মাত্র ১৩ দিনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে ভারতীয় ও বাংলাদেশী বাহিনী আনুমানিক দেড় লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকা মুক্ত করেছে। আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সুবিধাজনক দুর্গম একটি ভূখণ্ডে অত্যন্ত শক্তিশালী, সুশিক্ষিত একটি সেনাবাহিনীকে পরাভূত করে এটা ছিল এক সম্পূর্ণ বিজয়। রণাঙ্গনে সংখ্যাধিক্যের অনুপাত ছিল আমাদের পক্ষে ১.৮:১। রণ বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী আক্রমণকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় ৩:১-এর চেয়ে এটা অনেক কম।

পূর্ব রণাঙ্গনে পাকিস্তানিদের ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে প্রায় আট হাজার সৈন্য নিহত ও আহত হয়। পাকিস্তানি ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফের দেয়া তথ্য অনুযায়ী নিয়মিত ও আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশের মোট সংখ্যা ৯৩ হাজার, যার মধ্য থেকে আনুমানিক তিন হাজার যুদ্ধবন্দি আবার যুদ্ধ চলাকালীনই বন্দি হয়েছিল। যুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানিদের যেসব অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জাম আমরা দখল নয়তো ধ্বংস করে ফেলি, সেগুলোর মধ্যে আছে ৪১টি ট্যাংক, ৫০টি কামান/ভারী মর্টার, ১০৪টি রিকয়েললেস গান, ঢাকা বিমানবন্দরে সারিবদ্ধভাবে রাখা ১৮টি এফ৮৬ বিমান ও বিপুলসংখ্যক নৌযান। আমাদের পক্ষে ১ হাজার ৪২১ জন নিহত, ৪ হাজার ৫৮ জন আহত ও ৫৬ জন নিখোঁজ, (সম্ভবত নিহত হয়)। আমাদের ট্যাংকের মধ্যে ২৪টি ধ্বংস ও ১৩টি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিমানহানির সংখ্যা ১৪। পাকিস্তান সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে পূর্ব রণাঙ্গনে তাদের ১১৫ জন অফিসার, ৪০ জন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার ও ১ হাজার ১৮২ জন অন্যান্য র্যাংকের সৈনিক হতাহত হয়। অথচ পশ্চিমা সাংবাদিকদের কাছে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের পক্ষের ৭০ জন অফিসার, ৫৯ জন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার ও ১ হাজার ৪৮২ জন অন্যান্য র্যাংকের সৈন্য হতাহত হয়েছে। আর আমাদের হিসাব অনুযায়ী পূর্ব রণাঙ্গনে ২৬ মার্চ থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানিদের ৪ হাজার ৫০০ জন নিহত ও চার হাজার সৈন্য আহত হয়। ৪ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের প্রাণ হারায় ২ হাজার ২৬১ জন আর আহত হয় চার হাজারজন। অর্থাৎ পূর্ব রণাঙ্গনে মোট ৬ হাজার ৭৮১ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত ও আট হাজারজন আহত হয়। পূর্ব রণাঙ্গনে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের প্রতিরক্ষামূলক আশ্রয় থেকে সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে লড়াই করে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা তাদের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। তাদের সুদৃঢ় প্রতিরক্ষাকে পাশ কাটানোর জন্য পার্শ্বসড়ক ও অন্যান্য রাস্তা ব্যবহারের যে কৌশল আমরা অবলম্বন করি, সেটা তারা একেবারেই আশা করেনি। আমাদের অগ্রসর হওয়ার গতি দেখে তারা অবাক হয়ে যায়।

বিদ্যুদ্বেগে আক্রমণে সাফল্যের কৃতিত্ব অবশ্যই ইস্টার্ন আর্মির সর্বস্তরের সৈনিকের প্রাপ্য। মাত্র ১৩ দিনের লড়াইয়ে অসংখ্য নদীসংকুল এলাকায় শত্রুপক্ষের একটি সুসংগঠিত ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বাহিনীর বিপক্ষে একটি পরিষ্কার বিজয় অর্জনের লক্ষ্যে তারা অসীম শৌর্য প্রদর্শন করে। মুক্তিবাহিনীকেও তাদের প্রাপ্য কৃতিত্ব দিতেই হবে। তাদের গেরিলা অপারেশনগুলো পাকিস্তানিদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, তাদের চলাফেরা বিঘ্নিত করে এবং তাদের আত্মবিশ্বাস ও সাহসের ভিত নড়িয়ে দেয়। অতএব ভারত-বাংলাদেশ সম্মিলিত বাহিনীর এ বিজয়ে তাদের অবদান বিশাল।

