটো ত্রুটিকে বড় করে দেখানো হচ্ছে। ভালো কাজের প্রশংসা তো করাই হচ্ছে না, বরং হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। এখানে কর্মসংস্থানও হচ্ছে। এখানে শিক্ষিত লোকেরা কাজ করছেন।

খুরশেদ আলম&dquote;&dquote;
হেড অব পার্সোনাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস লংকাবাংলা ফিন্যান্স
সুপারমার্কেটে মানুষ যায় ভালো পণ্য কিনবে বলে। সুপারমার্কেটে পণ্যের গায়ে লেখা দামে বিক্রি করা হয়। সেখানে ভ্যাটটা ইনক্লুড করা যেতে পারে। কারণ পণ্য বিক্রির ওপর সুপারমার্কেট কমিশন পায়। তাই লোকসান হবে না। সবজি, ফল, মাছ সরাসরি উৎপাদনকারীর কাছ থেকে আনা যেতে পারে। এতে ফরমালিন বা রাসায়নিক দ্রব্য থেকে মুক্ত থাকা যেতে পারে। কিন্তু সেটা করা হয় না। আর কাস্টমার সার্ভিসের অবস্থা খুবই খারাপ। কাস্টমার সার্ভিসের জন্য কোনো ট্রেনিং দেয়া হয় না। সঠিক কাস্টমার সার্ভিস দেয়া হলে একই গ্রাহক বারবার যাবেন। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। আবার কোনো সুপারমার্কেটেই গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই। গাড়ি রাস্তায় রাখতে হয়। ফলে ট্রাফিক পুলিশ জরিমানা করে। সুপারমার্কেট মালিকদের একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, কাস্টমার হলো কিং। কাস্টমারকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কাস্টমারকে কম মূল্যে ভালো পণ্য দিতে হবে, তাহলে তারা বেঁচে থাকবে।

 

শাহীন খান&dquote;&dquote;
প্রধান নির্বাহী, জেমকন ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল প্রডাক্টস লিমিটেড (মীনা বাজার)
অর্থনীতি বাড়ছে, নগরায়ণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু নগরের চেহারাটা কেমন হবে? ৭০ শতাংশ রিটেইল হচ্ছে রাস্তার ধারে বা এখানে সেখানে বসে।  সুপারমার্কেট বা মডার্ন রিটেইল যেন বাড়তে পারে, সেজন্য ফেভারেবল পলিসি গ্রহণ করতে হবে। সুপারমার্কেট উপযোগী কমার্শিয়াল স্পেস নেই। পার্কিংসহ সুপারমার্কেটে আসতে গেলে মানুষ যেসব সুবিধা খোঁজে, তা এ শহরে নেই। নতুন শহরগুলোতে সেসব সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে একমাত্র সুপারমার্কেট থেকে পণ্য কিনলে গ্রাহক ৪ শতাংশ ভ্যাট দিতে বাধ্য, অথচ রাস্তার পাশের দোকান থেকে কিনলে তা দিতে হয় না। এ ৪ শতাংশ ভ্যাট যদি সব জায়গায় আরোপ করা যেত, তবে এ সেক্টরটা আরো বেশি প্রবৃদ্ধি করত, এ খাত থেকে সরকার আরো বেশি রাজস্ব আদায় করতে পারত। সুপারমার্কেট চেষ্টা করে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। সুপারমার্কেটে খাবার তাজা রাখতে বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তবে একটি পণ্য যে প্রক্রিয়া শেষে আমাদের কাছে আসে, তার প্রতিটিতে লোক বসানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর ডিরেক্ট সোর্সিং প্রতিষ্ঠানের আকারের ওপর নির্ভর করে। আকার বড় না হলে ডিরেক্ট সোর্সিং সম্ভব নয়। এছাড়া খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। একেকজন একেক রকম নির্দেশনা দেয়। এ সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে।

 

