উনিশ একাত্তরের ৩ থেকে ২৬ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাদের ক্রাকডাউন চালানোর ফলে হাজারো বাঙালি তখন ভারতে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাতে শুরু করে। অত্যাচারিত ও নির্যাতিত মানুষের ঢল নামে। ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকা শরণার্থীদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে ভারত সরকার।
এপ্রিলের শুরুতে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এসএইচএফ জে মানেকশ আমাকে অবহিত করেন, ভারত সরকার চাইছে আমাদের সেনারা অবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করুক। আমি উনাকে বলি, এটা অসম্ভব। কারণ আমাদের কাছে যে সেনাদল রয়েছে তারা পার্বত্য এলাকায় অভিযান চালাতে পারদর্শী। মাউন্টেন ডিভিশনের এ বাহিনী মোটেই নদীতীরস্থ অঞ্চলে যুদ্ধ চালাতে পারদর্শী নয়। তাছাড়া ঢাকায় পৌঁছতে আমাদের অনেকগুলো নদী পাড়ি দিতে হবে। এর মধ্যে অনেক নদী রয়েছে, যেগুলো প্রশস্ত এবং পারাপারের জন্য কোনো সেতু নেই। উপরন্তু বর্ষা ঋতু শুরু হতে যাচ্ছে। আমাদের কাছে উপযোগী তেমন যানবাহনও নেই (যা আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য) তাই আমাদের পক্ষে এখন যাত্রা করাও সম্ভব নয়।
আমার কথা শুনে মানেকশ বলেন, তিনি পরবর্তী খবর নিয়ে আসছেন। পরের দিন তিনি আমাদের এখানে আসেন এবং আমাকে বলেন, ‘ওপর থেকে আমাকে ভীত ও কাপুরুষ বলে অভিযুক্ত করেছে।’ প্রত্যুত্তরে আমি বলেছিলাম, ‘আপনি তাদের জানিয়ে দেন, ‘সিদ্ধান্তটা তো আপনার নয়, ইস্টার্ন কমান্ড-ই অগ্রসর হতে চাচ্ছে না।’
প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে মানেকশ জানতে চাইলেন, ‘তোমাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে কী ঘোড়ার ডিম করতে হবে?’ আমি বলেছিলাম, ‘নদী পারাপারের জন্য যোগাযোগ সেতুর বন্দোবস্ত করা, সঙ্গে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আর প্রশিক্ষণের জন্য যথেষ্ট সময় এবং সময়টা কখনই ১৫ নভেম্বরের আগে নয়।’ ভ্রু কুঁচকে তিনি এসবের কারণটা জানতে চাইলেন। আমি উত্তর দিলাম, ‘১৫ নভেম্বর নাগাদ ভূমিগুলো শুকিয়ে যাবে এবং আমরা তখন যেতে পারব। তাই।’ এরপর মানেকশ ইন্দ্রিরা গান্ধী এবং ক্যাবিনেটের অন্য সদস্যদের বিষয়টি অবহিত করেন।
আমরা জানতাম যে, অচিরেই আমরা একটি যুদ্ধের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। তাই আমি পূর্ব পাকিস্তান জয়ের জন্য ছক তৈরি শুরু করি। আমি জানতাম পাকিস্তানি সেনারা শহরগুলোকে রক্ষা করতে চাইবে। তাই আমার পরিকল্পনার মূল ছকে ঢাকাকে অগ্রাধিকার দিই। যুদ্ধকৌশলে ঢাকা ছিল আমাদের প্রধান এবং চূড়ান্ত লক্ষ্যবস্তু। তাছাড়া ভূরাজনৈতিক ও ভূকৌশলগতভাবে ঢাকা পূর্ব পাকিস্তানের প্রাণকেন্দ্র। তবে প্রতিটি সেক্টরের সঙ্গে যেমন যশোর, আমরা যোগাযোগ তৈরির পরিকল্পনা করি।
আমরা শহরগুলোকে বাদ দিয়ে বিকল্প রাস্তা ধরে সরাসরি ঢাকায় পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নিই। এছাড়া আমরা কোনো একক শহর অধিকৃত করার পথে হাঁটিনি, কারণ এ ধরনের কাজগুলো নিতান্তই সময়সাপেক্ষ। আমি জানতাম, যুদ্ধটা খুব বেশি দীর্ঘ হবে না। আরো জানতাম, এ ব্যাপারে জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য থাকবে। তাই আমি ছোট ছোট শহর অধিগ্রহণে সময় নষ্ট করার পক্ষে ছিলাম না।
