কলকাতার বেকার হোস্টেল। ২৪ নম্বর রুমটি অধিকাংশ দিনই বন্ধ থাকে। কেবল বাংলাদেশ হাইকমিশন অনুমতি দিলেই খোলা হয় কক্ষটি। দর্শকরা শ্রদ্ধা জানাতে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি। মুজিব বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপকার। তারুণ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু তিনি কাটিয়েছেন ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র হিসেবে। ইসলামিয়া কলেজ বর্তমানে পরিচিত মৌলানা আজাদ কলেজ নামে। এ কলেজে থাকা অবস্থাতেই বিপ্লবের বীজ বপিত হয় তরুণ মুজিবের মধ্যে। 

বেকার হোস্টেলের সে অপ্রশস্ত ও অপরিচ্ছন্ন কক্ষটি আজ সুরক্ষিত জাদুঘর। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্য। তার চারপাশ ঘিরে রয়েছে বেশকিছু ফটোগ্রাফ। ফটোগ্রাফির অধিকাংশই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে, যিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। বাম পাশে একটা ছোট কক্ষে অবস্থিত সরু বিছানা। সেই বিছানার ওপর সাদা চাদর। তারও পাশে একটা বড় জানালা। কাঠে নির্মিত টেবিলভর্তি মুজিবের জীবন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মতো কিছু বিষয়াবলি নিয়ে লেখা বই। ডেস্কের ঠিক ওপরের দিকে তরুণ সময়ের একটা অতিকায় পোর্ট্রেট। 

১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সময় কলকাতায় ব্যয় করেন মুজিব। যদিও একদিক থেকে সময়টা খুব কম। কিন্তু এটা একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। কলকাতায় অবস্থানকালে মুজিব জড়িত ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে। সেই দিনগুলো পুনর্গঠনে সাহায্য করেছে তার রাজনৈতিক আদর্শ। জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে তিনি প্রায়ই কলকাতা ও সেখানকার সঙ্গীদের কথা স্মরণ করেছেন। 

মুজিব ১৯৪২ সালে তার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন। তার বয়স তখন ২২ বছর। এ সময়টিতে তিনি মুহম্মদ আলি জিন্নাহর রাজনৈতিক মতবাদ ও পাকিস্তান আদর্শে দারুণভাবে প্রভাবিত ছিলেন। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে তিনি ভর্তি হন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে। তখন অধিকাংশ মুসলিম পরিবার তাদের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার জন্য সেখানে প্রেরণ করতেন। বঙ্গবন্ধুর কলকাতা জীবন বইয়ে ঐতিহাসিক তাসনিম আলম তার বেকার হোস্টেলের জীবনের ওপর আলোকপাত করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘হোস্টেলে থাকার সময় তার বাবা তাকে মাসে ৭৫ টাকা দিতেন। সেই টাকা দিয়ে রুমমেট ও শৈশবের বন্ধু শাহাদাত হোসেনকে সহযোগিতা করতেন বঙ্গবন্ধু। বন্ধু শাহাদাত হোসেন দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছিলেন। সে সময়ে মুজিবের পরিবারও অনেকটা অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। যে বছর তিনি ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হলেন, সে বছরই তার বাবা অবসর গ্রহণ করেন। পরিবারের ওপর যেন অর্থনৈতিক বোঝা চেপে না বসে, এজন্য পরবর্তী সময়ে তিনি পার্ক সার্কাসে একটি হোটেল বিজনেস শুরু করেন।’ 

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও শেখ মুজিবুর রহমান: ফ্রম রেবেল টু ফাউন্ডিং ফাদার গ্রন্থের লেখক সৈয়দ বদরুল আহসান বলেছেন, ‘ছাত্রজীবন থেকেই শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি বেড়ে উঠেছিল। দেশ ভাগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি তার মুসলিম ও হিন্দু সহপাঠীদের বোঝাতে সক্ষম হন।’ 

প্রায় প্রতিদিনই দেখা যেত মুজিব ক্যাম্পেইন করছেন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের অধীনে। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সোহরাওয়ার্দীর নাম। তখনকার দিনের এমন একটা ঘটনা ছিল ছিল শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের বিরুদ্ধে মুসলিম লিগের ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ। হক সাহেব জিন্নাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সঙ্গে কোয়ালিশন গঠন করেছিলেন। 