মতিউর রহমান&dquote;&dquote;
কমিশনার, বৃহৎ করদাতা ইউনিট
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)
সেমিনারে অনেক ভালো কথা হয়, কিন্তু কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, আমাদের মাঝে যদি দেশপ্রেম ও ভালোবাসা না থাকে, তাহলে এ কথাগুলো কথাই থেকে যাবে; বাস্তবে কোনো আউটপুট আসবে না। নতুন যে ভ্যাট আইন করার কথা ছিল, সেটার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রিস্ক অ্যানালাইসিস করার জন্য একটি কমিটি করা হয়েছিল। ওখানে সব জায়গায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের কথা বলা হয়েছিল। কমিটির বৈঠকে আমি বলেছিলাম, এ আইন কোনো দিন বাংলাদেশে বাস্তবায়ন হবে না, যদি বাস্তবতাকে মেনে না নিই। এনবিআরের দুটি দিক রয়েছে: একটি রাজস্ব, অন্যটি দেশের অর্থনীতি ও ভোক্তাস্বার্থ। সঠিক হিসাব করে না এগোলে দেশের সেক্টরগুলো বাড়তে পারবে না, বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইভেন প্লেগ্রাউন্ড নিশ্চিত করা। আমরা যদি সিস্টেম তৈরি করে দিতে পারি, তবে সিস্টেমটাই কাজ করবে। ভ্যাট ফাঁকি বন্ধে যেসব দোকানের ভ্যাট দেয়া উচিত, আমরা ইসিআর মেশিন বাধ্যতামূলক করেছিলাম বহু আগে, কিন্তু এটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। এক্ষেত্রে যদি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করি এবং এ কাজে সুপারমার্কেট অ্যাসোসিয়েশন ও সরকার সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করে, তাতে সুপারমার্কেট মালিকদের যেমন লাভ হবে, তেমনি সরকারেরও। কপি গুডস একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এটা প্রতিরোধ করা কাস্টমসের অন্যতম দায়িত্ব। ট্রেনিংয়ের জন্য জাপানে গিয়ে দেখেছি, ওখানকার কাস্টমসে সব জায়গায় লেখা আছে, নো কপি গুডস। এটা স্লোগান হিসেবে তারা ব্যবহার করে। যেহেতু পণ্যটা আসে আমাদের মাধ্যমে, ভ্যাটে যারা কাজ করেন, তারাও প্রডাক্ট মনিটরিং করেন, আমরাও এ স্লোগান ব্যবহার করতে পারি। এ স্লোগান এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে কাস্টমসের সব জায়গায় ট্যাগ করা যেতে পারে। যাতে এটা প্রতিষ্ঠিত করা যায় যে, আমরা কোনো কপি গুডস আসতে দেব না। এ নিয়ে আইন আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। নতুন শহরগুলোর ক্ষেত্রে একটি জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়া যেতে পারে, যেখানে সুপারমার্কেট হবে। সেভাবে অবকাঠামো করা হলে গ্রাহকদের সুবিধা হবে। জনসংখ্যার অনুপাতে সুপারমার্কেটের জন্য কতটুকু জায়গা ছেড়ে দিতে হবে, তা যদি নীতিমালার মধ্যে আনা যায় এবং ম্যান্ডেটরি করা যায়, তবে তা ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণে সাহায্য করবে। এনবিআর যেসব পলিসি করে, সে সম্পর্কে সুপারমার্কেট মালিকদের আপটুডেট থাকতে হবে। এনবিআর এখন অনেক প্রগতিশীলভাবে চিন্তা করে। তবে পলিসি করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবায়ন।

সোহেল তানভীর খান&dquote;&dquote;
বিজনেস ডিরেক্টর, এসিআই লজিস্টিকস (স্বপ্ন)
আমাদের একটি আউটলেটে মেয়াদের মধ্যে থাকা একটি সিল করা প্রডাক্টের ভেতরে পোকা যায়, গ্রাহক নিয়ে গিয়ে সিল খোলার পর সেটি দেখেন। অথচ এজন্য আমাদের দুজন কর্মচারীকে দুই মাস জেল খাটতে হয়েছে। তাদের কী দোষ? এভাবে চললে কি এ সেক্টরে কাজ করার জন্য লোক পাওয়া যাবে? এ ধরনের ঘটনা ঘটলে এ সেক্টর গ্রো করবে কীভাবে? একটা তো লজিক্যাল গ্রাউন্ড থাকতে হবে। যেজন্য আমাদের দুজন কর্মচারীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো, অথচ ম্যানুফ্যাকচারারকে কিছু বলা হলো না। এ সেক্টরের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইন্ডাস্ট্রি এটি। আমরা মেয়াদের তারিখ, তাপমাত্রা প্রভৃতি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে দেখভাল করে থাকি। এর পরও ভিক্টিমাইজ হচ্ছি। এদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এ ধরনের আইন থাকলে তা ব্যবসাবান্ধব কিনা, সেটি দেখা দরকার। এ ব্যবসায় ইনসেনটিভ দেয়া উচিত। এটা খুব মুনাফাজনক ব্যবসা নয়। যারা ব্যবসা করছেন, তাদের অধিকাংশই লোকসানে আছেন। তবে তারা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। এখন গ্রাহক যদি বলেন, একই পণ্য পাশের দোকানে পাওয়া যায়; কিন্তু তারা তো আমার কাছ থেকে ভ্যাট নিচ্ছে না। তাহলে আমাদের উত্তরটা কী হবে? ৪ শতাংশ ভ্যাট কিন্তু অনেক টাকা। গ্রাহকের কাছে এটি ম্যাটার করে। বাইরে থেকে কিনলে এটা দিতে হচ্ছে না। আমরা যদি উৎস থেকে সরাসরি পণ্য আনতে পারি, তাহলে তাদের গাইডলাইন ও ট্রেনিং দিয়ে কীটনাশকমুক্ত পণ্য আনতে পারব। লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত করা হলে আমরাও কম দামে পণ্য দিতে পারব।