তাছাড়া বাস্তবে আমরা দেখেছি, ইরাকের ফালুজা শহর দখল করতে আমেরিকার কতটা সময় লেগেছিল! তাই আমাদের পরিকল্পনা ছিল, বিকল্প রাস্তা দিয়ে প্রতিরোধ করতে করতে ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়া।
এদিকে ক্রমেই শরণার্থীদের ঢল আসছে। তাজউদ্দীন আহমদ (আওয়ামী লীগের নেতা এবং বাংলাদেশের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী) এবং অন্যরা তখন কলকাতায় উপস্থিত ছিলেন। আমি তাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রাথমিক খসড়া তৈরিতে সাহায্য করেছিলাম। তাদের হাতে আমি মোটামুটি গোছের একটি খসড়া তুলে দিয়েছিলাম। তারা পরবর্তী সময়ে ওটি ঘষামাজা করে চূড়ান্ত রূপ দিয়েছিলেন।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করার আদেশ ছিল। সীমান্ত এলাকাগুলোয় আমরা ক্যাম্প স্থাপন করি এবং বিভিন্ন ‘এজেন্সি’র সহযোগিতায় তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র সরবরাহ করা হয়। মুক্তিবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়ন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা এমন কিছু পরিবেশ তৈরি করে যার ফলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অনেকটা কোণঠাসা হয়ে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর অংশগ্রহণ ও অবদান অনেক বিশাল। তারা মূলত পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থাগুলো ভেঙে তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দিয়ে আমাদের কাজটাকে অনেক বেশি সহজ করে দেয়।
প্রসঙ্গত, ব্রিগেডিয়ার কমান্ডার এবং ১২তম ডিভিশনের জেনারেল কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব পালনের সময় আমি মরুভূমির যুদ্ধকৌশল নিয়ে ১৯৬৯ সালে একটি বই লিখেছিলাম। বইটি পরবর্তী সময়ে সেনাদের প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যাহোক, যুদ্ধের সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন রসদ পৌঁছে দেয়ার জন্য ভারতের সেনাবাহিনী পাকা সড়ক ব্যবহারে উত্সাহী ছিল। আমি বলেছিলাম, চিন্তাটা জঘন্য। আমাদের বিকল্প রাস্তা দিয়ে যেতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য একটি রাস্তা নির্মাণ করতে হবে। নিজেদের তৈরি রাস্তা দিয়েই আমরা যাব। কিছুদিনের মধ্যেই যোগাযোগের প্রধান রাস্তা খুলে দেয়া হবে। বিকল্প সড়কের ওপর আমাদের দীর্ঘসময় নির্ভর করতে হবে না।
মূল সমস্যাটা ছিল সরবরাহ-সংক্রান্ত, যা যুদ্ধ জয়কে জটিল করে তুলছিল। ১৯৭১ সালের মে মাসে, ওপর মহল থেকে কোনো ধরনের আদেশ কিংবা আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকে কোনো ধরনের নির্দেশনাপ্রাপ্তির আগেই আমি ত্রিপুরায় সেনাঘাঁটি তৈরি করতে শুরু করি। তুরাসহ অন্য সীমান্তগুলোয় আমাদের কার্যক্রম শুরু হয়। মূলত মে মাসের দিকেই আর্মি হেডকোয়ার্টারে আমি একটি নকশা তৈরি করে পাঠাই। যেখানে ঢাকাকে চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করে বিভিন্ন স্থানে সৈন্য পাঠানোর বিষয়টিও উল্লেখ করি। তারা কিছুটা সময় নেয়। আগস্টের দিকে জেনারেল মানেকশ এবং সামরিক অপারেশনের পরিচালক কে কে সিংহ উপস্থিত হন এবং আমাদের পরবর্তী নির্দেশনা প্রদান করেন।