সব পর্যায়ের সাধারণ ও প্রশাসনিক কর্মীদেরও কৃতিত্ব দেয়া উচিত, যারা এ অভিযানের পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও রসদ সরবরাহের পেছনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। ইঞ্জিনিয়ারদের অসাধারণ কৃতিত্ব অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলে বাতিল হয়ে যাওয়া সেতু তৈরির সরঞ্জামাদি অনেক দেরিতে দেয়া সত্ত্বেও তারা বিভিন্ন ডিপো থেকে সেসব সংগ্রহ করার পর প্রয়োজনীয় মেরামতি সম্পন্ন করে আক্রমণের অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে সময়মতো সেতু তৈরি করে বাহিনীর অগ্রসর হওয়া ও লড়াই করার ব্যবস্থা করে দেয়।

১৯৭১-এর যুদ্ধ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। প্রথমত, যেকোনো অভিযান সফল করতে চাইলে সেটার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে বিবৃত হওয়া অবশ্যপ্রয়োজনীয়। উদ্দেশ্যসম্পর্কিত দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হলে শুধু তখনই লক্ষ্য নির্বাচন করা সম্ভব। ১৯৭১-এ এমনটি হয়নি। আর্মি হেডকোয়ার্টার্স এবং সম্ভবত সরকারেরও উদ্দেশ্য ছিল একটি অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠনের জন্য যত বেশি সম্ভব এলাকা দখল করা। চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে ঢাকার গুরুত্ব দিল্লির বাহিনীপ্রধানরা বিবেচনাতেও আনেননি। শহর ও অন্যান্য এলাকা দখলের ব্যাপারেই তাদের বেশি মনোযোগ ছিল। শহর ইত্যাদি দখলের ব্যাপারটি সময়সাপেক্ষ এবং এতে লোকক্ষয়ও হয় অনেক বেশি। ইন্দর গিলের সমর্থন নিয়ে কমান্ড হেডকোয়ার্টার্সে জেনারেল স্টাফ ঢাকাকেই চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে স্থির করেন এবং আমাদের ঢাকায় প্রবেশে সহায়তা করবে বলে পাকিস্তানি কমান্ড ও যোগাযোগ কেন্দ্রগুলোকে সম্পূরক লক্ষ্য বলে চিহ্নিত করা হয়। আমাদের কমান্ড হেডকোয়ার্টার্স যে কৌশল অবলম্বন করে তা হলো, আমরা শত্রুদের সীমানার কাছাকাছি টেনে এনে তাদের বিভিন্ন শহর প্রতিরক্ষায় ব্যস্ত রাখা এবং সে সুযোগে বিকল্প অক্ষরেখা ধরে তাদের অবস্থানকে পাশ কাটিয়ে অগ্রসর হওয়া। রসদ ও সরবরাহ চালু রাখার জন্য পথ পরে খুলে দেয়ার সুযোগ থাকে।&dquote;&dquote;

অরোরা-সমর্থিত মানেকশের কৌশল অবশ্য ছিল যত বেশি সম্ভব এলাকা দখলে আনা এবং তার ভাষায় ‘প্রবেশপথ’ খুলনা ও চট্টগ্রাম দখল করা। তার কর্ম-পরিকল্পনায় ঢাকার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। পরে ১৩ ডিসেম্বরে আমরা যখন ঢাকার উপকণ্ঠে এসে উপস্থিত হয়েছি, তখন তিনি যেসব শহর আমরা পাশ কাটিয়ে এসেছি, তার সবগুলো দখল করার জন্য আমাদের নির্দেশ দেন। তখনো পর্যন্ত ঢাকা তার তালিকায় স্থান পায়নি। মানেকশ সম্ভবত ভেবেছিলেন যে, নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলে আমাদের নিয়ন্ত্রণে যত বেশি সম্ভব শহরের দখল থাকা উচিত।