 

আবুল খায়ের&dquote;&dquote;
হেড অব বিজনেস, আইপে সিস্টেমস লিমিটেড
৭০ শতাংশ রিটেইল দোকানে ডিজিটাল পেমেন্ট প্লাটফর্ম নেই। এখানে পেমেন্টে স্বচ্ছতা আনা এবং ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে তাকালে দেখব, পেমেন্টের ক্ষেত্রে আলিপে, পেপাল প্রভৃতি প্লাটফর্ম বাজারের পেমেন্ট ইকোনমিতে বড় বিপ্লব এনেছে। সেখানে পেমেন্টের ক্ষেত্রে অনেক স্বচ্ছতা চলে এসেছে। এটি গ্রাহককেও ভালো অনুভূতি দেয়। এছাড়া গ্রাহকদের মধ্যেও আস্থা আসে যে, এ দোকানে ডিজিটাল পেমেন্টের এ অপশন আছে, মানে এরা ভ্যাট-ট্যাক্স সরকারকে ঠিকমতো দিতে চায়।

 

খন্দকার নুর-ই-বোরহান&dquote;&dquote;
হেড অব কমার্শিয়াল, রহিম আফরোজ সুপারস্টোরস লিমিটেড (আগোরা)
কিছু পণ্যে ২০ কেজি পর্যন্ত পাটের ব্যাগ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটা নিশ্চিত করার কথা ম্যানুফ্যাকচারারদের। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মোবাইল কোর্ট এসে আমাদের জরিমানা করছে। প্রশ্ন হলো, আমরা ম্যানুফ্যাকচারার না, আমি পণ্য কিনে বিক্রি করছি, যারা আইন বাস্তবায়ন করছেন, তারা ম্যানুফ্যাকচারারের কাছে না গিয়ে কেন আমাদের কাছে আসছেন? যেখানে বেশি পণ্য সেখানে আইন বাস্তবায়ন করার কথা, সেখানে আগে ফোকাস দিতে হবে। অন্যদিকে সিলড প্রডাক্ট খুলে টেস্ট করে তো রাখা যায় না। রিটেইলারদের কাছে এমন কোনো যন্ত্র বা প্রযুক্তি নেই, যা দিয়ে তারা সিলড প্রডাক্ট খুলে টেস্ট করে তারপর রাখবে। আমরা ম্যানুফ্যাকচারারদের ট্রাস্ট করি। তারা সরকারের কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সার্টিফায়েড। ওই ট্রাস্টের ওপর ভিত্তি করে পণ্য বিক্রি করছি। সরকারের কর্তৃপক্ষকে বলব, উৎপাদনের প্রাথমিক পর্যায়ে নজর দেয়া হয়।

 