লিখিত আকারের এ নির্দেশনাটি ছিল অলঙ্ঘনীয় ও অপরিবর্তিত। সেখানে আরো লেখা ছিল যে, আমাদের কাজ হবে প্রথমে চট্টগ্রাম ও খুলনা দখল করা এবং ক্রমেই ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাওয়া। এবং এটি ছিল চূড়ান্ত আদেশ।
আমি দ্বিমত পোষণ করে জানাই, আমাদের প্রথমে ঢাকার ওপর দখল প্রতিষ্ঠা করাটাই হবে যুক্তিযুক্ত। কিন্তু আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলা হয় খুলনা ও চট্টগ্রাম দখলের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি টানা সম্ভব। যাহোক, আমাদের যে নির্দেশনা প্রদান করা হয়, সেখানে কিন্তু কোথাও ঢাকার নাম উল্লেখ করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে আমরা যদিও ওই শহর দুটি দখল না করে যুদ্ধের একটি পরিণতি দিতে সমর্থ হয়েছিলাম।
আমার কাজ ছিল ঢাকার জন্য সেনাবাহিনীর একটি ট্রুপ সংগ্রহ করা। সিক্স মাউন্টেন ডিভিশনের সেনাদের রাখা হয়েছিল উত্তরে ভুটান সীমান্তে। আমি তখন আমার সঙ্গে এ ডিভিশনের সেনাদের দেয়ার জন্য অনুরোধ করি। আমাকে আবারো হতাশ হতে হয়, কারণ চীনাদের আক্রমণের আশঙ্কায় ওই ট্রুপটাকে সরিয়ে আনাটা সম্ভব হচ্ছিল না। আর জেনারেল মানেকশও উত্তরাঞ্চল থেকে কোনো সেনাট্রুপকে সরিরে আমার সঙ্গে ঢাকায় পাঠাতে রাজি ছিলেন না।
আমাকে প্যারা ব্যাটালিয়নদের একটি সদস্য দল দেয়া হলো। আমি তাদের টাঙ্গাইলে অবতরণের লক্ষ্যে পরিকল্পনা করেছিলাম এবং এ নির্দেশনায় আমার স্বাক্ষরের সময়কাল ছিল অক্টোবরে। আমাদের সেনারা কীভাবে এবং কত সময়ের মধ্যে অবতরণ করতে পারবে, তা নিয়ে আবার ছক কষতে শুরু করি।
প্যারাট্রুপটি কোথায় অবতরণ করবে, তা খুঁজে বের করার জন্য নভেম্বরের দিকে ফিফটিন প্যারা ব্রিগেডের ক্যাপ্টেন পিকে ঘোষ ও টাইগার সিদ্দিকীকে টাঙ্গাইলে পাঠানো হয়। তবে আমার কাজ ছিল সেনা সংগ্রহ। মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডে যে দুটি ডিভিশন ছিল তাদের কাছে বড় কামান এবং এ ধরনের কোনো গোলাবারুদ ছিল না। এ অবস্থায় চীন সীমান্ত থেকে ওই কামানগুলো সরিয়ে নিয়ে আসি। তাছাড়া ততক্ষণে ঢাকায় তিনটি ব্রিগেডও নামিয়ে দিয়েছি এবং কাজে নেমে পড়েছি।
৩০ নভেম্বর মুক্তিবাহিনীর অপারেশন শেষ হওয়ার পর সেনা কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেএস অরোরাকে আমি আমার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করি। মূলত ঢাকাকে ঘিরে আমি আমার পরিকল্পনার কথা বলি। অরোরা বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জেনারেল মানেকশকে জানানো উচিত।’ আমি না করি। কারণ মানেকশ আমাকে বলেছিলেন, যেকোনো সময় চীনাদের পক্ষ থেকে আক্রমণ আসতে পারে। আর চীন সীমান্ত থেকে সৈন্য সরানোর বিষয়টি তিনি জানতেন না। তাছাড়া যুদ্ধ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ঢাকাকে তিনি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণও মনে করতেন না।