সোহরাওয়ার্দী ছাড়াও মুজিব প্রবলভাবে প্রভাবিত ছিলেন অন্য এক রাজনীতিকের দ্বারা। তিনি সৈয়দ বদরুদ্দোজা। কলকাতার সাবেক মেয়র ছিলেন, বক্তা হিসেবেও দুর্দান্ত। তার বাসা ছিল কলকাতার পার্ক সার্কাস অঞ্চলে ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেনে। তরুণ মুসলমানরা প্রায়ই তার কাছে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শের জন্য যেতেন। মুজিবও যেতেন প্রায়ই। শেরেবাংলাকেও শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন মুজিব। যদিও শেরেবাংলার জিন্নাহ বিরোধিতার সঙ্গে তিনি সম্মত ছিলেন না। 

১৯৪৩ সালে বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। কলকাতার রাস্তায় মারা যাচ্ছিল হাজারো মানুষ। সেখানে ত্রাণ সরবরাহে সামনের সারিতে ছিলেন মুজিব। তার আত্মজীবনীতে তিনি বলেছেন, ‘এ সময় শহীদ সাহেব লঙ্গরখানা খোলার হুকুম দিলেন। আমিও লেখাপড়া ছেড়ে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম। অনেকগুলি লঙ্গরখানা খুললাম। দিনে একবার করে খাবার দিতাম। মুসলিম লীগ অফিসে, কলকাতা মাদ্রাসায় এবং আরো অনেক জায়গায় লঙ্গরখানা খুললাম।’ 

কলকাতায় দাঙ্গা হয় ১৯৪৬ সালে। সেখানে মুসলিম ও হিন্দু উভয়ের জন্যই ত্রাণ সরবরাহ করেছেন মুজিব। মুজিব তুলে ধরেছেন, কীভাবে ইসলামিয়া কলেজে সাধারণ মানুষ ও শিশুদের উদ্ধারের আহ্বান পৌঁছাত, সেই কথা। সে সময় মুসলিম লীগের অফিস ও বেকার হোস্টেলের ভবন পরিণত হয় শরণার্থী শিবিরে। ইসলামিয়া কলেজের গেট খুলে রাখা হয় হামলা থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের জন্য। পরবর্তী সময়ে মুজিব কলকাতা মাদ্রাসার গেটও খোলা রাখার ব্যবস্থা করেন একই কারণে। কলকাতায় দাঙ্গা শেষ হলেই ঢাকা ও নোয়াখালীতে দাঙ্গা লাগে। যদিও তিনি সে সময় ছাত্রনেতা। তার পরও কলকাতা, ঢাকা, নোয়াখালী ও বাংলার অন্যান্য অংশের দাঙ্গা বন্ধের জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গ দিয়েছেন।

দেশ ভাগের আগে আগে তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও বাঙালি রাজনীতিকরা একটা বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলেন। তারা এমন এক অবিভক্ত বাংলার প্রস্তাব তুলে ধরেন, যা ভারত ও পাকিস্তান থেকে মুক্ত থাকবে। মুজিব নিজেও এ অবিভক্ত বাংলা আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। তাদের এ আন্দোলন ব্যর্থ হয় ১৯৪৭ সালের আগস্টে। ভারতের পূর্ব আর পশ্চিম অংশ নিয়ে তৈরি হয় পাকিস্তান। এদিকে মুজিবের বিএ ডিগ্রিও ততদিনে সমাপ্ত হয়েছে। তিনি কলকাতা ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। তার গ্রেফতার হওয়ারও ভয় ছিল। তিনি তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমাদের পক্ষে কলকাতা থাকা সম্ভবপর না, কারণ অনেককে গ্রেফতার করেছে। জহিরুদ্দিনের বাড়ি তল্লাশি করেছে। আমরা ধরা পড়লে ছাড়বে না।’ 

সেখান থেকে ফিরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। যদিও তা তিনি সমাপ্ত করতে পারেননি। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে জিন্নাহ উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। সেখান থেকেই শুরু হয় মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের পরবর্তী ধাপ। সেখান থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল আদর্শিক কেন্দ্র। এটা বাংলাদেশের জন্মের পেছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৪৭ সালের আগে পর্যন্ত অনেক মুসলমানই মনে করেছিল কলকাতা পাকিস্তানের অংশ হবে। মুজিব নিজেও তাদের একজন ছিলেন। তবে এ ব্যাপারে তিনি সরব ছিলেন না। অনেক বছর পরের কথা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের মুখোমুখি হন বঙ্গবন্ধু। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা মিলে কখনো যুক্ত বাংলা গঠনের ইচ্ছা আছে কিনা। প্রশ্ন শুনে মুজিব কয়েক সেকেন্ড সময় নেন। তারপর বলেন, ‘আমি আমার বাংলাদেশ নিয়ে সন্তুষ্ট’।

[দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত লেখকের Mujib in Calcutta: Five years of political activism that later spawned Bangladesh শীর্ষক নিবন্ধের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ করেছেন আহমেদ দীন রুমি]