মাসুদুর রহমান&dquote;&dquote;
উপসচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
এ দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে ব্যবসায়ী সমাজ। এরা একদিকে অর্থনৈতিক ঝুঁকি বহন করছেন, একই সঙ্গে জেল-জরিমানাসহ বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি নিচ্ছেন। সুপারমার্কেটগুলোতে অন্যান্য জায়গার তুলনায় ট্রান্সপারেন্সি অনেক বেশি আছে। এটি নতুন কনসেপ্ট। নতুন বিষয় এগিয়ে নিতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে অনেক ঝুঁকি বহন করতে হয়। বারবার ভ্যাটের কথা আসছে। ভ্যাট তো আসার কথা ভ্যালু অ্যাডের ওপর। আপনি যতটুকু ভ্যালু অ্যাড করছেন, তার ওপর ভ্যাট যোগ হচ্ছে। বিদেশে দেখা যায়, টোটাল দাম একবারে দেয়া হয়, সেখানে দেখা যায় পণ্যের দাম কত, ভ্যাট কত। আর আমাদের এখানে পণ্যের মূল্য কত, এর ওপর ভ্যাট কত। ফলে এটি আলটিমেটলি কনজিউমারের ওপর পড়ে। কিন্তু আসলে কনজিউমারের ওপর ট্যাক্সটা পড়ার কথা না, যিনি যতটুকু ভ্যালু অ্যাড করছেন, তার ওপর। আর মোবাইল কোর্ট অ্যাক্টের সেকশন সেভেন অনুসারে অভিযোগ গঠন করার পর অভিযুক্তকে ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগ শোনাবেন এবং অভিযুক্ত যদি দোষ স্বীকার করেন, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট যেরূপ বিবেচনা করবেন, সেরূপ শাস্তি দেবেন। যদি অভিযুক্ত দোষ অস্বীকার করেন, সেক্ষেত্রে ব্যাখ্যা সন্তোষজনক মনে হলে ম্যাজিস্ট্রেট অব্যাহতি দেবেন। অন্যথায় উপযুক্ত আদালতে অভিযুক্তকে ট্রান্সফার করবেন। অনেক ক্ষেত্রে আদালতের ঝামেলা এড়ানোর জন্য জরিমানা দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু যদি মনে করেন, অভিযোগের সঙ্গে আপনার সম্পৃক্ততা নেই, তাহলে তা চ্যালেঞ্জ করার অধিকার আপনার আছে। ভোক্তারা অনেক ক্ষেত্রেই নিরুপায়। ভোক্তা পণ্য ভোগ করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব পড়ছে, তা দেখার মতো কেউ নেই। সেজন্য অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কাছে আপাতদৃষ্টিতে কোর্টের কাজ মনে হয় জুলুম। কিন্তু আপনাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রয়েছে। কনজিউমার প্রটেকশন অ্যাক্টে রিটেইলারদের একটি প্রটেকশন আছে। রিটেইলারের যদি প্রডিউসারদের সঙ্গে যোগসাজশ না থাকে, সরল বিশ্বাসে পণ্য বিক্রি করে, তাহলে রিটেইলারের এখানে শাস্তি পাওয়ার সুযোগ নেই। আপনারা রিটেইলার হিসেবে সে সুযোগ নিতে পারেন। আপনারা মনে করছেন, সামান্য ফরমালিন পাওয়া গেল তাতেই ৫ লাখ টাকা জরিমানা। কিন্তু ভোক্তার যে জীবন যাচ্ছে, তার মূল্য কত? বিশ্বের সব দেশে বিশেষ করে উন্নত দেশে খাদ্যনিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। এমনকি অভিযোগ প্রমাণ হলে এত বেশি জরিমানা করা হয় যে, অনেক সময় ব্যবসাটাই বসে যায়। কিন্তু আমরা সেটা চাই না। নতুন আইডিয়া ব্যবসায়ীরাই আনেন। আমরা সহযোগিতার চেষ্টা করছি।

 

সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল&dquote;&dquote;
কান্ট্রি ম্যানেজার, মাস্টারকার্ড
আমি খানিকটা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশে যাবতীয় লেনদেনের ৬ শতাংশ হয় ডিজিটালি। কিন্তু সুপারমার্কেটে ডিজিটাল লেনদেন হয় প্রায় ২৫-৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ সুপারমার্কেট সেক্টর বাংলাদেশের অন্যান্য খাতের চেয়ে ছয় গুণ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। তাই সুপারমার্কেটের স্ট্রাকচার রিটেইলকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। তাছাড়া প্রতিটি সুপারশপের সঙ্গে কোনো না কোনো মাস্টারকার্ড কোম্পানির সংযোগের বিষয়টি আপনারা লক্ষ করে থাকবেন। আমরা যেমন স্বপ্ন সুপারশপের সঙ্গে কাজ করি, তেমনি অন্যদের কেউ হয়তো আগোরা বা মীনা বাজারের সঙ্গে কাজ করেন। এ প্রসঙ্গে ভারতের কথা বলা যেতে পারে। সেখানে সবজিওয়ালা থেকে পান বিক্রেতাও কিন্তু ডিজিটালি পেমেন্ট নেন। তাদের এ অবস্থার পেছনে সরকারের ভূমিকা ছিল। আজ আমরা সুপারমার্কেট সেক্টর নিয়ে কথা বলছি। তাই বলব, এখানে ৪ শতাংশ ভ্যাট যোগ করার কস্ট টু দ্য কনজিউমার বেড়ে যাচ্ছে। প্রায় ৩০ শতাংশ হারে সুপারমার্কেট প্রবৃদ্ধি করছে, যা অন্য সেক্টরগুলোতে দুর্লভ। এ খাতকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। সেক্ষেত্রে ইনসেনটিভ প্রদান করলে সেক্টরটি আরো ভালো অবস্থানে যাবে। কার্ডের সেফটি ও সিকিউরিটি সম্পর্কে বলব, বাংলাদেশের প্রত্যেকটা ব্যাংক এ নিয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আগামী জুনের মধ্যে সব ব্যাংকের সব কার্ডে চিপ ও পিনযুক্ত করার জন্য নির্দেশনা রয়েছে। ফলে কেউ চাইলেও কার্ড ক্লোন করতে পারবে না।