এ কাজে আমার পক্ষে ছিলেন নতুন ডিএমও (ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনস) ইন্দর গিল। এদিকে ৩০ নভেম্বরের আগ পর্যন্ত জেনারেল মানেকশ কিন্তু এ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। পরবর্তী সময়ে অরোরা তাকে এ সম্পর্কিত একটি বার্তা প্রদান করে। ঘণ্টা দুই পর মানেকশর পক্ষ থেকে যে বার্তাটি পাঠানো হয় তাতে লেখা ছিল, ‘সেনাসদস্যদের সরাতে কে তোমাকে নির্দেশ দিয়েছে? তুমি এখনি তাদের আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনবে।’
তখন অরোরা খানিকটা বিচলিত হয়ে পড়ে। সে বারবার জানতে চাচ্ছিল যে, ‘এ অবস্থায় আমাদের এখন কী করা উচিত?’ আমি তাকে আশ্বস্ত করে বলি, চিন্তিত হয়ো না। বিষয়টি আমি দেখছি। ইন্দরকে উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতির কথা জানালে সে আমাকে বলে, ‘মানেকশকে বিষয়টি জানানোর কী প্রয়োজন ছিল তোমাদের? সে আমার ওপর রীতিমতো চিত্কার করছে।’ আমি ইন্দরকে বললাম, ‘দেখো, সেনাদের কোনোভাবেই ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। আমরা সবাই জানি যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে। তাই সেনাদের ফেরত পাঠালে আমি কোনো উপায়েই তাদের সঠিক সময়ে ফেরত আনতে পারব না।’
ইন্দর উত্তরে বলল, ‘ঠিক আছে জ্যাক, তাদের ফেরত পাঠাতে হবে না। তবে হেডকোয়ার্টারের অনুমতি ছাড়া তুমি সেনাদের বাংলাদেশে পাঠিও না। উত্তরে বলেছিলাম, ‘ইন্দর, আমি তোমাকে এ ব্যাপারে কথা দিলাম।’
আমি ভুলেও ভাবিনি যে, যুদ্ধ শুরুর পরও জেনারেল মানেকশ ৮ ডিসেম্বরের আগে সেনাদের বাংলাদেশে পাঠানোর অনুমতি প্রদানে বিরত থাকবেন। ৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় টেলিফোনে মানেকশ পশ্চিমে আমাদের সেনাঘাঁটিতে পাকিস্তানিদের বোমা হামলার কথা জানান। আমি বললাম, তাহলে আমি ধরে নিচ্ছি যে, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তিনি বলেন, হ্যাঁ, তুমি অগ্রসর হও। সে আরো বলে, মিসেস গান্ধী এখন কলকাতায় আছেন, দয়া করে উনাকে বিষয়টি অবহিত করো। আমি তাতে সম্মতি জানাই।
সে সময় আমি অরোরাকে বললাম, যুদ্ধ শুরু হয়েছে। আমি নির্দেশনা প্রস্তুত করছি, তাই রাজভবনে গিয়ে সে যেন ইন্দিরা গান্ধীকে এ সম্পর্কে অবহিত করে। আমি আদেশ জারির নির্দেশনা প্রস্তুত করে অরোরাকে বিমানযোগে সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করি। যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। কোনো যুদ্ধই আগাম পরিকল্পনামাফিক এগোয় না। তবে এক্ষেত্রে আমাদের খুব বেশি হতাশ হতে হয়নি। তাছাড়া ১৩ ডিসেম্বর নাগাদ ঢাকার বাইরে প্রায় তিন হাজার সেনাট্রুপ জড়ো করতে সমর্থ হই।
এদিকে আমেরিকার নৌবহর পাঠানোর সংবাদে দিল্লিতে এক ধরনের দুশ্চিন্তা ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে রেডিও সিগনাল ট্র্যাক করে আমরা জানতে পারি, ইসলামাবাদ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের সেনাদের কাছে পাঠানো বার্তায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে বলা হচ্ছে। বার্তায় বারবার উল্লেখ করা হয়, ‘উত্তর ও দক্ষিণের হলুদ (চীন) এবং সাদাদের (আমেরিকা) কাছ থেকে সাহায্য আসছে। তোমরা যুদ্ধ জারি রাখো।’ জেনালের নিয়াজি অবশ্য তা বিশ্বাস করেছিলেন।