ঢাকা আক্রমণে আমাদের সহায়তা করার জন্য বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও যুদ্ধের পুরোটা সময় ধরে চীনা হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় ৬ মাউন্টেন ডিভিশনকে মানেকশ ভুটানের নিরাপত্তার জন্য উত্তরবঙ্গে রেখে দেন। ৬ মাউন্টেন ডিভিশনকে ব্যবহার করতে না পেরে আমরা চীন সীমান্ত থেকে তিনটি ব্রিগেড আনিয়ে নিই। এদের মধ্যে দুটিকে ঢাকা আক্রমণের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করে দিই। ৩০ নভেম্বরে এ বদলির কথা মানেকশের কানে গেলে তিনি তত্ক্ষণাৎ এ ব্রিগেডগুলোকে তাদের আগের অবস্থানে ফেরত পাঠাতে নির্দেশ দেন। ৮ ডিসেম্বরের পরে বারবার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত দুটি ব্রিগেড তিনি কাজে লাগাতে অনুমতি দেন। তৃতীয় ব্রিগেডটিকে আগেই পশ্চিম রণাঙ্গনে পাঠানো হয়ে গেছে। আমাদের প্রথমেই যদি ৬ মাউন্টেন ডিভিশন দিয়ে দেয়া হতো, এমনকি পরেও যদি দুটি ব্রিগেডের জন্য আমাদের ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেরি করতে না হতো, তাহলে সম্ভবত আরো আগে আমরা ঢাকায় পৌঁছতে পারতাম। মানেকশের প্রতি ন্যায়বিচার করতে গেলে বলতে হয় যে, সোভিয়েতরা, আমেরিকানরা, কাঠমান্ডুস্থ আমেরিকান মিলিটারি অ্যাটাশে এবং আমাদের পররাষ্ট্র ও ইন্টেলিজেন্সের কিছু বিশেষজ্ঞ পাকিস্তানের সমর্থনে চীনা হস্তক্ষেপের আশঙ্কা উড়িয়ে দেননি। মানেকশ তাদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর উপযুক্ত গুরুত্বারোপ করেছেন।&dquote;&dquote;

কোনো জটিল অভিযানেই একদম শেষ পর্যন্ত সব বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট একটি পর্যায় পর্যন্ত বিস্তারিত খুঁটিনাটি পরিকল্পনা করা সম্ভব। তারপর প্রয়োজন আনুষঙ্গিক পরিকল্পনা। সে অনুযায়ী ঢাকা-সংলগ্ন বড় নদীগুলো পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এর পরে উত্তরদিক থেকে ঢাকা আক্রমণ আরো জোরদার করার জন্য আনুষঙ্গিক পরিকল্পনা করা হয়।

রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পররাষ্ট্রনীতি ও সামরিক কৌশল নির্ধারণ এবং তাদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য একটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হয়। ইন্টেলিজেন্সও এ রকম একটি ক্ষেত্র, যেটার বাস্তবসম্মত পুনর্গঠন প্রয়োজন। ১৯৭১-এ নির্ভরযোগ্য একমাত্র ইন্টেলিজেন্স ডাটা আমরা পেয়েছিলাম আর্মি কোর অব সিগন্যালের সিগন্যাল ইন্টারসেপ্ট ইউনিটের কাছ থেকে। ইন্টেলিজেন্সের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্ভুল অনুমান করার ক্ষমতা। ইন্টেলিজেন্স এজেন্সিগুলো, পররাষ্ট্রবিষয়ক পণ্ডিত ও বাহিনীপ্রধানরা যুদ্ধের আগের এবং যুদ্ধ চলাকালীন চীনা ও আমেরিকান অবস্থান সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে এবং তা মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