 

মো. নুরুল ইসলাম&dquote;&dquote;
উপপরিচালক, বিএসটিআই
বিএসটিআইয়ের কাজ হচ্ছে পণ্যের স্ট্যান্ডার্ড ফরমুলেশন ও গুণগত মান নির্ধারণ। আমরা ১৬০টি পণ্যের গুণগত মান নির্ধারণ করি, যার মধ্যে ৬০টিরও বেশি ফুড প্রডাক্ট। বাকিগুলো নন-ফুড প্রডাক্ট। আগে যদিও বিএসটিআইয়ের অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছিল। আশার কথা, এরই মধ্যে বেশকিছুটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। যদিও আরো অগ্রগতি হওয়া দরকার। এরই মধ্যে ২১টি পণ্যের ক্ষেত্রে আমরা ভারতের সম্মতি পেয়েছি, যেগুলো বিএসটিআই অনুমোদনের পর ভারতে রফতানি হবে এবং তারা কোনো ধরনের পরীক্ষা করবে না। এদিকে সুপারমার্কেটে আগে যে পণ্যগুলো রাখা হতো, তাতে অনেক পণ্যের কোনো মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ থাকত না। ২০০৩ থেকে সাত-আট ধরনের পণ্যের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক মেয়াদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আমদানির ক্ষেত্রে ৫৫টি পণ্য আমরা অনুমতি দিই। বিএসটিআইয়ের ছাড়পত্র নিয়ে পণ্যগুলো কাস্টমস থেকে ছাড়িয়ে নিতে হয়। তবে কিছু কসমেটিকস পণ্য রয়েছে, যা আমদানির ক্ষেত্রে অনুমতি দিই না; ওগুলো কাস্টমসে আটকে যায়। কিন্তু যারা ওইসব পণ্যের আমদানিকারক, দেখা যায়, তারা অন্য কোনো উপায়ে কাস্টমসকে ফাঁকি দিয়ে পণ্যগুলো দেশে নিয়ে আসছেন। এ পণ্যগুলোতে বিএসটিআই কর্তৃক ট্যাগ লাগানো থাকে না। সুপারস্টোরগুলোর কাছে আমি অনুরোধ করব, বিএসটিআইয়ের ট্যাগবিহীন আমদানিকৃত এসব পণ্য যেন তারা স্টোরগুলোতে না রাখে। কারণ পরে যখন আমরা সুপারস্টোরে গিয়ে ট্যাগবিহীন এসব পণ্য খুঁজে পাই, তখন তারা বিপদে পড়েন।

 

মাসুম আরেফিন&dquote;&dquote;
সহকারী পরিচালক
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর
আমাদের কাছে যে ভোক্তারা অভিযোগ দিতে আসেন, তাদের বেশির ভাগের দাবি, তারা সুপারশপগুলোতে গিয়ে সঠিক সেবাটা পাচ্ছেন না। এক্ষেত্রে সুপারশপ কর্তৃপক্ষ যদি তাত্ক্ষণিক কাস্টমারদের অভিযোগ আমলে নেয়, তাহলে কিন্তু ক্রেতাদের অভিযোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসতে হয় না। এতে সুপারশপের সার্বিক ব্যবস্থাপনাগুলোও ভালোভাবে চলে। আলোচনার এ পর্যায়ে জরিমানার প্রসঙ্গে বলব, গত নয় বছরে আমরা মাত্র ৩১ কোটি টাকা জরিমানা করেছি। গোটা পরিস্থিতি বিবেচনায়  এটা আমাদের ব্যর্থতা। আমরা কিন্তু জরিমানা করতে চাই না। সুপারশপগুলো যদি আইন অনুযায়ী কাজ করে, তাহলে কেন তাদের জরিমানা করব? তাছাড়া জরিমানার এ অর্থ দিয়ে সরকারের বাজেটে তেমন কোনো সংযুক্তি হয় না। এটা আমাদের বাজেটে তলানি মাত্র। কিন্তু জরিমানাটা এ কারণে করা হয়, যাতে আমাদের নিয়ন্ত্রণটা বজায় থাকে। 

 