কিন্তু ১৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের অধিবেশনে রাশিয়া ভেটো দিলেও আমেরিকা পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়। এ ঘটনায় মানেকশ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং অবিলম্বে ঢাকা ব্যতীত বাংলাদেশের সবগুলো শহর দখলের নির্দেশনা দেন। আমরা তখনো ঢাকার বাইরে অবস্থান করছি। যদিও নির্দেশনার কোথাও ঢাকার কথা উল্লেখ করা হয়নি। শুধু তাই-ই নয়, মানেকশ নির্দেশনাটি অন্য তিনটি সেনাট্রুপের কাছেও পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এ অবস্থায় আমরা ওই সেনাদের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে ওই আদেশ উপেক্ষা করতে বলি।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা (তিনি তখন ইন্টার্ন কমান্ডের জেনারেল কমান্ডিং অফিসার) ক্ষুব্ধ ও বিচলিত হয়ে আমার রুমে প্রবেশ করে সিগনালগুলো দেখিয়ে বলে যে, ‘আমি ভুল করছি। তিনি আগে শহরগুলো দখল করতে চান।’ আমি তার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করিনি। উপরন্তু সিলেট, রংপুর ও দিনাজপুর শহর দখলের বিরোধিতা করি।
ওই রাতে পাকিস্তানের জেনারেল নিয়াজির সঙ্গে ওয়্যারলেস মারফত কথা বলি এবং তাকে অবহিত করি যে, ‘আমাদের শক্তিশালী সেনাদল ঢাকাকে ঘিরে রয়েছে, মুক্তিবাহিনীর অভ্যুত্থান আসন্ন, এ অবস্থায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী যদি আত্মসমর্পণ করে, তবে তাদের মর্যাদার কোনো অবমূল্যায়ন করা হবে না এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেয়া হবে।’
১৪ ডিসেম্বর, বেতার তরঙ্গের সাহায্যে আমরা বার্তা পাই যে ঢাকার গভর্নমেন্ট হাউজে মিটিং চলছে। ঢাকায় তখন দুটি সরকারি ভবন ছিল, তাই আমাদের অনুমানের ওপর নির্ভর করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। আমরা তাই করলাম। সৌভাগ্যবশত আমাদের অনুমানটি ছিল সঠিক। প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে ভারতীয় বিমান বাহিনী সেখানে বোমাবর্ষণ করে। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
ওইদিন বিকাল ৪টার দিকে নিয়াজি ও মেজর জেনারেল ফরমান আলী ঢাকায় অবস্থানকারী আমেরিকার কূটনৈতিক কর্মকর্তা হার্বাট ডি স্পিভাকের সঙ্গে দেখা করে কয়েকটি প্রস্তাবনার কথা বলেন। প্রস্তাবনাটির মধ্যে ছিল, জাতিসংঘের অধীনে যুদ্ধবিরতি, জাতিসংঘের অধীনে সৈন্য প্রত্যাহার, জাতিসংঘের কাছে সরকার হস্তান্তর এবং কোনো ধরনের যুদ্ধাপরাধের বিচার নয়সহ অন্যান্য শর্ত।
এ বিষয়টি আমি দূতাবাসের মাধ্যমে জানতে পারি। সুতরাং আমি মানেকশকে এটি সম্পর্কে অবহিত করি। ভারতে অবস্থানরত আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলে আরো জানতে পারি, তিনি এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। একই দিনে ইসলামাবাদে অবস্থিত আমেরিকার দূতাবাস থেকে এটি নিউইয়র্ককে পাঠানো হয় এবং ১৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানের তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোকে দেয়া হয়। তিনি এটা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। এরপর আমেরিকার প্রতিনিধিরা এটি আমাদের হাতে তুলে দেন। ১৫ ডিসেম্বর যুদ্ধবিরতির আদেশ জারি হয়।
১৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের অধিবেশনে পোল্যাল্ডের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়, পোল্যান্ড তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ, অধিবেশনটা নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় হলেও আমাদের এখানে সময়টি ছিল ১৬ ডিসেম্বর সকাল। যাহোক, বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হয়ে জেনারেল ভুট্টো ক্রোধে উন্মাদ হয়ে যান। কারণ ভারতকে সেখানে আক্রমণকারী হিসেবে নিন্দা করা হয়নি বা দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। ১৬ ডিসেম্বর সকালে মানেকশ আমাকে টেলিফোন করে বলেন, ‘যাও এবং ওদের কাছ থেকে আত্মসমর্পণ আদায় করো।’
‘কী শর্তে?’— আমি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লাম। আরো জানতে চাইলাম যে, ‘আত্মসমর্পণের খসড়া দলিলটি আগেই আপনার কাছে পাঠানো হয়েছে। এটি নিয়ে কি আরো কোনো আলোচনার দরকার আছে?’ সে বলল, ‘তুমি জানো যে কী করতে হবে। এখনই যাও!’ এরপর আমি একটি ভুল করে বসি। আমি তাকে বললাম, নিয়াজির সঙ্গে কথা বলার সময় সে আমাকে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল এবং আমি তা ভুলে গেছি।
ঢাকা পৌঁছতে যশোরে এসে হেলিকপ্টার পরিবর্তনের সময় দেখি দূর থেকে একটি লোক দৌড়ে আসছে। সে আমার হাতে আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকে আসা একটি বার্তা তুলে দিল। আমি খুশি মনে চিঠিটি খুলতে গিয়ে ভাবছিলাম, যা-ই হোক শেষ পর্যন্ত আদেশটি এসেছে।
তখন আমি নিরস্ত্র, আমার সঙ্গে ছিল মাত্র একজন স্টাফ অফিসার। চিঠিটি খুলে দেখি তাতে লেখা, ‘ভারত সরকার নিয়াজির সঙ্গে জেনারেল জ্যাকবের মধ্যাহ্নভোজের বিষয়টি অনুমোদন করছে।’ অথচ আমি তো এ ব্যাপারে কোনো অনুমতি প্রার্থনা করিনি? কে তাদের বিষয়টি বলল?
যাহোক, দিল্লিতে যে খসড়া দলিলটি পাঠিয়েছিলাম সেটি হাতে আমি ঢাকায় অবতরণ করি। এ সময় জাতিসংঘের কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গে আমার দেখা হয় এবং ওরা আমাকে বলে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রত্যাহার ও সরকার হস্তান্তরের বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য আমরা তোমার সঙ্গে আসছি। উত্তরে আমি বলেছিলাম, অনেক ধন্যবাদ কিন্তু তোমাদের সাহায্যের প্রয়োজন আমার নেই। তখন ঢাকার প্রায় সব স্থানেই মুক্তিবাহিনী আর পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে লড়াই চলছে। বিমানঘাঁটিতে একজন পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। তার দায়িত্ব ছিল আমাকে নিয়াজির কাছে পৌঁছে দেয়া।
যাত্রাপথে একদল মুক্তিবাহিনী আমাদের পথরোধ করে এবং যেতে বাধা দেয়। তারা বলে, ‘আমরা এখন নিয়াজির প্রধান কার্যালয় আক্রমণ করতে যাচ্ছি।’ আমি বলি, ‘নিয়াজি আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে, দয়া করে আমাকে যেতে দাও।’ ওই সময় টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদক সেখানে উপস্থিত ছিল। পরবর্তী সময়ে সে বলেছিল, আমি নাকি মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের গুলি করার ভয় দেখিয়েছিলাম। অথচ আমি এ ধরনের কোনো কথা বলিনি। তাছাড়া সে সময় আমার কাছে কোনো অস্ত্রও ছিল না।