উচ্চতম পর্যায়ে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য কোনো উপযুক্ত অবকাঠামো নেই। কার্যকরী কোনো চিফ অব স্টাফ অর্গানাইজেশন নেই, চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ বলেও কিছু নেই। এয়ার চিফ মার্শাল পিসি লাল তার মাই ইয়ারস উইথ আইএএফ বইতে লিখেছেন:

একটি সন্দেহ, যা আমার ও অন্য অনেকের মনে বাসা বেঁধে আছে এবং সেটা পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন যে, ১৯৭১-এর যুদ্ধের উদ্দেশ্যগুলো কী ছিল। সর্বাধিনায়ক ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর প্রধানরা যেভাবে বলেছেন, সেটা হলো, পূর্ব রণাঙ্গনে যত বেশি সম্ভব এলাকা দখল করা, যাতে পাকিস্তানি বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করা যায় এবং বাংলাদেশে একটি সম্ভাব্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়। এমন কোনো সম্ভাবনা তারা বিবেচনা করেও দেখেননি যে, পাকিস্তানিদের সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করা সম্ভব, বাস্তবে যা তারা হয়েছিল এবং ঢাকার পতন ঘটানো সম্ভব ও এর ফলে সমগ্র ভূখণ্ডটিই পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে পারে। পূর্ব রণাঙ্গনে যে কমান্ডাররা কাজ করছিলেন, সাবধানতার খাতিরে তাদের সীমিত পরিসরে কাজ করতে হয়। কিন্তু নির্ধারিত লক্ষ্যে তাদের দ্রুতগতিতে পৌঁছানোর দিকেও নজর রাখতে হয়। আশঙ্কা করা হয়েছিল যে, আর দু-তিন সপ্তাহ দেরি হলেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ অনিবার্যভাবে হস্তক্ষেপ করবে এবং কাশ্মীরের মতো উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করবে। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী এ তিন বাহিনীকে মূল বোঝাপড়ার মাধ্যমে তারা নিজেরা যেটা ভালো মনে করে, সেই অনুযায়ী তাদের পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে বলা হয়। (Here I must clarify one doubt that has existed in my mind and in the minds of others as to what the objectives of the 1971 war were. As defined by the Chiefs of Staff and by each respective service Chief, it was to gain as much ground as possible in the east to neutralize the Pakistani forces there to the extent we could and to establish a base as it were for a possible state in Bangladesh. The possibility that Pakistani Forces in East Pakistan would collapse altogether as they did and that Dacca would fall and that the whole would be available to the leaders of the freedom movement in East Pakistan was not considered something that was likely to happen. Caution demanded that people commanding in the East should work to limited objectives but to go about achieving them as rapidly as possible. It was feared that a delay of even two or three weeks would inevitably bring the UN Security Council and compel the two sides to come to some sort of cease fire such as Kashmir. With the basic understanding between the three services, the Army, the Navy and the Air Force, they were then left to plan their activities as they thought best.)

পেশাগত সততার জন্য খ্যাত পিসি লালের এ মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, কোনো ধরনের ‘পরিষ্কার রাজনৈতিক লক্ষ্য’ ছিল না বা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত কোনো নির্ধারিত রণকৌশল অথবা অপারেশনের ওপরে দিল্লিস্থ বাহিনীপ্রধানদের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কিছুই ছিল না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামরিক কৌশল পাঠ ও বিশ্লেষণের ব্যাপারটি প্রায় সামগ্রিকভাবেই উপেক্ষা করা হয়েছে। আমাদের স্টাফ কলেজ এবং কলেজ অব কমব্যাট প্রতিষ্ঠানে ব্রিগেড ও ডিভিশন পর্যায়ে ট্যাকটিকস শিক্ষা দেয়া হতো। কিন্তু সার্ভিস হেডকোয়ার্টার্সে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেসমেন্টের ওপরে কোনো ধরনের ব্যাপক অধ্যয়নের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কায়দা (ঃধপঃরপং) করে লড়াই (নধঃঃষব) জেতা গেলেও যুদ্ধ (ধিৎ) জয় করতে চাই কৌশল (ংঃত্ধঃবমু)। সামরিক কৌশলের শিক্ষাকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া খুবই প্রয়োজনীয়। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আমেরিকানরা ভিয়েতনামের সবগুলো লড়াই জিতলেও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ জয় করতে পারেনি।&dquote;&dquote;