আশরাফ বিন তাজ&dquote;&dquote;
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইন্টারন্যাশনাল ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বাংলাদেশ
আমি দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে বলব। একটা হচ্ছে, আরবান ইকোনমিতে সুপারমার্কেটের ভূমিকা। এ পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশের রিটেইল মার্কেটে সুপারমার্কেটের প্রবৃদ্ধি ৩০ শতাংশ, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে যা শতভাগের ঘরে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের দিকে তাকালে আমরা রিটেইল সেক্টরের পরিবর্তন সম্পর্কে ধারণা পাব। রিটেইলের ক্ষেত্রে এখন আমরা শুধু সুপারমার্কেট নিয়ে বলছি। আজকের গোলটেবিলে অনেকে উপস্থিত রয়েছেন। আপনারা যদি শতভাগ সহযোগিতা দিতে পারেন এবং আমাদের সাপোর্ট সার্ভিসকে যদি আরো বেশি যুগোপযোগী করা যায়, তাহলে ফ্যাশন, ফুটওয়্যার, ইলেকট্রনিকসের ছোট ছোট দোকান থেকে স্ট্রাকচার রিটেইলে চলে আসতে শুরু করেছে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় সমর্থন আসতে হবে। এবার আমি সুপারমার্কেটের পক্ষ নিয়ে বলতে চাই যে, এখানেই কিন্তু সবচেয়ে বেশি এনফোর্সমেন্টগুলো হয়। সরবরাহকারী হিসেবে আমি গ্রামীণ এলাকা থেকে খুচরা দোকানগুলোতে যেমন যাই, তেমনি সুপারমার্কেটেও যাই। কিন্তু পণ্য সরবরাহকারী হিসেবে ভ্যাটের চালানসহ সুপারমার্কেট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাকে বিভিন্ন ধরনের সনদ সরবরাহ করতে হয়। তাই আমি বলব, একজন সাধারণ ভোক্তা কিন্তু সুপারমার্কেটেই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। তারাই ভোক্তাদের হাতে মানসম্পন্ন পণ্য তুলে দিতে সরবরাহকারীর সঙ্গে আলোচনা করে। তাই মানসম্মত পণ্য ক্রয়ের জন্য সুপারমার্কেট একটা ভালো জায়গা। যারা ক্রেতাদের মানসম্মত সেবাও দিতে পারে। খাদ্যের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সুপারমার্কেটগুলোর কাছে আমি অনুরোধ করব, আপনারা সরবরাহকারীদের সব ধরনের সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা রাখবেন। ভোক্তার হাতে আপনারা সঠিক পণ্যটি তুলে দিচ্ছেন, তা নিশ্চিত করুন। এদিকে পণ্যের মান নিয়ে যেকোনো ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে সুপারমার্কেটকে দায়ী করা হয়। তাদের ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট বসানো হয়। এখানে সুপারমার্কেটগুলো সবসময় দায়ী নয়, কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহকারীরাও দায়ী। যদিও সার্বিক অর্থে সুপারমার্কেট তার দায় এড়াতে পারে না।

 

