বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের জন্য বিশ্বদরবারে যতটা নন্দিত নেলসন ম্যান্ডেলার দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা, ঠিক ততটা বা তার চেয়ে বেশি নিন্দিত অপরাধপ্রবণতার কারণে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমিখ্যাত দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও খুবই চমত্কার একটি দেশ। যে কেউ চাইলে খুব সহজে এ দেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। স্বল্প পুঁজি দিয়ে গড়ে তোলেন নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। যেখানে নিজের যেমন রুটি-রুজির ব্যবস্থা হয় ঠিক তেমনি করতে পারেন অন্যের কর্মসংস্থান। তাই প্রবাসী বাংলাদেশীরা অনিরাপদ দেশ জানা সত্ত্বেও দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান।

দক্ষিণ আফ্রিকার এতসব সুযোগ-সুবিধা মুহূর্তেই দুঃস্বপ্ন হয়ে যায় খুন-গুম, চুরি-ডাকাতির কারণে। যেখানে সেখানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হানা দেয় ডাকাত দল। রাস্তায় চলার পথে পড়তে হয় ছিনতাইকারীর কবলে। চাহিদামতো অর্থ না পেলে গুলি করে হত্যা করা হয় প্রবাসী বাংলাদেশীদের। মুহূর্তেই স্বপ্ন বিলীন হয়ে যায় মরণঘাতী বুলেটে।

এখানেই শেষ নয়। এর মধ্যে রয়েছে গুমের ঘটনা। কিছু অসাধু বাংলাদেশী স্থানীয় ও অন্যান্য দেশের নাগরিকদের সহযোগিতায় অপহরণ করে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের। চাওয়া হয় মোটা অংকের মুক্তিপণ। চাহিদা অনুযায়ী অর্থ দিতে না পারলে দিয়ে দিতে নিজের জীবন।

সম্প্রতি কেপটাউন থেকে অপহরণ হওয়া আকতার প্রধানের রোমহর্ষক নির্যাতনের ভিডিও দেশ-বিদেশের মানুষের হূদয় ভেঙেছে। দেড় মাস আগে জোহানেসবার্গের ফোর্ডসবার্গে নিজ দোকান থেকে অপহূত আরেক ব্যবসায়ী সালাহ উদ্দিনের আজও খোঁজ মেলেনি। প্রতিনিয়ত অপহরণ আতঙ্কে ভুগছেন এখানকার প্রবাসীরা।

এছাড়া সম্প্রতি পারমিট সমস্যায় ভুগছেন অনেক প্রবাসী। হোম আফেয়ার্স থেকে যথাযময়ে দেয়া হচ্ছে না এক্সটেনশন। এতে প্রতিনিয়ত পুলিশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে প্রবাসী বাংলাদেশীদের।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশীরা বসবাস করছেন নব্বইয়ের দশক থেকে। বর্ণবাদবিরোধী অবিসংবাদিত প্রয়াত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯৯৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশীরা দেশটিতে পাড়ি জমাতে থাকেন। বর্তমানে প্রায় দেড় লাখ বাংলাদেশী রয়েছেন দেশটিতে। অবৈধ তেমন নাই। বৈধই বলা যায়। প্রধান পেশা ব্যবসা। জোহানেসবার্গ, কেপটাউন, ডারবান, ব্লুমফন্টেইনসহ ছোট-বড় শহরগুলোতে ছড়ানো ছিটানো আছে বাংলাদেশীরা। তবে জোহানেসবার্গ, কেপটাউন এবং ব্লুমফন্টেইনে সবচেয়ে বেশি।

বর্তমানে বাংলাদেশীদের আগমন হ্রাস পেয়েছে। কারণ আগের মতো নতুনদের এখন এসাইলাম হয় না। তবে এ দেশ ছেড়ে কিছুসংখ্যক লোক আমেরিকা, ইউরোপে চলে যাচ্ছে। অনেকে ফিরে যাচ্ছেন বাংলাদেশে। প্রতি বছর গড়ে শতাধিক লোক এ দেশে বিভিন্নভাবে মারা যায়। বিশেষ করে ডাকাতের গুলিতে। বিচার বলতে এখানে কেউ মারা গেলে সাধারণত তার আত্মীয়স্বজন মামলার বাদী হন না। পুলিশ বাদী মামলা হয়। একসময় খালাসও পেয়ে যায়। তবে মামলার পেছনে লেগে থাকলে বিচার পাওয়া যায়। এমন ঘটনাও কয়েকটি আছে।

সুদীর্ঘ ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশীরা এ দেশে বসবাস করে এলেও নিজেদের শক্ত কোনো অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। কূটনৈতিকভাবেও কার্যকর কোনো সম্পর্ক স্থাপন করা যায়নি। এটিকে বড় ব্যর্থতা মনে করেন এখানকার সাধারণ প্রবাসীরা।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশীদের প্রধান পেশা ব্যবসা। এখানকার মোট প্রবাসীর ৯০ ভাগের বেশি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কেউ দোকানের মালিক আবার কেউ ওইসব দোকানের কর্মচারী। তবে বর্তমান সময়ে দেশটিতে ব্যবসার আকাল চলছে। দোকান ভাড়া এবং কর্মচারীর বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এতসব ঝামেলা মিটিয়ে প্রবাসীরা কি আদৌ দেশটিতে বসবাস করতে পারবেন? এমন প্রশ্ন প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে প্রবাসীদের হূদয়ে।

 

নুরুল আলম: দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত গণমাধ্যমকর্মী