পুরো নাম জ্যাক-ফার্জ-র্যাফায়েল জ্যাকব। জন্ম ১৯২৩ সালে, কলকাতায়। বেড়ে ওঠেন ব্রিটিশ রাজের অধীন রক্ষণশীল বাগদাদি ইহুদি পরিবারে। মূলত তার পরিবার আসে ইরাক থেকে এবং অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝিতে বাংলায় বসতি গড়ে তোলে তারা। পড়ালেখা শুরু পশ্চিমবঙ্গের ভিক্টোরিয়া স্কুল থেকে। থাকতেন স্কুল বোর্ডিংয়ে, বাড়িতে বেড়াতে আসতেন কেবল ছুটির দিনগুলোয়। কৈশোরে তিনি যুদ্ধকালীন কবিতা দ্বারা বিপুলভাবে প্রভাবিত ছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন চিরকুমার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ
নাৎসিদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে জ্যাকব ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন ১৮ বছর বয়সে। প্রাথমিকভাবে মেনে না নিলেও পরবর্তীতে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত মেনে নেন তার পিতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জ্যাকব উত্তরাঞ্চলীয় ইরাক, উত্তর আফ্রিকা, বার্মা (বর্তমানে মিয়ানমার) সুমাত্রা প্রভৃতি অঞ্চলে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধ শেষে আর্টিলারি স্কুলে গ্র্যাজুয়েট হতে তিনি চলে যান ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে অত্যাধুনিক আর্টিলারি ও মিসাইলের ওপর অর্জন করেন বিশেষ প্রশিক্ষণ।
ভারতীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তি ও অবদান
স্বাধীনতার পর জ্যাকব ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং বিভিন্ন পদমর্যাদায় ৩৭ বছর চাকরি করেন। ১৯৬৩ সালে ব্রিগেডিয়ার পদে উন্নীত হয়ে তিনি ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে লড়াই করেন। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে তিনি মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি পান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জ্যাকবের ভূমিকা
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জ্যাকব ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ হিসেবে কাজ করেন। যুদ্ধ যখন ব্যাপকতর পর্যায়ে পৌঁছায়, ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্কালীন প্রধান এসএইচএফজি মানেকশ পূর্ব পাকিস্তানে (এখন বাংলাদেশ) আক্রমণ চালানো এবং চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগের শহরগুলো দখল করতে আগ্রহ পোষণ করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা এ পদক্ষেপ সম্পর্কে অবশ্য নিশ্চিত ছিলেন না। সেই সময় জ্যাকব ‘ওয়ার অব মুভমেন্ট’ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসেন, ওই পরিকল্পনায় মাঝখানের শহরগুলো উপেক্ষা করে ঢাকাসহ পুরো পূর্ব পাকিস্তান দখল এবং অপ্রধান রুটগুলো ব্যবহার করে রাজধানী শহরে প্রবেশের ছক ছিল। বলা বাহুল্য, ওই সামরিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল মাত্র ১৫ দিনে এবং এর ফলে ঢাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর সফল প্রবেশের পথ নিশ্চিত হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি আর্মি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এএকে নিয়াজিকে আত্মসমপর্ণে রাজি করাতে জ্যাকবকে পাঠানো এবং রক্তপাতহীন আত্মসমর্পণ নিশ্চিতের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।
অবসরের পর...
জ্যাকব সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন ১৯৭৮ সালে। পরবর্তীতে তাকে গোয়া ও পাঞ্জাবের গভর্নর করা হয়। সেনাজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি আত্মজীবনী লেখেন, যার নাম ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা: বার্থ অব আ এ নেশন অ্যান্ড এন ওডিসি ইন ওয়ার অ্যান্ড পিস’। জীবনের শেষ প্রান্তে তিনি নয়াদিল্লিতে বসতি গড়ে তুলেছিলেন। তিনি পরলোকগমন করেন ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি।
(উৎস: ইন্ডিয়া টুডে)