মোহাম্মদ মাহফুজুল হক&dquote;&dquote;
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ
খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের ক্ষেত্রে আগে যেখানে শুধু অভিযুক্তকে জেল-জরিমানা করতাম, বর্তমানে আমরা মানসম্পন্ন খাদ্য সরবরাহ করার ক্ষেত্রে কীভাবে তা উৎপাদন, সরবরাহ ও পরিবেশন করতে হবে, সে সম্পর্কে ব্যক্তিদের অবহিত করছি। আমরা নিরাপদ খাদ্যের বিশাল চাহিদা তৈরি করতে চাচ্ছি এবং সে চাহিদা মোকাবেলার জন্য প্রতিষ্ঠান ও খাদ্য ব্যবসায়ীরা যেন যোগ্যভাবে গড়ে ওঠে, সেজন্য আমরা তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। যদিও অনুমাননির্ভর কিছু বিষয় রয়েছে। যেমন ফরমালিন নিয়ে আমাদের কিছু বিভ্রান্তি আছে। আপেলে প্রকৃতিগতভাবেই ফরমালিন থাকে। এছাড়া শাকসবজি কিংবা ফলমূলে ফরমালিন দিলেও তা কাজ করে না। তবে অ্যানিমেল অরিজিনেটেড প্রোটিনজাতীয় খাদ্যে ফরমালিন বন্ডিংস তৈরি করে। ভেজাল ডিম, মিনিকেট চাল খেলে ক্যান্সার হয়, আপেলে ফরমালিন— মানুষের মাঝে এমন সব ভুল ধারণা ছড়িয়ে গেছে। ফলে অনেকেই ফল-শাকসবজি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। আমাদের বাজারে যেসব ফল, সবজি পাওয়া যায়, তার বেশির ভাগই কিন্তু নিরাপদ। তাছাড়া ফরমালিন পরিমাপক বেশির ভাগ যন্ত্রই ছিল ত্রুটিপূর্ণ। অধিকাংশ খাদ্যপণ্যে প্রাকৃতিক ফরমালিন থাকে। এখন যদি একটি ডিটেক্টিভ কিট দিয়ে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ এর মাধ্যমে ফরমালিন পরিমাপ করা হয়, তাহলে তা ভুল হবে। আর এভাবে পরিমাপ করে শাস্তি দেয়াটাও অন্যায়।  পিওর ফুড রুলস-১৯৬৭-এর অধীনে ১০৫টি পণ্যের মানদণ্ড দেয়া আছে; যা অনেক ব্যাকডেটেড ও অচল। পাশাপাশি বিএসটিআইয়ের মানদণ্ড যেগুলো রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশ বাধ্যতামূলক নয়, স্বেচ্ছাচালিত বা ঐচ্ছিক। আমাদের নিরাপদ খাদ্য আইনের শাস্তিগুলো খুব কড়া এবং এখানে ৩ লাখ টাকার নিচে কোনো জরিমানা নেই। সব মিলিয়ে সমস্যা তৈরি হয়। এ সমস্যা সমাধানে আমরা বিএসটিআই মানদণ্ড অনুসরণের জন্য সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছি। কারণ পিওর ফুড রুলসের চেয়ে বিএসটিআইয়ের মানদণ্ড বেশি হালনাগাদ। জনসাধারণকে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে আমরা বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। প্রতিষ্ঠানের লোকদের আমরা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি, খাদ্য প্রস্তুতের ক্ষেত্রে উত্কৃষ্ট পদ্ধতি অনুশীলনের জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করেছি এবং কৃষি, মত্স্যসহ বিভিন্ন অধিদপ্তরকে আমরা গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য সরবরাহের বিষয়টি অবহিত করেছি। সঠিক তাপমাত্রায় না রাখার কারণে আমাদের দেশের বেশির ভাগ খাদ্যদ্রব্যে দূষণ ঘটে। সিটি করপোরেশন ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সঙ্গে ঢাকার কয়েকটি মার্কেটকে হেলদি মার্কেট হিসেবে তৈরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।  আমাদের সঙ্গে হোটেল-রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, এফবিসিসিআই ও ঢাকা সিটি করপোরেশন রয়েছে। আমরা খাদ্যদ্রব্য টেস্টিং, ইন্সপেকশন ও সার্টিফিকেশনের ক্ষেত্রে তৃতীয় পক্ষের কথা ভাবছি। আমাদের পরীক্ষাগারের বেশির ভাগ প্যারামিটারের স্বীকৃতি নেই। দেখা যায়, একই দ্রব্যের পরীক্ষার ফলাফলে একটি ল্যাবরেটরির সঙ্গে অন্যটির বিস্তর পার্থক্য হচ্ছে। তাই এখানে আমরা তৃতীয় পক্ষের অন্তর্ভুক্তিতে একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ শুরু করতে চাই। সঠিক পরিমাপের জন্য ল্যাবরেটরিগুলো পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে, তাহলে আমরাও তাদের ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে পারব। পরিশেষে বলব, আমাদের সুপারমার্কেটগুলো যেভাবে উন্নতি করছে এবং তারা যে উদ্যোগগুলো গ্রহণ করছে, তাতে আমরা খুবই আনন্দিত। অনেকে কৃষকের সঙ্গে চুক্তি করে সরাসরি তাদের কাছ থেকে পণ্য নিচ্ছে, পণ্য কিনতে অগ্রিম বরাদ্দ দিচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগে ভোক্তার পাশাপাশি কৃষকরাও উপকৃত হন। সুপারমার্কেটগুলোর কাছে সঠিকভাবে তাপমাত্রা নির্ধারণের ব্যাপারে আমার অনুরোধ থাকবে। আমরা নিরাপদ খাদ্যের বিশাল চাহিদা তৈরি করছি। সে চাহিদা মোকাবেলা করবে সুপারশপগুলো।

 