ওই সময় মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে যুক্তি-তর্ক ও দীর্ঘালাপে নামতে হয় আমাকে। একসময় আমি তাদের বলি, ‘দেখো, আগামীকাল তোমরা নতুন সরকার পেতে যাচ্ছ, আর নিয়াজিও আত্মসমর্পণে রাজি আছে, খোদার ওয়াস্তে আমাদের যেতে দাও।’ এরপর তারা আমাদের যেতে অনুমতি দেয়। নিয়াজির দপ্তরে পৌঁছানোর পর আমি তাকে আত্মসমর্পণের খসড়া দলিলটি পড়ে শোনালে সে বলে, ‘এটি তো নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের খসড়া। তুমি কিন্তু এখানে শুধু যুদ্ধবিরতি আর পাকিস্তানি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা করতে এসেছ।’
‘জেনারেল,’— আমি উত্তর দিলাম, এটি নিঃশর্ত দলিল নয়, বিষয়গুলো নিয়ে আমি অনেকটা সময় ধরে খেটেছি। আর আমি এটা করেছি কারণ আমরা যেন জাতিগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা করতে পারি, পরিবারগুলোর নিরাপত্তা দিতে পারি। জেনেভা কনভেনশন অনুসারে তাদের অফিসারের মর্যাদা দিতে হবে। তাই এটি কোনো নিঃশর্ত দলিল নয়। এটি ছাড়া তুমি আর কোথায় ওই শর্তগুলো খুঁজে পাবে?’ কিন্তু নিয়াজি তাতে অসম্মতি জানায়।
আমি জানতাম যে ঢাকায় ২৫ হাজার পাকিস্তানি সেনা রয়েছে। সে আমাকে ৩০ হাজারের কথা বলল। আমি কিছুক্ষণ তার যুক্তিগুলো শুনলাম। তার শুভাকাঙ্ক্ষী ফরমান আলী তাকে আত্মসমর্পণ করতে নিষেধ করেছে। সর্বশেষে আমি তাকে বলি, দেখো জেনারেল, তুমি যদি আত্মসমর্পণ করো তাহলে আমি তুমি, তোমার পরিবার, সম্প্রদায়— তোমাদের সবার নিরাপত্তা আমি নিশ্চিত করব। তোমার সম্মান বজায় রাখা হবে। কিন্তু তুমি যদি রাজি না থাকো তাহলে আমি চিন্তিত যে, তুমি এবং তোমার পরিবারের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার থাকবে না। আমাদের হাতে আর কোনো বিকল্প নেই। আমি তোমাকে ৩০ মিনিট সময় দিচ্ছি। এ কথা বলে আমি বের হয়ে এলাম।
আত্মসমর্পণের দলিল নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে জেনারেল অরোরার আসার কথা। আমি আশা করছিলাম, মানেকশকে আমি যে খসড়াটি পাঠিয়েছিলাম অরোরা যেন ওটাই নিয়ে আসে। সম্পূর্ণ বৈরী এক পরিবেশে দাঁড়িয়ে আমি ওদের অপেক্ষা করতে থাকলাম।
বিবিসিসহ আরো কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত ছিল। আমাকে পেয়ে তারা সবাই বিভিন্ন রকম প্রশ্ন করে যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারছিলাম না ঠিক ওই মুহূর্তে আমি তাদের কী উত্তর দেব।
সাংবাদিক হামুদুর রহমান পরবর্তী সময়ে তার রিপোর্টে উল্লেখ করে যে, জেনারেল জ্যাকব স্থিরচিত্তে দাঁড়িয়ে শান্তভাবে পাইপ টানছিলেন। অথচ আমি তখন ভাবছিলাম, নিয়াজি যদি আত্মসমর্পণ না করে, তাহলে আমার কী করণীয়। তার হাতে এখনো ৩০ হাজারের মতো সৈন্য রয়েছে, বিপরীতে আমার আছে মাত্র তিন হাজার সৈন্য। ওই সংখ্যক সৈন্য দিয়ে নিয়াজি কমপক্ষে তিন সপ্তাহ যুদ্ধ চালিয়ে নিতে পারবে।
ওই সাংবাদিকের রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়েছিল, নিয়াজির কাছে যখন জানতে চাওয়া হয়েছিল যে তুমি কেন আত্মসমর্পণে রাজি হলে? তখন নাকি সে উত্তরে বলেছিল, জেনারেল জ্যাকব আমাকে ব্ল্যাকমেইল করেছে। সে আমাদের কোনো একটি বাহিনীর (মুক্তিবাহিনী) হাতে তুলে দেয়ার ভয় দেখিয়ে বলেছে, তারা আমাদের বেয়নেটে বিদ্ধ করবে।