১৯৭১-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই যে, কোনো অভিযান পরিচালনার জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো নির্মাণ এবং রসদ ও সরবরাহের ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তা আমরা অনুধাবন করতে পেরেছি। এপ্রিলে বস্তুত এ অবকাঠামোর, বিশেষত ত্রিপুরার রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ১৬ আগস্টের আগ পর্যন্ত আর্মি হেডকোয়ার্টার্স থেকে অপারেশনের কোনো নির্দেশ না পেলেও মে মাসের মাঝামাঝি সময়েই আমরা ত্রিপুরাতে এক কোরের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ এবং রসদ ও সরবরাহের ব্যবস্থা করতে শুরু করি। নির্দেশের অপেক্ষায় বসে থাকলে যুদ্ধ পুরোপুরি শুরু হওয়ার সময়ে আমরা লড়াই চালিয়ে যেতে পারতাম না। আসন্ন অপারেশন সম্পর্কে আমাদের ধারণা থেকে সরঞ্জামাদি ও রসদসামগ্রী স্থানান্তরে আমরা হিসাব-করা ঝুঁকি নিয়েছি। যুদ্ধ যখন ঘোষিত হলো, তখন প্রায় সবকিছুই তৈরি অবস্থায় ছিল। অন্য যেকোনো বিষয়ের তুলনায় এ বিষয়টি পূর্ব রণাঙ্গনে আমাদের যুদ্ধ জয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী ঘনিষ্ঠ পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করলে যে কী ধরনের সাফল্য আসে, ১৯৭১ সেটাও আমাদের শিখিয়েছে। সৌভাগ্যবশত পূর্ব রণাঙ্গনে নিয়োজিত সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর কমান্ডার ও সৈন্যরা পারস্পরিক সমঝোতা ও সহযোগিতার উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করেছে। পূর্ব রণাঙ্গনে নিয়োজিত সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর কমান্ডগুলো অসাধারণ দক্ষতায় নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছে। ১৯৭১-এর যুদ্ধে উভচর অপারেশনে আমাদের যোগ্যতা ও ক্ষমতার দৈন্য পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। ৭ হাজার ৬০০ কিলোমিটার উপকূলরেখা, ৫০০ দ্বীপ ও উপকূল থেকে দূরে অবস্থিত হাইড্রোকার্বন স্থাপনা থাকার কারণে দরকার মতো উভচর অপারেশন পরিচালনার জন্য আমাদের সুশিক্ষিত সুসজ্জিত বাহিনী থাকা প্রয়োজন। আমার ধারণা, এ শিক্ষা আমরা গ্রহণ করতে পেরেছি এবং বর্তমানে উভচর যুদ্ধের দিকে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেয়া হচ্ছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে ও পরবর্তী সময়ে সামরিক অভিযান চলাকালীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন লাভ অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। ১৯৭১-এর মার্চে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন তেমন উত্তপ্ত ছিল না। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর পাকিস্তানি নিষ্ঠুরতা ও তাণ্ডবের চিত্র বিশ্বজনমতের সামনে তুলে ধরার প্রয়োজন ছিল। প্রধান পশ্চিমা সংবাদপত্রগুলো ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমগুলোর প্রচুর বিদেশী সাংবাদিক এখানে ছিলেন। সেনাবাহিনীর প্রধান অনানুষ্ঠানিকভাবে এ সাংবাদিকদের ব্রিফ করেছেন। প্রথমদিকে পাকিস্তানিদের বর্বরতার কথা এ সাংবাদিকরা তেমন বিশ্বাস করেননি। পরবর্তী সময়ে অবশ্য তাদের প্রতিবেদনগুলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে বিদেশী সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমগুলোর অবদানকে উপযুক্ত গুরুত্ব দিতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত ১৯৭১-এর শিক্ষাগুলো আজ কালের গর্ভে বিস্মৃত। বিদেশী সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোর ব্যাপারে আরো অনেক কিছু করণীয় ছিল এবং এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি যথাযথ গুরুত্ব পায় না।