সামসুদ্দোহা শিমুল&dquote;&dquote;
চিফ অব সেলস অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স এসিআই লজিস্টিকস (স্বপ্ন)
আমি সুপারমার্কেটের সেবা নিয়ে কথা বলতে চাই। সেবা পুরোটাই আপেক্ষিক একটি বিষয়। এক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত উন্নতি করতে হয়। আমরা যারা সুপারশপে কর্মরত, সেখানে প্রতিনিয়ত আমাদের মানবসম্পদ বিভাগসহ অন্য যারা কাজ করেন, তারা সেবার ক্ষেত্রগুলোকে উন্নতির চেষ্টা করছেন। অন্যদের তুলনায় সুপারমার্কেট ক্রেতাদের অনেক ভালো সেবা দিয়ে থাকে। পণ্যের গুণগত মান, নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে নিশ্চিত করে। স্বপ্ন সুপারমার্কেটে প্রতিদিন ৪০ হাজার ক্রেতা আসেন। সেখানে আমরা ১০-১২ জন ক্রেতার পক্ষ থেকে অভিযোগ পেয়ে থাকি। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সঙ্গে কথা বলি এবং সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা করি।

 

এমএ মান্নান&dquote;&dquote;
অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
বাংলাদেশ সুপারমার্কেটের প্রবৃদ্ধিটা আমাকে ভীষণ অনুপ্রাণিত করেছে।  সুপারমার্কেটের অগ্রগতি, প্রবৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তর্ক করার কোনো সুযোগ নেই। আজকের আলোচনায় কিছু সমস্যার কথা উঠে এসেছে। আমরা পরবর্তীতে সেসব বিষয় নিয়ে আরো বেশি সচেতন হব। এক্ষেত্রে আমি নিজের দু-একটি মন্তব্য যোগ করতে চাই। যেমন— কয়েক বছর আগে আমাদের দেশে ফরমালিন নিয়ে ব্যাপক সমস্যা সৃষ্টি হয়। তখন আমি নেপাল, ভারত বা অন্য কোথাও গিয়ে ফরমালিন নিয়ে কোনো কথা শুনতে পেতাম না। আমার মনে হতো, তাহলে সব ফরমালিন কি শুধু বাংলাদেশের জন্যই বানানো হয়! পরবর্তীতে আমরা ফরমালিন-বিষয়ক ভ্রান্ত ধারণা এবং এ-বিষয়ক সমস্যা সমাধানে সফল হয়েছি। তাছাড়া আমাদের দেশে ভোক্তা অধিকার আইন রয়েছে এবং আইনের প্রয়োগ হচ্ছে। আমি আশা করছি, পরবর্তী প্রজন্ম এ সম্পর্কে আরো বেশি ধারণা রাখবে। এক্ষেত্রে ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণীর পাঠ্য বইয়ে যদি ভোক্তা অধিকার আইন-বিষয়ক একটি অধ্যায় সংযোজন করে দেয়া হয়, তাহলে নতুন প্রজন্ম আরো বেশি সচেতন হবে এবং বিষয়টি সম্পর্কে তারা অবগত থাকবে। স্ট্রিট ফুড প্রসঙ্গে বলব, অন্যান্য দেশের মতো আমাদের ফুটপাতে, রাস্তার পাশের দোকানগুলোতে বিভিন্ন ধরনের খাবার পাওয়া যায়। তাছাড়া আমাদের নিজেদের ঐতিহ্যগত অনেক খাবার রয়েছে, যেগুলো আমরা আরো পরিচিত করতে পারি। তবে পার্থক্য হলো, আমাদের রাস্তার পাশের খাবারগুলো স্বাস্থ্যসম্মত নয়। আশা করি, খাবারগুলোর মান, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ইত্যাদি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজর দেবে। ভ্যাট সম্পর্কে বলব যে, আমাদের ভ্যাট বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সবার কাছ থেকে সঠিকভাবে তা সংগ্রহ করতে হবে। ইউরোপে সানডে মার্কেট বলে সাপ্তাহিক মার্কেট বসে। সেখানে কম দামে জিনিসপত্র পাওয়া যায়। আমি দেখেছি, ছোট ছোট ওই দোকানগুলোও মেশিন ব্যবহার করছে এবং ক্রেতাকে তারা ক্রয় বাবদ রিসিট দিয়ে দিচ্ছে। আমরা হয়তো একদিনে এ অবস্থায় যেতে পারব না, তবে এখন থেকে শুরু করা যেতে পারে। এনবিআর এ নিয়ে কাজ করছে। আগামীতে এক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধিত হবে। এখানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (ভ্যাট) কমিশনার, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালকসহ অনেকেই উপস্থিত আছেন; আপনারা সবাই মিলে আগামীতে সমস্যাগুলো সমাধান করে কার্যকর পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবেন। সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা আরো বেশি অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হব।

শ্রুতিলিখন: সাঈদ সরকার ও রুহিনা ফেরদৌস
আলোকচিত্রী: কে. কে. নয়ন