যাহোক, আধা ঘণ্টা পর আমি যখন পুনরায় নিয়াজির রুমে প্রবেশ করছি, তখন আমার মাথায় কেবল একটি চিন্তা কাজ করছে, শেষমেশ কী হতে যাচ্ছে। আমি দেখলাম কাগজটা টেবিলের ওপর রাখা। আমি নিয়াজিকে জিজ্ঞেস করলাম, জেনারেল তুমি কি কাগজটা গ্রহণ করছ? সে চুপ করে থাকল। কোনো উত্তর দিল না। আমি কথাটি তাকে তিনবার জিজ্ঞেস করলাম। আমি কাগজটি হাতে নিলাম, তার সামনে উঁচু করে ধরে বললাম, তোমার নীরবতাকে আমি সম্মতি হিসেবে ধরে নিচ্ছি। নিয়াজির চোখে জল। অন্যান্য পাকিস্তানি জেনারেল এবং অ্যাডমিরালসরা আমাদের দিকে ক্রদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। এদিকে নিয়াজির আত্মসমর্পণ ব্যতীত আমাকে আর কোনো আদেশ দেয়া হয়নি। আমি জানতাম না যে কী স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে।
নিয়াজি বলল, ‘আমি আমার অফিসে আত্মসমর্পণ করব।’ উত্তরে আমি বললাম, না, তা আর সম্ভব নয় কারণ আমি এরই মধ্যে নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছি যে, তুমি রেসকোর্স ময়দানে ঢাকার জনগণের সামনে আত্মসমর্পণ করছ। ‘আমি তা করব না’— নিয়াজি জবাব দিল। আমি বললাম, তুমি করবে এবং তোমাকে একটা গার্ড অব অনারও দিতে হবে। আত্মসমর্পণের এ ঘটনাটি ছিল অনন্য। ইতিহাসে এটাই একমাত্র আত্মসমর্পণের ঘটনা, যা ৪ ঘণ্টা ধরে সাধারণ জনসাধারণের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত হয়।
এরপর আমরা নিয়াজিকে নিয়ে তার গাড়িতে করে বিমানবন্দরের দিকে রওনা হলাম। রাস্তায় মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা আমাদের থামায়। দু-একজন লাফ দিয়ে গাড়ির ওপর উঠে যায়। সৌভাগ্যবশত আমাদের সঙ্গে একজন শিখ স্টাফ অফিসার ছিল। সে তখন গাড়ি থেকে মাথা বের করে তাদের নেমে যেতে বলে।
বিমানবন্দরের কাছাকাছি যেতে আমি আমাদের ট্রুপের কয়েকজন সেনা ও দুজন প্যারা বয়েজের দেখা পাই। আমি তখন ওদের আমার সঙ্গে নিয়ে নিই। আমরা যখন বিমানবন্দরে পৌঁছাই ঠিক তখন ট্রাকভর্তি মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে আসে টাইগার সিদ্দিকী।
আমি জানি না কেন আমার শুধু মনে হচ্ছিল যে, সে নিয়াজিকে গুলি করতে চায়। নিয়াজিকে যদি তখন গুলি করা হতো তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। সঙ্গে থাকা প্যারা বয়েজদের আমি বললাম, নিয়াজিকে নিরাপত্তা দিতে। এরপর আমি হেঁটে কাদের সিদ্দিকীর কাছে গেলাম। তাকে বললাম, আমার সৈনিকরা তোমার দিকে বন্দুক তাক করে রেখেছে। তুমি এখান থেকে চলে যাও।
এরপর জেনারেল অরোরা, তার সহধর্মিণী ও অন্যান্য এসে পৌঁছায়। জেনারেল নিয়াজি ও আরোরার সঙ্গে একই যানে করে আমারও যাওয়ার কথা ছিল। তবে আমাকে বলা হলো মিসেস অরোরার জন্য জায়গা করে দিতে। কারণ তিনি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ওটাই ছিল শেষ গাড়ি। যেহেতু আমাদের সবাইকেই গন্তব্যে পৌঁছতে হবে। তাই আমি একটি ট্রাকে করে ফিরলাম।
আত্মসমর্পণের চুক্তি স্বাক্ষরের পর কোনো ধরনের বিচারের পরোয়া না করে জনতা নিয়াজিকে হত্যা করতে উন্মুখ ছিল। এদিকে আমাদের কাছে খুব বেশি সৈন্য ছিল না। তাই সেনাবেষ্টনীর মাধ্যমে আর্মি জিপে করে আমরা তাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাই।
জানুয়ারি ১৩, ২০১৬ সালে বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত ভারতের লে. জেনারেল (অব.) জেএফআর জ্যাকবের মৃত্যুর পর লেখাটি প্রকাশ করে রেডিফডটকম।
ভাষান্তর রুহিনা ফেরদৌস






